প্যারিসের নিকটে থিম পার্ক নির্মাণ সহ ফ্রান্সের সাথে সৌদির একাধিক চুক্তি
প্যারিস থেকে ৩০ কিলোমিটারের দূরত্বে ৭ বিলিয়ন ডলারের থিম পার্ক নির্মাণ সহ জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, এআই ও পর্যটন খাতে ফ্রান্সের সাথে একাধিক চুক্তি সাক্ষর করেছে সৌদি আরব।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ভবন এলিসিতে এই চুক্তি সাক্ষরিত হয়।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর উপস্থিতিতে সাক্ষরিত চুক্তিগুলোর লক্ষ্য হলো দুই দেশের অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও জোরদার করা। এছাড়া প্যারিসে থিম পার্ক নির্মাণের ফলে প্রায় ২২ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
ফরাসি প্রেসিডেন্টের কার্যালয় প্যারিসে সৌদির থিম পার্ক নির্মাণ সম্পর্কে জানায়, প্যারিসের প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সারজি-পন্তোয়াজের কাছে তিনটি থিম পার্ক নির্মাণ করা হবে। তন্মধ্যে একটির থিম জাপানি কমিক্সের মাঙ্গা-ভিত্তিক হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে প্রায় ২২ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সৌদি আরবের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের বিনিয়োগ সংস্থা কিদ্দিয়া প্রকল্পটির নেতৃত্ব দিবে।
ম্যাক্রোঁ প্রকল্পটিকে ‘অসাধারণ’ বলে উল্লেখ করে বলেন, এটি ডিজনিল্যান্ড প্যারিসের সমপর্যায়ের ‘নতুন বৈশ্বিক গন্তব্য’ তৈরি করবে। ফরাসি দক্ষতার ওপর আস্থা রাখার জন্য তিনি কিদ্দিয়া ও সৌদি আরবকে ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে তিনি প্রকল্পটিকে তার ‘চুজ ফ্রান্স’ (Choose France) বা ‘ফ্রান্সকে বেছে নিন’ উদ্যোগের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন। এ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এমন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।
ম্যাক্রোঁ বলেন, “বিশ্বকে আরও চমকে দেওয়ার কাজ এখনো শেষ হয়নি। এই অর্জন নিয়ে আমরা খুবই গর্বিত।”
ফরাসি প্রেসিডেন্টের একজন উপদেষ্টা জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে রিয়াদে ম্যাক্রোঁ ও এমবিএসের (মুহাম্মদ বিন সালমানের) আলোচনার সময় প্রকল্পটির ধারণা আসে। ওই সময় দুজনের মধ্যে মাঙ্গা, বিশেষ করে ‘ড্রাগন বল জেড’-এর প্রতি তাদের ‘অভিন্ন আগ্রহের’ বিষয়টি উঠে আসে।
সৌদি যুবরাজের এবারের ফ্রান্স সফরে জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিমান চলাচলে অর্থায়ন, পরিবহন ও স্বাস্থ্য খাতেও বিভিন্ন চুক্তি হয়। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারে একটি অভিপ্রায়পত্রও সই হয়েছে। এতে সাইবার নিরাপত্তা, এআই প্রশিক্ষণ ও সামরিক প্রশিক্ষণে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়গুলোও রয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদক বার্নার্ড স্মিথ বলেন, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা বাজার ফরাসি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব নতুন কৌশলগত অংশীদার খুঁজছে। তাই দেশটির প্রতিরক্ষা খাতে ফ্রান্সের ভূমিকা ধরে রাখতে চায় ফ্রান্সের সরকার।
এই সফরে ফরাসি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আরও দুটি চুক্তি হয়েছে। সিএমএ সিজিএম ৪৩ কোটি ৪০ লাখ ডলারের বিনিময়ে লোহিত সাগরের তীরে সৌদি আরবের ‘জেদ্দা ইসলামিক বন্দর’ উন্নয়নেও সহায়তা করবে। আর আলস্টম ৫৮ কোটি ডলারের চুক্তির আওতায় রিয়াদ মেট্রোর জন্য মেট্রো কোচ সরবরাহ করবে।
ফ্রান্সে এটি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের তৃতীয় সরকারি সফর। সৌদি আরব যখন ঐতিহ্যগত অংশীদারদের বাইরে নিরাপত্তা সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে, তখন এ সফর অনুষ্ঠিত হলো। তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে চলতি মাসের শুরুতে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সইয়ের পর এটিই ছিল সৌদি যুবরাজের প্রথম বিদেশ সফর।
অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা আলোচনার পাশাপাশি ম্যাক্রোঁ ও মুহাম্মদ বিন সালমান বিভিন্ন আঞ্চলিক সংকট নিয়ে যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন।
দুই পক্ষই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত আলোচনার মাধ্যমে অবসানের আহ্বান জানিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছে। তারা হামাসের নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে এবং গাজ্জায় ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীদের অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ বন্ধে একটি টেকসই যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
এছাড়া ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইহুদিবাদী ইসরাইলের সেনাদের প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। সমর্থন জানিয়েছে সিরিয়ার স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে। সৌদি আরব ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর ইয়েমেনের হুথিদের হামলারও নিন্দা জানিয়েছে দুই পক্ষ।
সূত্র: আল জাজিরা










