বিবিসি, রয়টার্স সহ বিভিন্ন পশ্চিমা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ২ মার্চ রবিবার ফলাও করে প্রচারিত হয়েছে যুদ্ধবিরতি বৃদ্ধি করতে ইহুদিবাদী অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের রাজি হওয়ার খবর। কিন্তু তারা যে চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির ২য় ধাপে যাওয়ার পরিবর্তে ১ম ধাপের মেয়াদ বাড়ানোর মার্কিন প্রস্তাবনা মেনে নিতে রাজি হয়েছে সেই বিষয়টি চেপে যাওয়া হয়েছে।
সাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির নিয়ম অনুসারে ৬ সপ্তাহ বা ৪২ দিনের ১ম ধাপ শেষে ২য় ধাপে যাওয়ার পরিবর্তে ১ম ধাপের মেয়াদ বাড়ানোর তোড়জোড় আদতে ইসরাইল-আমেরিকার সদিচ্ছা নাকি চুক্তিকে অগ্রাহ্য করে গাজ্জায় স্থায়ীভাবে হত্যাযজ্ঞ ও নৃশংসতা জিইয়ে রাখার অপচেষ্টা তা তাদের সাম্প্রতিক অপ-তৎপরতা থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়।
ইসরাইল চায়ছে চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির ১ম ধাপের মেয়াদ বাড়াতে। যেখানে বন্দী বিনিময়ের বিষয়টি মূখ্য। অপরদিকে ২য় ধাপে যেতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, যেখানে গাজ্জার পুনর্গঠনই হলো মূল।
চলমান যুদ্ধবিরতি অনুসারে ১ম ধাপের মেয়াদ হওয়ার কথা ৬ সপ্তাহ। কথা ছিলো ১ম ধাপের ১৬ দিনের মাথায় ২য় ধাপ কিভাবে বাস্তবায়িত হবে সে বিষয়ে হামাসের সাথে আলোচনায় বসবে ইসরাইল ও তাদের মধ্যস্থতাকারী দেশ আমেরিকা। কিন্তু ইসরাইল ও তাদের মধ্যস্থতাকারী আমেরিকা এবিষয়ে শুধু কালক্ষেপণই করছে। ইসরাইল নিয়মিত দিয়ে যাচ্ছে যেকোনো মুহুর্তে গাজ্জায় পুনরায় যুদ্ধ শুরুর হুমকি এবং আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দিয়ে যাচ্ছেন, গাজ্জাকে মধ্যপ্রাচ্যের নৈসর্গিক নগরীতে পরিণত করার অনির্ভরযোগ্য আশ্বাস। এর সাথে শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন, গাজ্জাকে নৈসর্গিক নগরীতে পরিণত করতে আমেরিকাকে প্রথমে তা খালি করে দিতে হবে ফিলিস্তিনিদের। যা প্রকারান্তে গাজ্জা থেকে ফিলিস্তিনিদের পরিকল্পিত উৎখাতকরণ।
ট্রাম্প আরো দাবী করছেন, পুনর্গঠনের সময় গাজ্জায় মার্কিন সেনাদের উপস্থিতির কোনো প্রয়োজন হবে না। বরং ১৯৯৩ এর অসলো চুক্তি মোতাবেক ফিলিস্তিনের সীমানা ইত্যাদির নিয়ন্ত্রণে থাকা ইসরাইলই মার্কিন কোম্পানির গাজ্জা পুনর্গঠন শেষে এর কর্তৃত্ব আমেরিকার হাতে তুলে দিবে।
ফিলিস্তিন স্বাধীনতাকামী ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস সহ গোটা মুসলিম বিশ্ব ইসরাইল ও আমেরিকার এমন হঠকারিতার তীব্র বিরোধিতা করে। অপরদিকে ইসরাইল গাজ্জার পুনর্গঠন ও ধ্বংসস্তুপ সরানোর সরঞ্জাম প্রবেশ বন্ধ রাখে। উল্টো এর প্রধানমন্ত্রী ও পৃথিবীর কুখ্যাত খুনী নেতানিয়াহু ফিলিস্তিন ভূখণ্ড বাদ দিয়ে সৌদিতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা উপস্থাপন করেন।
১ম ধাপের মেয়াদ বাড়ানোর কথা আলোচনায় প্রথম আসে চলতি বর্ষের ২২ ফেব্রুয়ারি শনিবার, যখন সেদিনকার নির্ধারিত বন্দী বিনিময় দেখাতে তালিকায় না থাকা ২ ইসরাইলী জিম্মিকে সাথে নিয়ে আসে হামাস। হামাস সেদিন তালিকার নির্ধারিত ইসরাইলী বন্দীদের মুক্তি দিলেও বিপরীতে ৬২০ ফিলিস্তিনি বন্দীর মুক্তি আটকে দেয় ইসরাইল। তালিকায় না থাকা ২ ইসরাইলী জিম্মিকে বন্দী বিনিময় প্রক্রিয়া দেখাতে নিয়ে আসায় ও এর ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানায় অবৈধ রাষ্ট্রটি।
অবৈধ রাষ্ট্রটির জ্বালানি মন্ত্রী এলি কোহেন একে ইসরাইলের জন্য অপমানজনক বলেও মন্তব্য করেছিলেন। ভিডিওতে দেখানো তালিকায় না থাকা সেই ২বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হলে নির্ধারিত ৬২০ ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
অপরদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফকে এবিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, এবিষয়ে আলোচনার জন্য বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) ইসরাইলে যেতে পারি আমরা। তাদের মুক্তির লক্ষ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম দফার মেয়াদও বাড়ানোর কথা ভাবা হচ্ছে।
১ মার্চ শনিবার চলমান যুদ্ধবিরতির ১ম ধাপের মেয়াদ শেষ হয়। দখলকৃত ফিলিস্তিন সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পবিত্র রমজান শুরু হয়। এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার ইসরাইল নিজেরাই প্রস্তাব ও দাবী রেখেছিলো, যেনো ১ম ধাপের মেয়াদ বাড়ানো হয় এবং বাকি বন্দীদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে ১ম ধাপের মেয়াদ প্রাথমিকভাবে ১ সপ্তাহ বৃদ্ধি পাবে। এই এক সপ্তাহে হামাস ১০ জন মৃত জিম্মির লাশ ও ৫ জীবিত জিম্মিকে হস্তান্তর করবে। নাহয় তারা সাক্ষরিত চুক্তির পরবর্তী ধাপে যেতে রাজি নয়। বরং যেকোনো মুহুর্তে গাজ্জায় পুনরায় যুদ্ধ শুরু করবে। ২য় ধাপের জন্য আলাদা সাক্ষরিত চুক্তি এর সাথে সাংঘর্ষিক নয় বরং তাদের এই অধিকার রয়েছে বলে দাবী করা হয়।
ইসরাইলের এই প্রস্তাব তাদের মধ্যস্থতাকারী দেশ আমেরিকা কর্তৃক হামাসের কাছে পৌঁছলে ১ মার্চ শনিবার তারা কঠোরভাবে একে প্রত্যাখ্যান করে এবং পাল্টা হুমকি দিয়ে বলে, চুক্তির বাত্যয় ঘটলে থেকে যাওয়া বন্দীদের জন্য দায়ী থাকবে আমেরিকা ও ইসরাইল। এছাড়া এই প্রস্তাবনা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও সাক্ষরিত চুক্তির বিপরীত। অবিলম্বে চুক্তি অনুসারে ২য় ধাপে যেতে হবে তাদের। শুরু করতে হবে আলোচনা ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া।
এমন পরিস্থিতিতে ইসরাইল হুট করে আমেরিকার প্রেসিডেন্সিয়াল দূত স্টিভ উইটকফের প্রস্তাবনা সামনে নিয়ে আসে। একে বৈধ করে নিতে কেবিনেটে উত্থাপন করে। যেখানে উইটকফের প্রস্তাবনাটি পাশ হয়। আর এটিই পশ্চিমা হলুদ মিডিয়ার কল্যাণে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘গাজ্জায় যুদ্ধবিরতি বৃদ্ধি করতে রাজি ইসরাইল’ ইতিবাচক শিরোনামে বিশ্বজুড়ে প্রচারিত হয়।
উইটকফের প্রস্তাবনায় যা রয়েছে:
১) ২য় ধাপ অর্থাৎ পুনর্গঠন ও সম্পুর্ণরূপে সেনা প্রত্যাহার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনায় বসতে ১ম ধাপের মেয়াদ বাড়াতে হবে।
২) পবিত্র রমজান ও পাসওভারের কথা বিবেচনায় রেখে মেয়াদ ২০ এপ্রিল পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। যেখানে ২৯ মার্চ রমজান এবং ১৯ এপ্রিল পাসওভার শেষ হবে।
৩) বর্ধিত যুদ্ধবিরতির ১ম দিনে জীবিত ও মরে যাওয়া জিম্মিদের অর্ধেককে মুক্তি দিতে হবে।
৪) চলমান যুদ্ধবিরতি পুর্ব চুক্তি অনুসারে ৩ ধাপ পর্যন্ত স্থায়ীত্ব পেলে বাকি জিম্মিদেরও নির্ধারিত মেয়াদে পর্যায়ক্রমে মুক্তি দিতে হব। যার ১ম ধাপ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে, মেয়াদ বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চলছে এবং উক্ত প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে।
এছাড়াও উইটকফ ইসরাইলের বক্তব্যের সমর্থন জোগান। যেখানে তিনি দাবী করেন, ৪২ দিন মেয়াদি ১ম ধাপ শেষে ২য় মেয়াদ বিলম্বিত হলে ইসরাইল পুনরায় যুদ্ধ শুরুর অধিকার রাখবে। এক্ষেত্রে ২য় ধাপের জন্য পূর্বে সাক্ষরিত আলাদা চুক্তি সাংঘর্ষিক নয়। অথচ ২য় ধাপের নিশ্চয়তার লক্ষ্যে ইসরাইল ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আমেরিকা দু’পক্ষই আলাদা চুক্তি পত্রে সাক্ষর করেছিলো। যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ ছিলো যে, ১ম ধাপের ১৬ দিনের মাথায় ২য় ধাপের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনায় বসবে ইসরাইল এবং ৪২ দিন শেষে ২য় ধাপের বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে তাদের।
ইসরাইলের দাবী অনুযায়ী জীবিত ও মৃত সর্বমোট ৫৯ ইসরাইলী বর্তমানে হামাসের কাছে জিম্মি রয়েছে। যার মধ্যে ৩৫ জন মৃত এবং ৩ জনের ইসরাইলের নাগরিকত্ব নেই।
ইসরাইলের ১ম ধাপের মেয়াদ বাড়ানোর দাবী যা বর্তমানে মার্কিন বা উইটকফ প্রস্তাবনা নামে সামনে এসেছে, হামাসকে তা মানাতে রবিবার (২ মার্চ) মানবিক ও খাদ্য সহায়তার প্রবেশও বন্ধ করে দেয়। যা জাতিসংঘ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কর্তৃক সমালোচনা ও নিন্দার শিকার হয়।
চলমান যুদ্ধবিরতির ২য় ধাপে যা রয়েছে ও ইসরাইল যে কারণে তা মানতে নারাজ:
১. ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে স্থায়ীভাবে শত্রুতা ও সন্ত্রাসবাদের অবসান।
২. গাজ্জায় আটক থাকা জিম্মিদের বিপরীতে ইসরাইলের কাছে বন্দী থাকা সকল ফিলিস্তিনির মুক্তি প্রদান।
৩. অবরুদ্ধ গাজ্জা ও ফিলিস্তিনের স্বীকৃত ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণভাবে ইসরাইলী সেনাদের প্রত্যাহার।
৪. গাজ্জা পুনর্গঠন শুরু ও এতে কোনো ধরণের বাধা না দেওয়া।
কিন্তু ইসরাইল গাজ্জার পুনর্গঠন ও এর ভূখণ্ড থেকে নিজ সেনাদের সরাতে নারাজ। এজন্য ১ম ধাপের ১৬তম দিন অতিবাহিত হওয়ার পর ভ্রাম্যমাণ বাড়ি ও ধ্বংসস্তুপ সরানোর সরঞ্জামবাহী ট্রাক গাজ্জায় প্রবেশের অপেক্ষায় থাকলেও তা প্রবেশের অনুমোদন দিচ্ছে না তারা।
তাদের বিশ্বস্ত বন্ধু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তর পূর্বক গাজ্জা পুনর্গঠন করে দেওয়ার প্রস্তাবনা রাখলেও, ইসরাইলী সেনা অনুপস্থিতির বিষয়ে কিছু বলেননি। উল্টো বলেছেন, পুনর্গঠনের সময় গাজ্জায় মার্কিন সেনাদের উপস্থিতির কোনো প্রয়োজন হবে না। বরং অসলো চুক্তি মোতাবেক ফিলিস্তিনের সীমানা ইত্যাদির নিয়ন্ত্রণে থাকা ইসরাইলই মার্কিনীদের গাজ্জা পুনর্গঠন শেষে এর কর্তৃত্ব আমেরিকার হাতে তুলে দিবে।
গাজ্জার পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়ার অর্থ, স্থিতিশীলতার দিকে ফিরে যাওয়া এবং সেনা প্রত্যাহারের অর্থ, স্থল সীমান্ত ও সমুদ্রের কর্তৃত্ব হামাসের কাছে তুলে দেওয়া। এতে করে সামরিক সক্ষমতা রাখা ফিলিস্তিনের একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি হামাস, সরকার গঠনের পাশাপাশি বাস্তবিক পূর্ণাঙ্গ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র কায়েমের সুযোগ পাবে। যা ইসরাইলের মাথাব্যথার কারণ। এছাড়া মসজিদে আকসায় তাদের থার্ড টেম্পল নির্মাণ ও পবিত্র কুদস দখল করে তাতে ইসরাইলের রাজধানী স্থাপনের পরিকল্পনাও ভেস্তে যাবে। এজন্যই তারা চলমান যুদ্ধবিরতির ২য় ধাপে যেতে চায়ছে না। বরং চায়ছে ১ম ধাপের মেয়াদ বাড়িয়ে বন্দীদের মুক্ত করে নিতে। যেনো ইসরাইলী জনগণের ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ থেকে মুক্ত হওয়া যায় এবং পূর্বের ন্যায় চাপমুক্ত সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও দখলদারিত্ব বজায় রাখা যায়।










