বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, একটি রাজনৈতিক দল বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। দেড় বছর আগে যে স্বৈরাচার দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছে, যারা মানুষের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র কেড়ে নিয়েছিল, তাদের ধারাবাহিকতায় এখন আবার একটি দল মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন পত্রিকায় দেখা যাচ্ছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের গোপন ব্যালটের সিল তৈরি করতে গিয়ে তাদের নেতাকর্মীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাত ৯টায় লালবাগ বালুর মাঠে (সাবেক আজাদ মাঠ) নির্বাচনি শেষ জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশে যেসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেসব নির্বাচনে জনগণ প্রকৃত অর্থে ভোট দিতে পারেনি। আগামী নির্বাচনে ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশের মানুষ ভোট দেবে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে এমন প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে, যিনি সব সময় মানুষের পাশে থাকবেন, এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখে অংশ নেবেন এবং উন্নয়নমূলক কাজ করবেন।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় দেশের মা-বোনদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে বিকাশ নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য চাওয়া হচ্ছে। এসব ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ বহু বলিদান, গুম, খুন ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষ তাদের ভোটের অধিকার ফিরে পেয়েছে। এই অধিকার যাতে কেউ আবার কেড়ে নিতে না পারে, তাই সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের সুযোগ পেলে খেটে খাওয়া পরিবার, শহরের নারীপ্রধান পরিবার ও গৃহিণী মায়েদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এই সহায়তা দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকলে এসব পরিবার ধীরে ধীরে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবে এবং এর মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশ স্বাবলম্বীর পথে এগোবে।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের প্রধান পেশা কৃষি। কোটি কোটি মানুষ কৃষির সঙ্গে যুক্ত। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে না পারলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আরও বাড়বে। এটি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে কৃষকদের সহযোগিতা বাড়াতে হবে। এ জন্য ‘কৃষি কার্ড’ চালু করা হবে, যার মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন সহায়তা সরাসরি কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, বিএনপি সরকার গঠিত হলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, দেশের প্রায় দেড় কোটি মানুষ প্রবাসে অবস্থান করেন। বিদেশে কাজ করা ও দেশে ফেরার পর তারা নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু করা হবে, যাতে প্রয়োজনে তারা সরকারের সহায়তা পেতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, দেশের কোটি কোটি শিক্ষিত তরুণ ও যুবক বেকার হয়ে আছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি অভিশাপ। সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে আলোচনায় তারা জানিয়েছেন, বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে এসে কারখানা স্থাপন করবে। এতে করে তরুণ সমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি সারা দেশে টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট, ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে, যাতে দেশের ছেলে-মেয়েরা দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এতে তারা দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে অথবা ভালো বেতনে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান গড়ে তুলতে পারবে। বিদেশে যেতে ইচ্ছুকদের জন্য সরকারিভাবে ঋণ দেওয়া হবে, যাতে কাউকে বাপ-দাদার জমি বিক্রি করতে না হয়। চাকরির মাধ্যমে তারা ধীরে ধীরে সেই ঋণ পরিশোধ করতে পারবে।
স্বাস্থ্য খাত প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। এসব স্বাস্থ্যকর্মী মা, শিশু ও সাধারণ মানুষকে ঘরে বসে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা দেবে। যাদের হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, তারা ঘরেই সেবা পাবে।
ঢাকার জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি শুধু একটি এলাকার নয়, বরং পুরো ঢাকা শহর ও দেশের বড় সমস্যা। বিএনপি সরকার গঠিত হলে বর্ষার আগেই খাল খনন কর্মসূচি শুরু করা হবে, যেমনটি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় করা হয়েছিল। সে সময় খাল খননের মাধ্যমে পানি সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছিল এবং খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছিল।
সমাপনী বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায় যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—সব ধর্মের মানুষ শান্তিতে বসবাস করবে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে যেমন ধর্ম বা পেশা দেখা হয়নি, তেমনি আগামী বাংলাদেশও হবে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের দেশ। বক্তব্য শেষে দেশ গড়তে জনগণের সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করেন তিনি।











