spot_img

শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি: স্পিকার হাফিজ উদ্দিন

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা কে প্রথম দিয়েছিলেন, এ প্রশ্নকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্ক চলছে। বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে ভিন্নমত ও পাল্টা যুক্তিও সামনে এসেছে। এমন প্রেক্ষাপটে এবার এ বিষয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন বর্তমান জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভাঙার কোনো ইচ্ছা বা বিচ্ছিন্নতাবাদী হওয়ার কোনো বাসনা শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল না। তাই ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর ক্র্যাকডাউনের আগে তাজউদ্দিন আহমেদের অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি।

শনিবার (১১ জুলাই) ঢাকার মহাখালীর রাওয়া কনভেনশন সেন্টারে ‘দি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ইতিহাস ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন বলেন, স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে যে দলটি ক্ষমতায় আসলো, তারা বললো যে, ৭ই মার্চের একটা ভাষণ শুনেছি, ওই ভাষণেই দেশ স্বাধীন। মাঝখানে যে যুদ্ধ, হাজার হাজার মানুষ জীবন দিলো, লক্ষ মানুষ আত্মাহুতি দিলো, তার কোনো উল্লেখ নেই স্বাধীনতা যুদ্ধের পরবর্তীকালে ইতিহাসে।

১৯৭০ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি হয়েছিল ছয় দফার ভিত্তিতে। পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশকে যেভাবে তত্ত্বাবধান করে, যেভাবে সমৃদ্ধ করে, পূর্ব পাকিস্তান ছিল অবহেলিত। পূর্ব পাকিস্তানে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় না। তখনকার আন্দোলনটির নাম ছিল ‘সাম্যের আন্দোলন’। দুটি অঞ্চলের মধ্যে সমতা ছিল না। সম্পদের সমবণ্টন ছিল না। এজন্য পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ক্ষুব্ধ ছিল। এটিকে সম্বল করে আওয়ামী লীগ তৎকালীন নির্বাচনটি জিতেছিল।

স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গে স্পিকার বলেন, এমনকি যখন ক্র্যাকডাউন করলো পাকিস্তান আর্মি ২৫ মার্চ নিরীহ বাঙালিদের ওপরে। অব্যবহিত পূর্বে প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সাহেব, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে গিয়েছেন। গিয়ে বলেছেন যে পাকিস্তানিরা আক্রমণ করতে যাচ্ছে। দেশের মানুষ স্বাধীনতা চায়, এখনও সময় আছে, আপনি স্বাধীনতা ঘোষণা করুন।

তিনি আরও বলেন, কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব বললেন যে, না। আমি বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে পারি না। পাকিস্তান ভাঙাতে আমার কোনো অবদান থাকুক, এটি আমি চাই না। সুতরাং স্বাধীনতার ঘোষণা আমি দেবো না। তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। পাকিস্তানিরা ক্র্যাকডাউন চালালো। লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘর-বাড়ি ছেড়ে উদভ্রান্ত হয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। পাক বাহিনী মেশিনগান, মর্টার, কামান দিয়ে নিরীহ মানুষ গুলি করে হত্যা করছে।

হাফিজ উদ্দিন বলেন, এই সময়ে যেকোনো জাতি অবদমিত হয়ে যেতো, চুপচাপ হয়ে আত্মসমর্পণ করতো। জনগণের পক্ষে, মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষার জন্যে, দেশের মানুষের জীবন রক্ষার জন্যে বিপুল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। এই সময় স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন মেজর জিয়াউর রহমান। এটি হলো প্রকৃত সত্য।

তিনি বলেন, যে ঘোষণায় জাতি উদ্দীপ্ত হয়েছে, অনুপ্রাণিত হয়েছে। হাজার হাজার ছাত্র-যুবক ঘর-বাড়ি ছেড়ে দৌড়ে এসেছে যে যুদ্ধ করবে। ১৯৭১ যারা দেখেনি তারা দুর্ভাগা। আমরা ভাগ্যবান ১৯৭১ সাল দেখতে পেয়েছি।

রাজনীতিবিদেরা সাধারণত অন্যের কৃতিত্ব হাইজ্যাক করে উল্লেখ করে স্পিকার বলেন, কাউকে কৃতিত্ব দিতে চান না নিজেরা এবং নিজের দলীয় নেতাকে ছাড়া। কিন্তু প্রকৃত তথ্য হলো ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনতার যুদ্ধ, একটি জাতির যুদ্ধ। পাকিস্তানিরা ভুল করেছিল—একটা আর্মি আরেকটা আর্মির সাথে যুদ্ধ করতে পারে, কিন্তু পাকিস্তানিরা বাঙালি জাতির সাথে যুদ্ধ করতে চেয়েছিল, এই কারণেই পরাজিত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জাতির সাথে যুদ্ধ করা কোনো সামরিক বাহিনীর কাজ নয়। এই যে ভুল তারা করেছে, যে কারণে তাদের এই পরিণতি হয়েছে, ৯০ হাজার এখানে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে।

স্পিকার বলেন, ১৯৭১-এর এই গৌরবময় অধ্যায়, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাঁচটি ব্যাটালিয়ন—তখন একটি ছিল প্রথম ইস্ট বেঙ্গল যশোরে, দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল জয়দেবপুরে, তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল সৈয়দপুরে, চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল কুমিল্লায় এবং অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল চট্টগ্রামে। পাঁচটি সেনানিবাসে আলাদাভাবে কেউ কারও সাথে যোগাযোগ না রেখে বিদ্রোহ করেছে পাকিস্তানিদের গণহত্যার প্রতিবাদে।

তিনি আরও বলেন, প্রতিবাদ করে তারা জনগণকে সংগঠিত করেছে, মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন, জনগণকে আহ্বান জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্যে, সেই জন্যই নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হতে পেরেছে। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ নয়, বাঙালিদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ। এই যুদ্ধে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছে বাঙালিরা, সেই জন্য আমি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ