ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানে যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদায় উদযাপিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল আযহা। ঈদ উপলক্ষে আরগ জামে মসজিদে আফগান প্রধানমন্ত্রী মোল্লা মুহাম্মদ হাসান আখুন্দসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ঈদের নামাজ আদায় করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঈদের বার্তায় মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, প্রবাসী আফগানদের দেশে ফেরা, শহীদ পরিবার, এতিম, প্রতিবন্ধী ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে আফগান সরকার।
বুধবার (২৭ মে) সকালে আরগ জামে মসজিদে ঈদুল আযহার নামাজ আদায় করা হয়। এ সময় ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী মাওলানা আবদুস সালাম হানাফী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক ডক্টর মোল্লা আবদুল ওয়াসি, মন্ত্রীবৃন্দ, ইমারাতে ইসলামিয়ার বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা এবং বিপুলসংখ্যক নাগরিক উপস্থিত ছিলেন।
ঈদের নামাজ পূর্বে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক ডক্টর মোল্লা আবদুল ওয়াসি ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোল্লা মুহাম্মদ হাসান আখুন্দের ঈদ বার্তা পাঠ করেন।
বার্তায় দেশের জনগণকে পবিত্র ঈদুল আযহার শুভেচ্ছা জানিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে মুসলমানদের কুরবানি, নামাজ, দোয়া, সদকা ও নেক আমল, বিশেষ করে বাইতুল্লাহ শরিফের হাজ্বীদের আমল কবুল করার প্রার্থনা করা হয়।
আফগান প্রধানমন্ত্রী তার বার্তায় হজ্ব ও ঈদুল আযহার গুরুত্ব তুলে ধরে মুসলমানদের ঐক্য ও সংহতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, মুসলিম বিশ্বের বহু সমস্যা ও বিশৃঙ্খলার মূল কারণ বিভেদ ও আত্মকেন্দ্রিকতা।
তিনি মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন থেকে শুরু করে দেশীয় পর্যায় এবং সারা বিশ্বে সব মুসলমানের উচিত ঐক্য, সংহতি ও সহযোগিতার নীতি মেনে চলা এবং নিজেদের শত্রুতা, ঘৃণা ও হিংসা থেকে দূরে রাখা।
বার্তার আরেক অংশে মোল্লা মুহাম্মদ হাসান আখুন্দ বলেন, মুসলমানদের মধ্যে ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের চেতনা জীবিত রাখতে হবে। প্রত্যেক মুসলমানের উচিত ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার ওপর আল্লাহর বিধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
আফগান প্রধানমন্ত্রী ইমারাতে ইসলামিয়ার দায়িত্বশীলদের নির্দেশ দেন, তারা যেন মানুষের কাছে ইখলাস, দয়া ও সহমর্মিতার বার্তা পৌঁছে দেন এবং নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে চেষ্টা করেন।
তিনি দায়িত্বশীলদের আরও আহ্বান জানান, তারা যেন ঈদের রাত ও দিনগুলোতে নিজ নিজ এলাকায় শহীদ পরিবারের সদস্য, এতিম ও প্রতিবন্ধীদের খোঁজখবর নেন। একই সঙ্গে জনগণের সঙ্গে বৈঠক ও সাক্ষাতে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং তাদের সমস্যা ও অভিযোগ শোনেন।
এ ছাড়া দেশের সব নাগরিকের প্রতি আহ্বান জানানো হয়, তারা যেন দেশে ফিরে আসা মুহাজির, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এবং বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ায়।
ঈদের বার্তায় জাতীয় ঐক্য ও প্রবাসী আফগানদের দেশে ফেরার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ইমারাতে ইসলামিয়ার নেতৃত্ব জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানায় এবং বিদেশে বসবাসরত আফগানদের নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে বলে, “এটি তোমাদের ভূমি এবং তোমাদের ব্যবস্থা।”
প্রবাসী আফগানদের সরাসরি সম্বোধন করে ইমারাতে ইসলামিয়ার নেতা বলেন, “এসো এবং জামাতের সঙ্গে যুক্ত হও। মুসলমানরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। যুদ্ধ-বিগ্রহ দূর হয়েছে, মর্যাদার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং কাফেররা মুসলমানদের ঐক্য চায় না।”
জাতীয় ঐক্যের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে ইমারাতে ইসলামিয়ার নেতৃত্ব ঘোষণা করে, “আমি নিজের মাথা রক্ষা করছি না; বরং ঐক্য রক্ষার জন্য নিজের মাথা ও রক্ত দিয়ে ফিতনার মোকাবিলা করব।”
ঐক্যের বিরোধীদের প্রতিও তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “যারা ফিতনা সৃষ্টি করবে, তাদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।”
অন্যদিকে ঈদুল আযহা ঘিরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সারা দেশে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ছুটির উদযাপনকালে মুসল্লি ও জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আবদুল মতিন কানি বলেন, উৎসবের পুরো সময়জুড়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
তিনি বলেন, নাগরিকরা যেন শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশে ঈদ উদযাপন করতে পারেন, সে জন্য বিভিন্ন প্রদেশে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের উপ-মুখপাত্র বিসমিল্লাহ হাবিব বলেন, ছুটির দিনগুলোতে বড় মসজিদ, মহাসড়ক, পার্ক এবং জনসমাগমপূর্ণ অন্যান্য গণস্থান ও বিনোদনকেন্দ্রে নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন থাকবে।
হাবিবের মতে, সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি প্রতিরোধ এবং ঈদ উদযাপনকালে পরিবার ও মুসল্লিদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাই এসব ব্যবস্থার লক্ষ্য।
মন্ত্রণালয় ছুটির সময়ে পটকা ও অন্যান্য বিস্ফোরকজাতীয় বস্তু ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড আহত হওয়ার কারণ হতে পারে এবং জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করতে পারে।
কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেন, আফগানিস্তানজুড়ে শান্ত ও নিরাপদ ঈদুল আযহা নিশ্চিত করতে নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নামাজ শেষে মুসলমানদের কুরবানি কবুল, মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি শক্তিশালী করা এবং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আফগানিস্তানকে হেফাজত করার জন্য দোয়া করা হয়।











