লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেছেন, দেশের স্বার্থে আমরা আবারও জীবন দিতে প্রস্তুত আছি। প্রয়োজন কোনো আইন মানে না। একাত্তরে যুদ্ধ করেছি কোনো সংবিধান দেখে নয়। পাকিস্তানিদের হত্যা করেছি কোনো সংবিধান দেখে নয়। দেশের জনগণের স্বার্থে আমরা জীবন দিতে প্রস্তুত আছি। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেও আমরা প্রস্তুত। আমরা ১১ দলীয় জোট মার খেতে অভ্যস্ত।
রোববার রাতে নগরীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। “গণভোটের রায় জনগণের সার্বভৌম অভিপ্রায়ের বহিঃপ্রকাশ” শীর্ষক সেমিনারটি ১১ দলীয় ঐক্য চট্টগ্রাম মহানগরীর উদ্যোগে আয়োজন করা হয়।
এ সময় কর্নেল অলি আহমদ বলেন, দেশে আগে যেসব বিনিয়োগকারী ছিল তারা ফিরে যাচ্ছে। নতুন করে কোনো বৈদেশিক বিনিয়োগ আসছে না। বেকারত্ব বাড়ছে। প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় খুনের খবর পড়ছি। সার, তেলসহ দেশে সব ধরনের দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ছে। সরকারের পক্ষে এসব সামাল দেওয়া সম্ভব না। কারণ মানুষের আস্থা সরকারের ওপর নেই। তারা ৭০ শতাংশ মানুষের আস্থা হারিয়েছে গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করে।
মুক্তিযুদ্ধের এই বীর বিক্রম প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আশেপাশে যারা আছে তারা হলো ফুটপাতের খাবারের মতো। তারা কোনো পাঁচ তারকা মানের হোটেলের খাবার নয়। এজন্য তারা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সবসময় তৈলমর্দন করছে। যোগ্যতাসম্পন্ন লোক কখনও তৈলমর্দন করে না। তারা প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বোঝাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীকে বলব, সময় থাকতে দেশের জনগণের দাবি মেনে নিয়ে দেশকে শান্তি দেন।
তিনি বলেন, বিএনপি সরকার ভুল পথে আছে। সুরা না জানা ইমামকে নামাজ পড়াতে দিলে যেমন অন্ধকারে মিম্বরের সামনে দিয়ে ইমাম পালিয়ে যায়, সেরকম অবস্থা যেন বিএনপির না হয়। আমি নিজে ১৯৭১ সাল থেকে জিয়া পরিবারের সাথে ছিলাম। তারেক রহমান কষ্ট পেলে আমিও কষ্ট পাই। তার পাশে যারা আছে তারা বন্ধু নয়, তারা দুষ্টচক্র। এই দালালচক্র ও দুষ্টচক্র থেকে বের হতে না পারলে তারা আপনার ক্ষতি করবে।
ভারতের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, পশ্চিমবঙ্গের শুভেন্দু অধিকারী একটা দড়ি ছেঁড়া গরু। ভারতকে বলবো এই দড়ি ছাড়া গরুকে সামলান। নয়তো সে অনেক খেত নষ্ট করবে। শুভেন্দু মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। তার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হতে হবে। আমরা ভারতকে বলব আপনার ঘরে আপনি শান্তিতে থাকেন, আমার ঘরে আমাকে শান্তিতে থাকতে দেন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে কর্নেল অলি আহমদ জানান, প্রত্যেক জিনিসের দাম বাড়ছে। সাধারণ কিছুর ভারও নিতে পারছে না সরকার। পাকিস্তানের মাধ্যমে একটি যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এই যুদ্ধ শেষ হয়নি। আমাদের আরও বড় সংকটের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।
সেমিনারে প্রধান আলোচক জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করে সরকার আবারও দেশকে ফ্যাসিবাদী কাঠামোর দিকে ধাবিত করছে। তারা ক্ষমতার ভারসাম্য হতে দিতে চায় না। ক্ষমতায় বসেই তারা ভোল পাল্টে ফেলেছে ১৮০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে। সরকার যদি এখনও সঠিক পথে ফিরে না আসে তাহলে দেশের পরিস্থিতি ভালো থাকবে না। জটিলতা তৈরি করে বিএনপি দেশকে সংকটে ফেলেছে।
তিনি বলেন, যেই অজুহাতে সরকার গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করছে সেই অজুহাতকে জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। ৩৩টি দলের মধ্যে একজন প্রস্তাব না মানলে তা বাস্তবায়ন হবে না—এটা কোনো নিয়ম নয়। জনগণ বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’কে ১২ ফেব্রুয়ারি ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।
সেমিনারে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, গণভোটের রায় না মানলে সরকারকে হাসিনার মতো হেলিকপ্টারে পালাতে হবে। টাঙ্কার, বাঙ্কার করে কোনো লাভ হবে না। সোজা পথে না হাঁটলে ১১ দলীয় জোট আঙুল বাঁকা করবে। কারণ বিএনপির ঐতিহাসিক খাসলতই বলে দেয় তাদের জন্য আঙুল বাঁকা করতে হয়। তিনি আরও বলেন, আমি আগে বলেছিলাম ঐক্যমত কমিশন সালাউদ্দিন কমিশনে পরিণত হয়েছে। এখন সংসদ সালাউদ্দিন সংসদে পরিণত হয়েছে। যাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রতারণা তারা এখন বলছে, আপনারা অন্তহীন প্রতারণার দলিল করেছেন। কিন্তু তারাই সংস্কার কমিশনের শপথ না নিয়ে সংসদকে অন্তহীন প্রতারণার কারখানায় পরিণত করেছে। তারা সবচেয়ে বড় ফ্যামিলি কার্ড দিয়েছে বিসিবিতে। বিএনপি হলো ব্যর্থ আওয়ামী লীগ, আর আওয়ামী লীগ হলো সফল বিএনপি। তারা যেটা দেখায় সেটা আওয়ামী লীগ করে দেখায়, কিন্তু নিজেরা পারে না। তাহলে কি তারা সফল আওয়ামী লীগ হতে চায়? যারা সফল বিএনপি সেই আওয়ামী লীগের পুরো দলের স্থান এখন ভারতে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির। তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্রের তিনটি অংশ থাকে। এগুলো হলো সরকার, সংসদ ও সুপ্রিম কোর্ট। তিনটির কোনটি কোনোটির চেয়ে বড় বা ছোট নয়। এই তিনটির ওপরের ছাদ হচ্ছে সংবিধান। আর সংবিধানের ওপর থাকে জনগণ। কারণ সংবিধানে জনগণকে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী করা হয়েছে। কাজেই জনগণকে ক্ষিপ্ত করলে ছাদসহ পিলার ভেঙে পড়বে। এ সময় তিনি সরকারি দলের পড়াশোনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, সরকারি দলকে অনেক বেশি পড়াশোনা করতে হবে। আমরা তাদের ব্রেনের আবিষ্কার দেখতে চাই।
চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াতের আমির নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য রাখেন—জামায়াতের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মুহাম্মদ শাহজাহান, সংসদ সদস্য মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরী, সংসদ সদস্য জহিরুল ইসলাম, মহানগরী জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুজ্জামান হেলালী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির সহ-সভাপতি আব্দুল মোতালেব, জাগপার চট্টগ্রাম মহানগরী সভাপতি আবু জাফর মো. আনাস, নেজামে ইসলাম পার্টির মহানগরী সভাপতি আজিজুল হক, খেলাফত মজলিস চট্টগ্রাম উত্তর জেলার আমির মুফতি মাহমুদুল হাসানসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা।











