পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী ও বাঙালি মুসলমানদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার কঠোর নিন্দা জানিয়েছে সাধারণ আলেম সমাজ। সেই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ নিন্দা ও আহ্বান জানায় সাধারণ আলেম সমাজ।
সংগঠনটির বিবৃতি বলা হয়-
আমরা, সাধারণ আলেম সমাজ অত্যন্ত উদ্বেগ নিয়ে লক্ষ্য করছি, খাগড়াছড়ির গুইমারায় সেনাবাহিনীর ওপর বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইউপিডিএফ-এর সশস্ত্র হামলা, বাঙালি মুসলিমদের দোকানপাট জ্বালিয়ে দেওয়া, তাদের ওপর বর্বরোচিত সন্ত্রাসী হামলা চালানো হচ্ছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। এই নৃশংস ঘটনায় আক্রান্ত সেনাসদস্য ও আহতদের আরোগ্য কামনা করি এবং তাদের পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করি।
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষায় সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার ত্যাগ ও দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য। পার্বত্য অঞ্চলে বহু বছর ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলো নানা ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে, যা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এমন ভূখণ্ড, যেখানে ভারত ও পশ্চিমের স্বার্থ মিলেমিশে একাকার। পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘ভারতের অন্তর্ভুক্ত’ করার দাবি এবং ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ বানানোর ষড়যন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিকভাবেই চলছে। তাই আমরা রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক নিরাপত্তা পদক্ষেপ আরও বাড়াতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাই।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি জেলা সদরের সিঙ্গিনালা এলাকায় এক মারমা কিশোরী ধর্ষণের ঘটনায় চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতির সূত্রপাত। আমরা এ ঘটনায় গভীরভাবে মর্মাহত। আমরা ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। ধর্ষকদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। ইতিমধ্যে ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বরে ঘোষিত অবরোধ কর্মসূচির প্রেক্ষিতে সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনায় মারমা সম্প্রদায়ের দুটি সংগঠন তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। বিবৃতিতে তারা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, শান্তিপ্রিয় মারমা জনগোষ্ঠী কোনোভাবেই এই সহিংস ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয় এবং সাম্প্রদায়িক সংঘাতকে আমরা কোনোভাবেই সমর্থন করি না। মূলত ‘জুম্ম ছাত্র জনতা’র ব্যানারের আড়ালে একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহল পাহাড়ি জনগণকে ব্যবহার করে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে। এই ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা না দিয়ে মারমা জনগোষ্ঠীসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি-বাঙালি সকল নাগরিকদের সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছে ‘মারমা উন্নয়ন সংসদ’ ও ‘বাংলাদেশ মারমা ঐক্য পরিষদ’ নামের দুটি সংগঠন।
এই পর্যায়ে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, গত তিন দশকের বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অপকর্ম এবং নিরীহ বাঙালিদের ওপর হত্যা-খুন-অত্যাচার বারবার চালিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে তারা। সেনাবাহিনী যখন দেশ ও জাতির নিরাপত্তা রক্ষায় পাহাড়ে দায়িত্ব পালন করছে, তখনই বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর হামলার মাধ্যমে সরকারের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। এটি দেশের ভৌগলিক অখণ্ডতার জন্য হুমকি এবং রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ। এই হামলার তীব্র নিন্দার পাশাপাশি আমরা দাবি করছি, পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক নিরাপত্তা জোরদার করা হোক এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অভিযান পরিচালনা করা হোক।
বর্তমানে ইউপিডিএফসহ অন্যান্য পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠন দেশের সার্বভৌমত্ববিরোধী তৎপরতার পাশাপাশি লুটপাট, টেন্ডারবাজি, খুন, গুম ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এর ফলে পাহাড়ি বাঙালি ও নৃতাত্ত্বিক সাধারণ মানুষের জীবন-সম্পদ আজ নিরাপত্তাহীন। ভূমিপুত্র বাঙালি ও ভৌগলিক নিরাপত্তায় নিয়োজিত সেনাবাহিনিকে ‘শত্রু’ বানিয়ে ফায়দা নিতে চায় ভারতের মদদপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ইউনিফর্মড সামরিক নিরাপত্তা বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি এখন সময়ের দাবি। সেই সাথে সেনাবাহিনীর ওপর হামলা এবং হামলাকারীদের বিচারের দাবিতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের অধিকার আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বসবাসরত প্রতিটি বাঙালি ও নৃতাত্ত্বিক বাংলাদেশী নাগরিকের।
আমরা, সাধারণ আলেম সমাজ স্পষ্টভাবে জানাতে চাই, ভারতের মদদপুষ্ট রাষ্ট্রবিরোধী ও চিহ্নিত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন হিসেবে ইউপিডিএফকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক। জাতীয় নিরাপত্তা ও জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক শক্তির মাধ্যমে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
পরিশেষে সেনাবাহিনীর ওপর হামলার প্রতিবাদে দেশপ্রেমিক জনগণ, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণকে জাতীয় স্বার্থে কোনো বিভেদ-বিদ্বেষকে প্রশ্রয় না দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হতে হবে। সেনাবাহিনী বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সর্বদা জনগণের পাশে রয়েছে, দেশের জনগণও সবসময় সেনাবাহিনীর পাশে আছে।
আল্লাহ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে সন্ত্রাস, বৈশ্বিক ষড়যন্ত্র ও বিচ্ছিন্নতাবাদ থেকে হেফাজত করুন।











