বিবিসির নতুন মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই সাংবাদিকদের একটি অংশের ধর্মঘটের মুখে পড়েছেন ম্যাট ব্রিটিন। দায়িত্বের প্রথম দিনেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সতর্ক করে তিনি বলেছেন, তার মেয়াদে কিছু ‘কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া অনিবার্য’।
ইউরোপে গুগলের সবচেয়ে সিনিয়র নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ব্রিটিন যেদিন বিবিসির প্রধান কার্যালয় ‘নিউ ব্রডকাস্টিং হাউস’-এ আসেন, সেদিনই তার আগমনের সময় ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের ‘নিউজআওয়ার’ এবং রেডিও ফোরের ‘দ্য ওয়ার্ল্ড টুনাইট’-এর একদল সাংবাদিক সেখানে পিকেটিং করছিলেন। কাজের চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনার প্রতিবাদে তারা এই কর্মসূচি পালন করেন।
শিফট প্যাটার্ন নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে চলা বিরোধের জেরে এই ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। এটি কর্মীদের পরিকল্পিত ধারাবাহিক ধর্মঘটের অংশ।
কর্মীদের মতে, তাদের কাজের মনোবল এখন লাল তথা বিপজ্জনক সীমায় রয়েছে।
বিবিসির ভেতরের অনেকেই বিষয়টিকে একটি বড় সংকেত হিসেবে দেখছেন। কারণ, ব্রিটিনকে পুরো সংস্থায় কোটি কোটি পাউন্ড সাশ্রয়ের জন্য বড় ধরনের বাজেট ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। দায়িত্বের শুরুতেই তাকে সেই প্রক্রিয়ার বাধার মুখে পড়তে হলো।
মঙ্গলবার (১৯ মে) কর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে ব্রিটিনের। গত কয়েক সপ্তাহ তিনি বিবিসির বিভিন্ন বিভাগ পরিদর্শন করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, তিনি বিবিসির বাজেট ১০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। পাশাপাশি অনুষ্ঠান নির্মাণ ব্যয়ের ওপর বিশেষ নজর দিচ্ছেন।
সাবেক মহাপরিচালক টিম ডেভির স্থলাভিষিক্ত হওয়া ব্রিটিন কর্মীদের উদ্দেশে এক বার্তায় বলেন, তার পরিদর্শনে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, ‘বিবিসি আমাদের সবার জন্য কতটা অসাধারণ এবং অমূল্য এক সম্পদ’।
তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইউটিউব ও টিকটকের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়ার এই সময়ে বিবিসি কীভাবে তার অনুষ্ঠান প্রচার করবে, সে ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হবে।
ব্রিটিন বলেন, ‘বিবিসি তার ইতিহাসে প্রমাণ করেছে, শ্রোতা-দর্শকদের প্রয়োজনে এটি কত দ্রুত নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলতে পারে। সেটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পুনর্গঠনই হোক, কোভিডের সময় রূপান্তরই হোক, কিংবা যুদ্ধকলাপে লিপ্ত অঞ্চলে সেবা চালু করাই হোক। আমাদের এখন সম্মিলিতভাবে সেই জরুরি অবস্থার তাগিদ অনুভব করতে হবে। এর অর্থ হলো গতি ও স্পষ্টতার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিবিসির শ্রেষ্ঠত্ব সবসময়ই দারুণ, সৃজনশীল গল্পবলা এবং চমৎকার, স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। আজ এর অর্থ হলো সঠিক প্ল্যাটফর্মে, সঠিক ফরম্যাটে, সঠিক সংবাদটি তুলে ধরা নিশ্চিত করা। আমি জানি পরিবর্তন সহজ হবে না। সঞ্চয় বাড়াতে গিয়ে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া অনিবার্য।’
‘নিউজআওয়ার’ এবং ‘দ্য ওয়ার্ল্ড টুনাইট’-এর সাংবাদিকদের এই ধর্মঘট বাজেট কাটার পরিকল্পনার আগেই নির্ধারিত ছিল। এর ফলে ৩০ জনেরও বেশি কর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
নিউজআওয়ারের কর্মীরা জানান, তাদের কাজের ওপর অতিরিক্ত ২৬টি সামান্য সংক্ষিপ্ত শিফট যুক্ত করার পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছিল। ইউনিয়নের ভোটে সংশোধিত একটি পরিকল্পনাও ব্যাপকভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়। দ্য ওয়ার্ল্ড টুনাইটের কর্মীদের ওপরও অতিরিক্ত শিফট চাপানো হয়েছিল।
কর্মীদের দাবি, এই পরিবর্তনগুলো ইতোমধ্যে চাপে থাকা কর্মীদের ওপর আরও বেশি ধকল তৈরি করবে। একই সঙ্গে টিমগুলো আরও দুর্বল হয়ে পড়লে অনুষ্ঠানগুলোর মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
বিশ্বজুড়ে মুক্ত ও সঠিক সংবাদের ঘাটতির এই সময়ে বিবিসি যখন ব্রিটেনের ‘সফট পাওয়ার’ বা নরম শক্তি হিসেবে ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে প্রচার করছে, ঠিক তখনই এই ধর্মঘটের ঘটনা ঘটল।
বিবিসির একজন মুখপাত্র বলেন, ‘ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টস বা এনইউজে কর্মবিরতির দিকে এগিয়ে যাওয়ায় আমরা হতাশ। ইউনিয়নের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা ও পরামর্শের সময় আমরা তাদের কথা শুনেছি, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেছি এবং একটি সংশোধিত প্রস্তাব পেশ করেছি। তবে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় আমরা অনুতপ্ত। বিবিসি বড় ধরনের আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি এবং আমাদের যতটা সম্ভব দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো শ্রোতা-দর্শকেরা যেন বিবিসি থেকে বিশ্বস্ত সংবাদ ও তথ্য পেতে থাকেন।’
এদিকে, বিবিসির সাবেক সিনিয়র এডিটর রব বার্লির একটি সমালোচনামূলক নিবন্ধের পর ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে বিবিসির অতীতের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিষয়টি ব্রিটিনকে আরও একটি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
‘আনহার্ড’ ওয়েবসাইটের একটি প্রবন্ধে বার্লি ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিবিসি নিউজের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ফ্রান আনসওয়ার্থের একটি মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। সেখানে আনসওয়ার্থ বলেছেন, ‘প্রগতিশীল উন্মাদনার’ কারণে কর্পোরেশনটি ট্রান্স ইস্যু নিয়ে বিতর্কগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি আসলে বলব, প্রগতিশীল সম্পাদকীয় বিষয়গুলো সামলানো এবং এগুলো নিয়ে তৈরি হওয়া নিপীড়নমূলক পরিস্থিতির কারণেই আমি চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম। এটি অত্যন্ত কঠিন ছিল।’
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান











