নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৬২ জনে দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ১ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধার কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার হেলিকপ্টার ও ড্রোনের সহায়তায় অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
নেপাল পুলিশ ৩৫৯ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। তাদের হিসাবে পর্যটক, বিদেশি নাগরিক, বেসামরিক কর্মকর্তা, সেনাসদস্য, পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাসহ ৮২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। কাঠমান্ডু পোস্ট এ তথ্য জানিয়েছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বৃহস্পতিবার নুয়াকোট জেলার বিদুরে গিয়ে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
নেপাল পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, সীমান্তের নেপাল অংশে ৬৫০-এর বেশি দেশি-বিদেশি পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন।
তাদের মধ্যে আমেরিকার ৬৫ জন, ইউক্রেনের ৫৩, মালয়েশিয়ার ৫১, অস্ট্রেলিয়ার ৩৫, যুক্তরাজ্যের ৩৩, কানাডার ২৫, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার নয়জন করে এবং জার্মানির আটজন নাগরিক রয়েছেন।
ভারত সরকার জানিয়েছে, দুর্যোগের পর নেপালের অংশে তাদের ২৮৮ নাগরিকের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
চীনা কর্তৃপক্ষ তিব্বতে তিনজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। সেখানে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। চীন অঞ্চলটিকে শিজাং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল নামে উল্লেখ করে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান জানিয়েছেন, তিব্বতে নিখোঁজদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, নেপালের অংশে আকস্মিক বন্যার পর ১০০ চীনা নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন।
নেপাল সরকার রাসুওয়া, নুয়াকোট ও ধাদিংকে তিন মাসের জন্য ‘দুর্যোগ সংকট এলাকা’ ঘোষণা করেছে।
দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ হেলিকপ্টার ও ড্রোন পরিচালনাকারীদের জেলা প্রশাসন, নিরাপত্তা সংস্থা ও স্থানীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার কার্যক্রম চালাতে বলেছে।
আটকে পড়া বাসিন্দাদের নিজেদের অবস্থান জানানোর জন্য আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া তৈরিরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, যেসব ভারতীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না, তাদের মধ্যে ৭৩ জন ত্রিশুলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করতেন।
তিনি বলেন, “ওই এলাকার যোগাযোগ লাইন পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এ কারণে সেখানে থাকা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।”
স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, রাসুওয়া-রাসুওয়াগাধি সীমান্ত ক্রসিং থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে হিমালয়ের একটি হিমবাহ থেকে বড় একটি বরফখণ্ড ভেঙে পড়ার কারণে বন্যা সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।
ভেঙে পড়া বরফ ও পাথর নিচের ভোতেকোশি নদীতে গিয়ে পড়ে।
নেপাল সরকার জানিয়েছে, বাস্তুচ্যুত বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বেসরকারি হেলিকপ্টার পরিচালনাকারীদেরও যুক্ত করা হয়েছে।
নেপাল সেনাবাহিনী শত শত সেনাসদস্য ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করেছে। মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হেলিকপ্টারও ব্যবহার করা হচ্ছে।
বাগমতি প্রদেশের চিতওয়ান জেলায় সবচেয়ে বেশি ৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরপর ধাদিংয়ে ২৭ জন এবং নাওয়ালপরাসি ইস্টে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, তাদের ২৮ সদস্যও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যায় ১৯টি সেতু এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের প্রায় ৪০ কিলোমিটার অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে পরিবহন ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি উদ্ধার তৎপরতাও জটিল হয়ে পড়েছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, বন্যায় কয়েকটি জেলায় “চরম ক্ষয়ক্ষতি” হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য প্রাথমিক পর্যায়ের বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
নুয়াকোট, ধাদিং, গোরখা ও চিতওয়ান জেলার ভোতেকোশি ও ত্রিশুলি নদীর তীরবর্তী এলাকায় ঝুঁকি এখনো বেশি থাকায় তিনি সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভারত, চীন ও বিশ্বব্যাংক বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্গঠন কার্যক্রমে আর্থিক সহায়তা সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, নয়াদিল্লি নেপালের জন্য দ্বিতীয় একটি উড়োজাহাজে ৩৭ দশমিক ৫ টন মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলা সামগ্রী, ওষুধ এবং খাদ্যপ্যাকেট পাঠিয়েছে।
এদিকে চীনের গিরং কাউন্টিতে ভূমিধসে অন্তত তিনজন নিহত এবং ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শিজাং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের গিরং বন্দরে ভূমিধস আঘাত হানে।
চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির একটি সমন্বয়কারী দল বৃহস্পতিবার দুর্গত এলাকায় পাঠানো হয়েছে। তারা সামরিক সদস্যদের যৌথ উদ্ধার কার্যক্রম সমন্বয় করবে।
গিরং সীমান্ত ক্রসিং চীন ও নেপালের মধ্যে পর্যটক ও যানবাহন চলাচলের প্রধান সীমান্তপথ।
স্টেট গ্রিড শিজাং ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড গিরং শহরে জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
চীনের জরুরি ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার প্রশাসন দুর্যোগকবলিত এলাকায় ১০০-এর বেশি দমকলকর্মী ও উদ্ধারকর্মী পাঠিয়েছে।
উদ্ধারকারী দল বহনকারী প্রথম চার্টার্ড উড়োজাহাজ বৃহস্পতিবার ভোরে শিগাৎসে শহরের একটি বিমানবন্দরে পৌঁছেছে।











