শুক্রবার | ৩০ জানুয়ারি | ২০২৬
spot_img

আসলেই কি দাশপ্রথা ফিরিয়ে এনেছে তালেবান? কি আছে নতুন আইনে?

আফগানিস্তানে আদালত পরিচালনার নতুন বিধিমালা ঘিরে বিদেশি কিছু গণমাধ্যম ও কয়েকটি সংগঠনের প্রচারে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কোথাও বলা হচ্ছে, আফগানিস্তানে দাসপ্রথা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আবার কোথাও দাবি করা হচ্ছে, বিচারব্যবস্থায় বৈষম্যকে আইনি কাঠামো দেওয়া হয়েছে। তবে আফগানিস্তানের বর্তমান সরকার এবং ইমারাতে ইসলামিয়া প্রশাসন এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন অপব্যাখ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইমারাতে ইসলামিয়ার বক্তব্য, ৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে জারি হওয়া নতুন বিধিমালা কোনোভাবেই দাসত্বকে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে ফিরিয়ে আনার দলিল নয়। বরং এটি আদালতের কাজকে নিয়মতান্ত্রিক করা, বিচারপ্রক্রিয়ায় শৃঙ্খলা আনা এবং মামলা পরিচালনার ধাপগুলোকে এক কাঠামোয় আনতে প্রণীত একটি প্রক্রিয়াগত বিধিমালা। প্রশাসনের ভাষ্য, দীর্ঘ অস্থিরতার সময় পেরিয়ে বিচারব্যবস্থাকে সুসংগঠিত করা জরুরি ছিল, যাতে বিচার দ্রুত হয়, সিদ্ধান্তে একরূপতা আসে এবং অপরাধ দমনে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বাড়ে।

ইমারাতে ইসলামিয়া জানিয়েছে, দাসপ্রথা ফিরে এসেছে বলে যে দাবি ছড়ানো হচ্ছে তা নথির বিকৃত পাঠ। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয়ভাবে দাস বানানো, দাস কেনাবেচা চালু করা বা দাসত্বকে সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠার মতো কোনো ঘোষণা কিংবা কর্মসূচি নেই। তারা বলছে, আদালত পরিচালনার একটি নথির কিছু পরিভাষাকে টেনে এনে বড় দাবি বানানো হয়েছে, যাতে আফগানিস্তানের বিচারব্যবস্থা এবং শাসন কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়।

এদিকে মানবাধিকার সংগঠন রাওয়াদারি জানিয়েছে, তারা যে নথির কপি পেয়েছে সেখানে কয়েকটি স্থানে ‘স্বাধীন ব্যক্তি’ ও ‘দাস’ জাতীয় শব্দ ব্যবহার আছে। সমালোচকেরা এগুলোকে দাসত্বের আইনি স্বীকৃতি বলে ব্যাখ্যা করছেন। তবে ইমারাতে ইসলামিয়ার অবস্থান হলো, কেবল পরিভাষা ধরে ‘দাসপ্রথা ফিরেছে’ এমন সিদ্ধান্ত টানা বিভ্রান্তিকর এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তৈরি।

ইমারাতে ইসলামিয়া আরও জানিয়েছে, নতুন বিধিমালার লক্ষ্য আদালতের কাজকে নিয়মমাফিক ও শৃঙ্খলিত করা। এতে অভিযোগ গ্রহণ, শুনানি পরিচালনা, সাক্ষ্য ও স্বীকারোক্তির মূল্যায়ন, এবং দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়াকে কাঠামোবদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। সরকারের যুক্তি, আদালতের ধাপগুলো স্পষ্ট হলে বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত হয়, অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘসূত্রতা কমে এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়।

প্রশাসন আরও বলছে, যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থার শক্ত কাঠামো জরুরি। তাদের মতে, রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা, জনজীবনে বিশৃঙ্খলা কিংবা অপরাধপ্রবণতা ঠেকাতে বিচারিক শৃঙ্খলা কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে।

রাওয়াদারি ও কয়েকটি প্রতিবেদনে নতুন বিধিমালার কিছু অংশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। যেমন, সমাজে শ্রেণি বা অবস্থান বিবেচনায় শাস্তির ধরন নিয়ে প্রশ্ন, শাস্তির পরিসর ও সীমা নিয়ে আলোচনা, এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় অধিকার সংক্রান্ত কয়েকটি বিষয়ের স্পষ্টতা নিয়ে আপত্তি। তবে ইমারাতে ইসলামিয়া জানিয়েছে, এসব অভিযোগ নথির সামগ্রিক উদ্দেশ্য উপেক্ষা করে একপেশে ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়িয়েছে। আফগান সরকারের বক্তব্য হচ্ছে, আদালত পরিচালনার প্রক্রিয়া শক্ত করা মানেই ন্যায়বিচার নষ্ট করা নয়, বরং বিচারব্যবস্থাকে নিয়মের মধ্যে এনে রাষ্ট্র ও সমাজে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।

এদিকে আফগান বিচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আইন ও বিধিমালা ইসলামী শরিয়াহর ভিত্তিতে প্রণীত। তারা বলছে, আইনকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে জনমনে সন্দেহ তৈরি করা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল করার প্রচেষ্টা রোধে তারা কঠোর অবস্থান নেবে।

আফগান সরকার বলেছে, নতুন বিধিমালাকে ‘দাসপ্রথা ফিরিয়ে আনা’ হিসেবে প্রচার করা সত্য নয়। তাদের ভাষ্য, এটি আদালত পরিচালনার নিয়মতান্ত্রিক দলিল, যার লক্ষ্য বিচারপ্রক্রিয়াকে শৃঙ্খলিত করা, অপরাধ দমন জোরদার করা এবং জনজীবনে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। আফগান সরকার আরও বলছে, বাইরে থেকে যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তার বড় অংশই অপব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক অপপ্রচার।

spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ