মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে প্রতিনিয়ত লক্ষ্যবস্তু করছে ইরান। এসব হামলায় ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতি ও সামরিক তৎপরতার তথ্য প্রকাশ ঠেকাতে সেনাদের মোবাইল ফোন জমা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে আমেরিকা। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) শীর্ষ কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার সতর্ক করে বলেছেন, সেনাদের মোবাইল ফোনে ধারণ করা এবং অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া ভিডিও ইরানকে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ কারণে সেনাদের মোবাইল ফোন জমা দেওয়ার নির্দেশনা শিগগিরই জারি করা হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোবাইল ফোন ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত হাজার হাজার মার্কিন সেনার জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি হবে। কারণ অনেক সেনাই পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের জন্য মোবাইল ফোনের ওপর নির্ভরশীল।
এর আগে এক গোপন চিঠিতে অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেন, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও অনলাইন পোস্ট বিশ্লেষণ করে ইরান নিজেদের হামলার সাফল্য বা ব্যর্থতা প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারছে। চিঠিতে মার্কিন সেনাদের মোবাইল ফোনে ধারণ করা প্রতিক্রিয়া, ছবি ও ভিডিও ফুটেজের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
গতকাল লেখা ওই চিঠিতে ব্র্যাড কুপার বলেন, অবাধে পাওয়া এ ধরনের গোয়েন্দা তথ্যের জন্য সেনা ও বেসামরিক মানুষকে জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হচ্ছে। চিঠিটির একটি কপিও রয়টার্সের হাতে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের ঘন ঘন হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া জর্ডানের একটি ঘাঁটিতে অবস্থানরত সেনাদের মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। খুব দ্রুতই এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে পারে।
তৃতীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, কার্যক্রমগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে পুরো অঞ্চলে একই ধরনের পদক্ষেপ বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে সেনাদের মোবাইল ফোন জমা নেওয়ার সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এ বিষয়ে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিমোথি হকিন্স বলেন, সেনাসদস্যদের অভিযানের নিরাপত্তা বজায় রাখার স্বার্থেই এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এটি সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি অংশ।
চলতি মাসে অনলাইনে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ১৭ জুলাই জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ইরানের প্রাণঘাতী হামলার সময় মার্কিন সেনারা আশ্রয়ের জন্য দৌড়াচ্ছেন। ভিডিওটি একজন মার্কিন সেনাসদস্য ধারণ করেছিলেন।
কুপার তার চিঠিতে উল্লেখ করেন, ফুটেজটি মেটা স্মার্ট গ্লাসের ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছিল। পরে ওই সেনাসদস্য ভিডিওটি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেন। সেখানে দেখা যায়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সময় তিনি কোথায় এবং কীভাবে একটি বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, এ ধরনের তথ্য প্রকাশিত না হলে ইরানের পক্ষে তাদের হামলা কতটা সফল বা ব্যর্থ হয়েছে, তা নির্ধারণ করা কঠিন হতো। কারণ মার্কিন সামরিক বাহিনীর ইলেকট্রনিক জ্যামিং ও অন্যান্য যুদ্ধকৌশল হামলার প্রকৃত ফলাফল আড়াল করতে সক্ষম।
কুপার আরও লিখেছেন, ইরান জানতে পারছে তাদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্য থেকে ৫০ মিটার দূরে পড়েছে, কোনো ফাঁকা রানওয়েতে আঘাত করেছে, নাকি জনবহুল কোনো স্থাপনায় আঘাত হেনেছে।
তার মতে, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হামলার স্থান, ক্ষয়ক্ষতি ও বিশ্লেষণের বিস্তারিত তথ্য ইরানের জন্য বিনা মূল্যে যুদ্ধক্ষেত্রের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন বা ব্যাটল ড্যামেজ অ্যাসেসমেন্টের (বিডিএ) কাজ করছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরানের সঙ্গে সংঘাতে প্রায় ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৬০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। এসব হতাহতের ঘটনা এমন একটি যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনগণের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যেটিকে প্রতি তিনজন আমেরিকানের মধ্যে মাত্র একজন সমর্থন করেন।
সেনাদের মোবাইল ফোন কি কেড়ে নেওয়া হবে
কর্মকর্তারা বলছেন, মোতায়েন করা সেনাদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের নিয়ম বিভিন্ন বাহিনীতে ভিন্ন হতে পারে। অনেক সেনাকে তাদের মোবাইল ফোন তালাবদ্ধ স্থানে জমা রাখতে হতে পারে। বিশেষ করে সংবেদনশীল মিশনের ক্ষেত্রে এ ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে।
মার্কিন কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, মোবাইল ডিভাইসের কিছু নির্দিষ্ট অ্যাপ্লিকেশন, বিশেষ করে ফিটনেস অ্যাপ, অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে। শত্রুপক্ষ এসব তথ্য লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে ব্যবহার করতে পারে।
এদিকে নিরাপত্তাজনিত কারণে তথ্য প্রকাশের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে পেন্টাগন। সংস্থাটি প্রায়ই ইরানের হামলার দাবি কিংবা মার্কিন সেনাদের হতাহতের নির্দিষ্ট ঘটনার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে।
কুপার বলেন, হামলার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হলে তা ইরানকে পরবর্তী হামলার পরিকল্পনা করতে সহায়তা করতে পারে। এ ধরনের তথ্য জনসমক্ষে চলে এলে ইরানি বাহিনী আরও দ্রুত ও বিধ্বংসী দ্বিতীয় হামলা চালানোর সুযোগ পেতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স










