spot_img

আফগানিস্তানে হামলা পাকিস্তানকে আরও সংকটে ফেলবে: হুরিয়াত রেডিও

নির্মম শক্তি কখনো টেকসই নিরাপত্তা গড়ে তুলতে পারে না। আগ্রাসন দিয়েও কোনো দেশে স্থিতিশীলতা আনা যায় না। যেসব শাসনব্যবস্থা নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়, এরপর নিজেদের ব্যর্থতার দায় চাপাতে বাইরের প্রতিপক্ষ খুঁজে বেড়ায়, তারা সংকট থেকে বের হতে পারে না, বরং আরও গভীরে ডুবে যায়।

আফগানিস্তানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম হুরিয়াত রেডিও এর এক মন্তব্যধর্মী প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকৃত নিরাপত্তা বোমা ও যুদ্ধবিমান দিয়ে গড়ে ওঠে না। এটি গড়ে ওঠে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক ও যৌথ স্বার্থের ভিত্তিতে।

তবে পাকিস্তানের সামরিক শাসনব্যবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হাঁটছে। নিজেদের ব্যর্থ নীতিগুলো পর্যালোচনা করার বদলে তারা মাঝেমধ্যেই আফগানিস্তানের বেসামরিক এলাকাগুলোতে বিমান হামলা চালায়। এতে স্পষ্ট হয়, তারা নিজেদের ক্রমবর্ধমান সংকট থেকে পালাতে শক্তি ও সহিংসতাকেই পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে।

প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়, শিশু, নারী ও নিরাপদ পরিবারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে কী ধরনের সামরিক সাফল্য অর্জন করা যায়? ঘরবাড়ি, মসজিদ ও আবাসিক এলাকায় বোমা হামলা চালিয়ে কোন বিজয়ের আশা করা যায়?

রেডিও আল-হুররিয়া বলছে, পাকিস্তানের সামরিক শাসনব্যবস্থা বহু বছর ধরে বেসামরিক মানুষকে নিজেদের ব্যর্থ নিরাপত্তা নীতির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। একসময় এসব নীতিই তাদের ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব বাড়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আজ পাকিস্তানের সংকট আর কারও কাছে গোপন নেই। দেশটির অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির কারণে একটি অত্যন্ত জটিল বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে পাকিস্তানি সমাজের বড় একটি অংশ তাদের পথ প্রত্যাখ্যান করছে এবং ব্যর্থতার জন্য তাদের জবাবদিহির মুখোমুখি করতে চাইছে। এতে দেশটিতে জনঅসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এসব সংকটের মূল কারণ সমাধান করতে না পেরে পাকিস্তানের সামরিক শাসনব্যবস্থা তা বাইরে রপ্তানি করার চেষ্টা করছে। তারা আফগানিস্তানকে নিজেদের অভিযোগ ও আগ্রাসনের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। একই সঙ্গে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যার দায় ইমারাতে ইসলামিয়ার ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে, যাতে জনমতের সামনে নিজেদের দায়মুক্ত দেখানো যায়।

তবে বাস্তবতা এই বয়ানকে মিথ্যা প্রমাণ করে। কারণ পাকিস্তানকে নাড়া দেওয়া নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংকটগুলো ইমারাতে ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠার বহু বছর আগেই শুরু হয়েছিল। এগুলো ছিল ভুল নীতির সরাসরি ফল, যার প্রভাব আজও ক্রমেই আরও ভয়াবহ হচ্ছে।

রেডিও আল-হুররিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ কোনো সমাধান নয়। এটি সত্যের মুখোমুখি হওয়া থেকে পালানোর পথ। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, বাইরে সংকট তৈরি করে ভেতরের আগুন নেভানো যায় না। বরং এতে সংকট আরও বাড়ে এবং জনগণ ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে আস্থাহীনতা গভীর হয়।

দেশের ভেতরে সংকট বাড়তে থাকা অবস্থায় প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে নতুন ফ্রন্ট খোলা আরও বিচ্ছিন্নতা ও দুর্বলতা ডেকে আনে। এতে শাসকব্যবস্থার শক্তিক্ষয় আরও দ্রুত হয়।

প্রতিবেদনে আফগানিস্তানের ইতিহাসের কথাও তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আফগানিস্তানের ভূমি বড় বড় শক্তির ব্যর্থতার সাক্ষী। বহু শক্তি আফগানিস্তানকে জোর করে বশে আনতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা পরাজয়ের ভার নিয়ে এই ভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। তাই সামরিক চাপ বা বিমান হামলার মাধ্যমে আফগান জনগণের ইচ্ছাশক্তি ভেঙে দেওয়া যাবে, এমন ধারণা ইতিহাসের ভুল পাঠ এবং তার শিক্ষা উপেক্ষা করার শামিল।

রেডিও আল-হুররিয়া বলছে, বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানানো কোনো অজুহাতেই ন্যায্য হতে পারে না। এটি কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক বৈধতাও দিতে পারে না। ঘরবাড়ি, মসজিদ ও জনসেবা স্থাপনায় বোমা হামলা শুধু নিরপরাধ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। একই সঙ্গে ঘৃণা ছড়ায় এবং সহিংসতার নতুন চক্র তৈরি করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আফগান জনগণ ইতিহাসজুড়ে প্রমাণ করেছে, তারা কখনো আগ্রাসন মেনে নেয়নি। তাদের ভূমি ও জনগণের ওপর হামলা তাদের ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করে এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংকল্পকে আরও দৃঢ় করে।

রেডিও আল-হুররিয়া আরও জানায়, পাকিস্তান যদি সত্যিই নিরাপত্তা অর্জনে আন্তরিক হয়, তাহলে সেই পথ দেশের ভেতর থেকেই শুরু করতে হবে। নিজেদের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকট সমাধান করতে হবে। জনগণের সঙ্গে সংলাপে বসতে হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অন্যের বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার ভিত্তিতে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়, বোমা হামলা, হুমকি ও সামরিক চাপের নীতি পাকিস্তানকে নিরাপত্তা দেবে না। এসব নীতি তাদের ব্যর্থতাও আড়াল করতে পারবে না। বরং এতে তাদের বিচ্ছিন্নতা আরও বাড়বে এবং সংকট আরও গভীর হবে।

ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় নিজেদের অবিচল অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। দেশটির ওপর যে কোনো আগ্রাসন আফগানদের ঐক্য আরও শক্তিশালী করবে এবং মাতৃভূমি রক্ষার ইচ্ছাশক্তিকে আরও দৃঢ় করবে।

রেডিও আল-হুররিয়া বলছে, আফগানিস্তানের ওপর শক্তি প্রয়োগ করে নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার যে কোনো প্রকল্প ব্যর্থতার জন্যই নির্ধারিত। অতীতে যারা এমন চেষ্টা করেছে, তাদেরও একই পরিণতি হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের সামরিক শাসনব্যবস্থার এখন নিজেদের নীতি পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে। তাদের বুঝতে হবে, নিরপরাধ মানুষের রক্ত ঝরিয়ে, সংকট বাইরে রপ্তানি করে কিংবা বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে ইসরাইলি দখলদারিত্ব যে ধরনের পন্থা অনুসরণ করে, সে ধরনের পথ অবলম্বন করে টিকে থাকা যায় না।

ইতিহাস কাউকে ছাড় দেয় না। জুলুম স্থায়ী হয় না। যে শাসনব্যবস্থা আগ্রাসন ও সহিংসতাকে নিজেদের নীতির ভিত্তি বানায়, তাকে আজ হোক বা কাল, নিজের হাতের করা অপরাধের অনিবার্য পরিণতির মুখোমুখি হতেই হবে।

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ