আফগানিস্তানকে মার্কিন দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত করার পর দেশটিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নষ্ট করা, ইমারাতে ইসলামিয়ার সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা, ইসলামি সরকারের কার্যক্রমকে জটিল করে তোলা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের ওপর নানা ধরনের চাপ প্রয়োগের জন্য বেশ কয়েকটি চেষ্টা চালানো হয়েছে।
এসব প্রচেষ্টার মধ্যে অন্যতম ছিল গত পাঁচ বছরে আফগানিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য সশস্ত্র সেল সক্রিয় করা। এসব তৎপরতার শুরু হয় দায়েশের সদস্যদের এবং তথাকথিত প্রতিরোধ ফ্রন্ট-এর সদস্যদের সক্রিয় করার মাধ্যমে। এই ফ্রন্টে উত্তর জোটের কিছু বিদ্রোহীও যোগ দিয়েছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল সন্দেহজনক বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা।
তৎকালীন নবগঠিত সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল একাধিক ফ্রন্টে এসব গোষ্ঠীর মোকাবিলা করা। প্রধান শহরগুলোতে দায়েশের সেলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে। কারণ, সংগঠনটি তাদের রক্তাক্ত অপরাধমূলক হামলায় বাজার, স্কুল, মসজিদ ও জনবহুল আবাসিক এলাকাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল।
অন্যদিকে, গ্রামাঞ্চল, প্রত্যন্ত এলাকা, দুর্গম গিরিপথ, সুউচ্চ পাহাড় ও উপত্যকায়, বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলের পাঞ্জশির ও বাগলান প্রদেশে, তথাকথিত প্রতিরোধ ফ্রন্ট-এর কিছু বিদ্রোহীর সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়েছে। বিভিন্ন বিদেশি পক্ষ এই প্রতিরোধ-এর পেছনে ছিল।
ইমারাতে ইসলামিয়া এই বড় দায়িত্ব ও গুরুতর চ্যালেঞ্জ নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়। ২০ বছর দখলদারিত্বের সময় যেমন তারা নিজেদের দ্বীন, ভূমি ও জনগণকে রক্ষায় আমেরিকার নেতৃত্বে ৪০টিরও বেশি দেশের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল, তেমনি দখলদারিত্ব উৎখাতের পর পশ্চিমারা যে ব্যর্থ কাজ অসমাপ্ত রেখে গিয়েছিল, তা শেষ করার লক্ষ্যে তাদের রেখে যাওয়া অবশিষ্টাংশ ও সেলগুলো নির্মূলের উদ্যোগ নেয়।
এই ধারাবাহিকতায় আফগান নিরাপত্তা বাহিনী রাজধানী কাবুলসহ অন্যান্য শহর ও এলাকায় দায়েশের সেলগুলোর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা সংগঠনটির অধিকাংশ সদস্য ও নেতাকে নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়। অন্যরা পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় পালিয়ে যায়।
অন্যদিকে, পাঞ্জশির ও বাগলানে তথাকথিত প্রতিরোধ ফ্রন্ট-এর বিদ্রোহী এবং বিচার থেকে পালিয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দেওয়া কিছু উচ্ছৃঙ্খল ও নীতিভ্রষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আফগান সরকার সামরিক ইউনিট ও ব্যাটালিয়ন পাঠায়। তারা বিদ্রোহীদের ওপর আঘাত হানতে সক্ষম হয়। আর যারা বেঁচে যায়, তারা তাজিকিস্তান, ইরান, পাকিস্তান ও অন্যান্য এলাকায় পালিয়ে যায়।
এখনও বিভিন্ন বিদেশি পক্ষ, বিশেষ করে আমেরিকা এবং পাকিস্তানের জনগণের ওপর চেপে বসা সামরিক শাসকগোষ্ঠীসহ অন্যরা, আফগান সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি ও দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে এসব সেলের কিছু সদস্যকে সক্রিয় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এসব প্রচেষ্টার মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাদাখশান প্রদেশে ফিতনা সৃষ্টি করা। সেখানে জমা খান নামে স্থানীয় এক নেতাকে সক্রিয় করা হয়। পরে তিনি ও তার সদস্যরা পাহাড়ে আশ্রয় নেয়।
আফগান সরকার মধ্যস্থতাকারী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তাদের বাড়াবাড়ি ও অবাধ্যতা থেকে সরে এসে বিদ্রোহের অবসান ঘটানোর জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করে। কিন্তু জমা খান বিদ্রোহ অব্যাহত রাখা এবং রাষ্ট্রের বাইরে থাকা ব্যক্তিদের হাতে অননুমোদিত অস্ত্র রাখার বিষয়ে অনড় থাকায় সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাতে বাধ্য হয়। ওই অভিযানে জমা খান ও তার সব সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিপুল পরিমাণ অস্ত্রও জব্দ করা হয়। পাশাপাশি এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়, যা জমা খানের তথাকথিত প্রতিরোধ ফ্রন্ট ও অন্যান্য পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
আফগান নিরাপত্তা বাহিনী ‘হাসিব কাওয়াই মারকাজ’ নামে আরেক নেতাকেও তার কয়েকজন সদস্যসহ লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম হয়। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অপহরণ, ব্যবসায়ী ও দোকান মালিকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় এবং কয়েক বছর আগের ধর্ষণের মতো বিভিন্ন অভিযোগ ছিল।
আমেরিকা ও পশ্চিমাদের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও সাবেক প্রশাসন এই অপরাধীকে অপরাধ চালিয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারেনি। কারণ সাবেক সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন ব্যক্তি ও উত্তর জোট তার পেছনে ছিল। তারা নিজেদের পরিকল্পনা ও এজেন্ডা বাস্তবায়নে তার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে ব্যবহার করত।
এভাবেই গত পাঁচ বছরে বর্তমান আফগান সরকার অধিকাংশ অপরাধীকে নিষ্ক্রিয় করতে, বহু বিদেশি ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করতে এবং পশ্চিম ও অঞ্চলে তাদের সহযোগীদের হয়ে কাজ করা প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কঠোর হাতে ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর কিছু শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তারা আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা নষ্ট করাকে নিজেদের স্বার্থ ও দুরভিসন্ধিমূলক লক্ষ্য অর্জনের একটি উপায় হিসেবে দেখে।
গত পাঁচ বছরে যা ঘটেছে, তা দেখিয়ে দিয়েছে যে নতুন আফগানিস্তান আর আগের মতো নেই। দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এখন বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও সক্ষম হয়ে উঠেছে। ফিতনা ছড়ানো, সেল ও বিদ্রোহীদের সক্রিয় করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে এখন কঠোর ও দৃঢ় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আফগানিস্তানের শত্রুরা যখন দেশটির পরিস্থিতি অস্থিতিশীল ও জটিল করে তোলার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে, তখন সরকারও নিরাপত্তা সুসংহত করা, বিদ্রোহীদের নিষ্ক্রিয় করা এবং দেশের স্থিতিশীলতা লক্ষ্য করে পরিচালিত ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র: হুরিয়াত রেডিও











