ভারতীয় নাগরিকত্ব ও পরিচয়ের পক্ষে একাধিক সরকারি নথি থাকার পরও পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম নারী সাহিদা ফকিরকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহে নাভি মুম্বাইয়ে আটক করার পর বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে। প্রায় এক মাস ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করা সাহিদাকে ভারতে ফিরিয়ে নিতে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চেয়েছে জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন (NCM)।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম মাকতুবের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
সাহিদার পরিবারের পক্ষ থেকে তার ভারতীয় নাগরিকত্ব ও পরিচয় প্রমাণে একাধিক সরকারি নথি জমা দেওয়া হয়েছিল। এরপরও তাকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহে আটক করা হয়। পরে আসামে নিয়ে গিয়ে আরও কয়েকজনের সঙ্গে তাকে বাংলাদেশ সীমান্ত পার করে দেওয়া হয়।
সাহিদার স্বামী জুম্মান ফকির জানান, স্ত্রীকে ছাড়া দুই সন্তান, সংসার ও কাজ একসঙ্গে সামলানো তার জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, “প্রতিদিন কাজে যাওয়ার আগে ঘরের কাজ করি, রান্না করি, বাসন ও কাপড় ধুই, বাচ্চাদের স্কুলের জন্য প্রস্তুত করি এবং তাদের টিফিন বানিয়ে দিই। সে যখন এখানে ছিল, এসব নিয়ে আমাকে কখনো চিন্তা করতে হতো না।”
জুম্মান জানান, তিনি কাজে থাকাকালে স্কুল থেকে ফেরার পর সন্তানদের দেখাশোনা করতেন সাহিদা। তার কাজ থেকে ফেরার আগেই খাবারও প্রস্তুত করে রাখতেন।
তিনি বলেন, “এখন আমি যখন কাজে থাকি আর বাচ্চারা বাড়িতে থাকে, তখন সবসময় তাদের নিয়ে দুশ্চিন্তা হয়। আমার অনুপস্থিতিতে পুলিশ যদি তাদেরও বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দিয়ে পাঠিয়ে দেয়? আমি সবসময় ভয় নিয়ে থাকি।”
বাচ্চাদের দেখাশোনার মতো আর কেউ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, “তারা আগে কখনো একটি ডিমও সেদ্ধ করেনি। এখন নিজেরাই করছে। কখনো কখনো তাদের হাতও পুড়ে যায়। তাকে ছাড়া আমরা নিজেদের খুব অসহায় মনে করি।”
স্ত্রীকে ছাড়া বাড়িটি আর ‘ঘর’ মনে হয় না বলেও জানান জুম্মান।
তিনি বলেন, “এটা তো শুধু একটা বাড়ি। একজন নারীর উপস্থিতিতেই বাড়ি ঘর হয়ে ওঠে।”
প্রতি রাতে সন্তানদের ঘুম পাড়ানোর সময় তাদের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় বলেও জানান তিনি। সন্তানরা জানতে চায়, তাদের মা কোথায় এবং কবে ফিরবেন। কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর তার নিজের কাছেও নেই।
জুম্মান বলেন, “দেশ ও জাতীয়তার বিষয়টি তারা বোঝে। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই একজন মানুষকে কীভাবে অন্য একটি দেশে পাঠিয়ে দেওয়া যায়, সেটাই তারা বুঝতে পারে না।”
স্ত্রী দূরে থাকার পর সংসারে তার ভূমিকার প্রতি নিজের সম্মান আরও বেড়েছে বলেও জানান তিনি।
জুম্মান বলেন, “আমি সবসময় ভাবতাম, সে কীভাবে একা হাতে সবকিছু সামলায়। এখন সেই বিস্ময় আর সম্মান আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে।”
তিনি জানান, প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিয়ে একাধিকবার পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন। শুরুতে তাকে বলা হয়েছিল, তিন থেকে চার দিনের মধ্যে সাহিদাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু কয়েক দিন পর পুলিশ জানায়, তাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জুম্মান বলেন, “আমি তাদের সব নথি দেখিয়েছি। কিন্তু তারা বলেছে, সেগুলো জাল। সব নথি কীভাবে জাল হতে পারে? নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য কেউ যদি সব নথিই জাল করতে পারে, তাহলে কর্তৃপক্ষের কাছেই প্রশ্ন, তাদের উপস্থিতিতে এটা কীভাবে সম্ভব হলো?”
তিনি আরও বলেন, “আমি তাদের এটাও বলেছি, সে যদি বাংলাদেশি হয়, তাহলে তার সব ভাইবোন ও আত্মীয়স্বজন কীভাবে ভারতীয়? তাহলে সবাইকেই বাংলাদেশে পাঠানো হোক। শুধু তাকেই কেন?”
জুম্মানের ভাষ্য অনুযায়ী, নাভি মুম্বাই পুলিশ তাকে বলেছিল, সাহিদার আত্মীয়স্বজন ও পরিবারের অন্য সদস্যরাও বাংলাদেশি এবং তাদের প্রতি পুলিশ ‘দয়া’ দেখাচ্ছে।
এর জবাবে জুম্মান প্রশ্ন করেন, “তাহলে সাহিদার প্রতি তারা দয়া দেখাতে পারল না কেন? যে দেশ তার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা, সেখানে তাকে কেন পাঠিয়ে দেওয়া হলো?”
বাংলাদেশ সীমান্ত পার করে দেওয়ার পর কাদামাখা মাঠ দিয়ে প্রায় আট ঘণ্টা হেঁটে সাতক্ষীরায় পৌঁছান সাহিদা। বর্তমানে সেখানে একটি স্থানীয় পরিবারের কাছে আশ্রয় নিয়ে আছেন তিনি।
জুম্মানের কাছে সাহিদা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে স্থানীয় পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা তার চলাফেরা ও কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখছেন।
বাংলাদেশে আসার পর থেকে দুই থেকে তিনবার স্বামীর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে সাহিদার।
জুম্মানের কাছে তিনি বলেন, “স্থানীয় পুলিশ আমাকে যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে চলে যেতে বলছে। বিজিবির পাশাপাশি তারাও আমার ওপর নজর রাখছে।”
সাহিদা আরও জানিয়েছেন, ভারত তাকে ফিরিয়ে না নিলে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের অভিযোগে তাকে আটক করে হেফাজতে রাখা হতে পারে।
স্ত্রীকে কীভাবে ভারতে ফিরিয়ে আনবেন, তা বুঝতে পারছেন না জুম্মান। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও কোনো সহায়তা পাচ্ছেন না বলে জানান তিনি।
জুম্মান বলেন, “আমি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার কথা ভাবছি, কিন্তু আমার কাছে যথেষ্ট টাকা নেই।”
এর আগে পশ্চিমবঙ্গ পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চ এবং উত্তর ২৪ পরগনার গোবিন্দপুরের বাসিন্দারা সাহিদাকে ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন পর্যায়ে কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।
মানবাধিকার সংগঠন বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (MASUM) সাহিদার আটক, তাকে ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং বাংলাদেশে পাঠানোর বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টেরও দ্বারস্থ হয়েছে।
এ ছাড়া ১১ আগস্ট মানবাধিকারকর্মী ও দিল্লি সংখ্যালঘু কমিশনের সাবেক উপদেষ্টা মোহাম্মদ সাদ্দাম মুজিব ভারতের জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করেন।
এর ধারাবাহিকতায় ২৪ আগস্ট জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দিয়ে বিষয়টিতে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বলে।
সাদ্দাম মুজিব বলেন, বিষয়টির সঙ্গে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সংখ্যালঘু অধিকার, পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং বৈধভাবে জাতীয়তা নির্ধারণের মতো গুরুতর প্রশ্ন জড়িত।
তিনি বলেন, “প্রত্যেক নাগরিকের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া পাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং প্রত্যেক পরিবারই ন্যায়বিচার পাওয়ার যোগ্য।”
সূত্র : মাকতুব











