আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হলেও ইসরাইল এখনো সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি। তবে আপাতদৃষ্টিতে ‘চুপ’ থাকলেও এই নীরবতাকে কৌশলগত বলেই মনে করা হচ্ছে। পর্দার আড়ালে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী, আইডিএফ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা মাথায় রেখে সক্রিয়ভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইসরাইলি গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বুধবার রাতে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি নিরাপত্তা বৈঠক করেছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ।
নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বরাতে টাইমস অব ইসরাইল জানিয়েছে, বৈঠকে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীকে যুদ্ধবিমান যেকোনো মুহূর্তে উড্ডয়নের জন্য প্রস্তুত রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা হালনাগাদ করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয় অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে পরিস্থিতি হঠাৎ ইসরাইলের দিকে মোড় নিলে তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়া যায়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর আমেরিকা ওই অঞ্চল থেকে আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। তবে ইতোমধ্যে সেগুলো পুনরায় মোতায়েন করা হয়েছে। এসব বিমানের উপস্থিতিকে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর কয়েকটি আগে থেকেই বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে রাখা ছিল।
বুধবার তেল আবিবের একজন সামরিক মুখপাত্র বলেন, ‘ইসরাইলি সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং সরকারের কাছ থেকে আদেশ পাওয়া মাত্রই ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দিতে প্রস্তুত।’
তিনি আরও জানান, ইসরাইল ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনকে জানিয়েছে, আইডিএফ একটি স্বতন্ত্র সামরিক পরিকল্পনা করছে, যা মার্কিন বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল নয়।
এদিকে সীমান্ত সুরক্ষার প্রস্তুতিও নিচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী। বিশেষ করে লেবাননে হিজবুল্লাহর গতিবিধির ওপর কড়া নজর রাখছে আইডিএফ।
ইসরাইলি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় কোণঠাসা হয়ে ইরান তাদের প্রক্সি বা আঞ্চলিক মিত্র হিজবুল্লাহ ও হুথিকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে হামলার নির্দেশ দিতে পারে। এ কারণে যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় বিশেষ করে লেবানন সীমান্তে প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরাইল শুরু থেকেই আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা বা সমঝোতা চুক্তির বিরোধী ছিল। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হামলা এবং চুক্তি বাতিলের ঘোষণাকে ইসরাইল নিজেদের জন্য ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে। কারণ এর ফলে তেহরান দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাই নিজে সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়েও ইসরাইল তার মূল লক্ষ্য, অর্থাৎ ইরানকে দুর্বল করার লক্ষ্য অর্জিত হতে দেখছে।
প্রসঙ্গত, ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে গত শনিবার (৫ জুলাই) হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা করেছিল ইরান। ওই হামলার পর মঙ্গলবার মধ্যরাতে দক্ষিণ ইরান ও হরমুজ প্রণালি এলাকায় ইরানের ৮০টি সামরিক স্থাপনা ও লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী।
মার্কিন বাহিনীর হামলার জবাব দিতে অল্প সময়ের মধ্যেই কুয়েত ও বাহরাইনে আমেরিকার সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালায় ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী, আইআরজিসি।
এই হামলা ও পাল্টা হামলার মধ্যেই বুধবার তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইরানের সঙ্গে আমেরিকার যুদ্ধবিরতি শেষ এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রাখা সম্ভব নয়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর বুধবার দ্বিতীয় দফায় ইরানে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী।
বৃহস্পতিবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড, সেন্টকম এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা প্রথমে মঙ্গলবার রাতে ৮০টি এবং দ্বিতীয় দফায় বুধবার রাতে ৯০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। হামলাগুলোর লক্ষ্য ছিল ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনঘাঁটি, উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা এবং সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা।
আইআরজিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বুধবার সেন্টকমের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে কুয়েত ও বাহরাইনে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানো হয়েছে।
এদিকে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৮ ও ৯ জুলাই ইরানের পাঁচটি প্রদেশে চালানো মার্কিন হামলায় ১৪ জন নিহত এবং আরও ৭৮ জন আহত হয়েছেন।
সূত্র: টাইমস অব ইসরাইল, আই২৪










