spot_img
spot_imgspot_img

হুথিদের অগ্রগতিতে সৌদি-ইরান যোগাযোগে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা

ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুথিদের দ্রুত অগ্রগতিতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। হুথিরা কৌশলগত মোখা বন্দর দখলের পর বাব-এল-মান্দেব প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপগুলোর দিকে অগ্রসর হয়েছে। শুক্রবার ইয়েমেনি সরকারি চারটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, হুথিরা কৌশলগত পেরিম দ্বীপেও পৌঁছেছে। এতে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব-এল-মান্দেব নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। এরই মধ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে পৃথক ফোনালাপ করেছেন।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাতে ওই দুই ফোনালাপ হয়। এর আগে মঙ্গলবার হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি আরবের চারটি শহরে ৭৩ জন আহত এবং কয়েকটি তেল স্থাপনায় আগুন ধরে যায় বলে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি।

পরদিন বৃহস্পতিবার ভোরে ইরান-সমর্থিত হুথি যোদ্ধারা ইয়েমেনের উপকূলীয় শহর মোখা দখল করে লোহিত সাগর উপকূল ধরে কৌশলগত দ্বীপগুলোর দিকে অগ্রসর হয়। ইয়েমেনি সরকারি সামরিক সূত্রের দাবি, তারা হানিশ দ্বীপপুঞ্জেও পৌঁছেছে। পরে শুক্রবার পেরিম দ্বীপে পৌঁছানোর খবর পাওয়া যায়। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর দুটি সূত্র জানিয়েছে, তারা পেরিম দ্বীপ থেকে সরে গেছে এবং হুথিরা দ্বীপটির মুখোমুখি মূল ভূখণ্ডের ধুবাব শহরও দখলে নিয়েছে।

হুথিদের এই অগ্রগতিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাব-এল-মান্দেব প্রণালি নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে ইরানের জন্য হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি আরব হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার পর লোহিত সাগরপথের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

বৃহস্পতিবার স্যাটেলাইট ছবিতে সৌদি আরবের প্রধান হরমুজ-বিকল্প তেল পরিবহনপথ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের একটি অংশে আগুন দেখা গেছে বলে জানা যায়। প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল ইয়ানবু বন্দরে নেওয়া হয়। তবে পাইপলাইনে হামলার বিষয়টি সৌদি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি।

পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা

হুথিদের হামলা সৌদি ভূখণ্ডে আরও ছড়িয়ে পড়লে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সক্রিয় করা হতে পারে বলে চলতি সপ্তাহে সতর্ক করেছিলেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ।

তবে বৃহস্পতিবার রাতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের তেহরানে ফোন করার পর প্রশ্ন উঠেছে, পাকিস্তান কি সামরিকভাবে কোনো পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে, নাকি কূটনীতিকেই সমাধানের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান সৌদি আরব ইরানকে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রাখার বার্তা পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠিয়েছে, এমন খবর নিশ্চিত করেননি। তিনি এটিকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেন।

সৌদি আরব পাকিস্তানকে ইয়েমেনে হুথিদের অবস্থানে হামলা চালানোর অনুরোধ করেছে, এমন খবরও তিনি নাকচ করে বলেন, বিষয়টি কাল্পনিক এবং এ ধরনের কোনো আলোচনা হয়নি।

তবে ইরানের মাধ্যমে পাকিস্তান হুথিদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে কি না, এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেননি তিনি। বরং পাকিস্তান বৃহত্তর অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সংলাপ ও কূটনীতি চালিয়ে যাবে বলে জানান।

একই সঙ্গে সাজ্জাদ হায়দার খান জানিয়েছেন, বর্তমানে হুথিদের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। তিনি বলেন, সময় এলে পাকিস্তান চুক্তি অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে। গত মাসে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যে কোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

ইসলামাবাদের ইনস্টিটিউট অব রিজিওনাল স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট ও সাবেক পররাষ্ট্রসচিব জওহর সেলিম বলেন, কূটনীতিতে ইচ্ছাকৃতভাবে যা বলা হয় না, অনেক সময় সেটিও প্রকাশ্য বক্তব্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থানে নিরুৎসাহিতকরণ ও উত্তেজনা প্রশমনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

তেহরানের সঙ্গে মুনিরের যোগাযোগ

এপ্রিলের পর পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির চারবার তেহরান সফর করেছেন। সর্বশেষ সফরটি হয় গত মাসে। এর কয়েক দিন আগে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন।

ইরানের কূটনৈতিক যোগাযোগ সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র আলজাজিরাকে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক উত্তেজনা শুরুর পর পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে টেলিফোন কূটনীতি আরও বেড়েছে। গত এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিনে মুনির ও আরাঘচির মধ্যে তিন থেকে চারবার ফোনালাপ হয়ে থাকতে পারে বলে ওই সূত্রের দাবি। এর মধ্যে মাত্র দুটি ফোনালাপ প্রকাশ্যে এসেছে।

এদিকে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সৌদি ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গেও পৃথকভাবে যোগাযোগ করছেন।

ইয়েমেন ইস্যুতে পুরোনো অবস্থান

ইয়েমেন ইস্যুতে পাকিস্তান আগেও এমন দ্বিধার মুখে পড়েছিল। ২০১৫ সালের এপ্রিলে সৌদি আরব হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পাকিস্তানের কাছে সেনা, যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান চেয়েছিল। তবে পাকিস্তানের পার্লামেন্ট সর্বসম্মতভাবে ওই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে এবং ইয়েমেন সংঘাতে নিরপেক্ষ থেকে কূটনৈতিকভাবে সংকট সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব জওহর সেলিমের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতেও এক দশক আগের সেই একই ধরনের কৌশলগত দ্বিধার মুখে পড়তে পারে পাকিস্তান। এ বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ইরান সৌদি আরবে সরাসরি হামলা চালানোর পর এপ্রিলে সৌদি আরব পাকিস্তানে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ঘোষণা করে। তবে পাকিস্তান ওই সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়েনি।

ইরানি আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাভাদ হেইরান-নিয়া বলেন, পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির অর্থ কোনো সদস্য আক্রান্ত হলেই অন্য পক্ষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে, এমন নয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী এর প্রয়োগ নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।

ইরানের ওপর হুথিদের প্রভাব কতটা

হেইরান-নিয়ার দাবি, হুথিদের ওপর ইরানের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে, যদিও তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণমূলক নয়। হুথিরা কিছু ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে কৌশলগতভাবে তাদের স্বার্থ তেহরানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

হুথিদের লোহিত সাগর উপকূলে অগ্রগতির পর শুক্রবার ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারাও তাদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ ইয়েমেনের ‘বীর জনগণের বিজয়’কে স্বাগত জানিয়েছেন।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবার আরও সরাসরি হুথিদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘আনসারুল্লাহ’র এই বড় বিজয় ইরানের হরমুজ প্রণালির শক্তি এবং প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতার প্রতিফলন।

পাকিস্তানের সামনে কোন পথ

পাকিস্তানের সাবেক ইরান রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি মনে করেন, সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তির ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো হুমকির ধারণা। কোনো সদস্য রাষ্ট্র হুমকির মুখে পড়লে তার অনুরোধের ভিত্তিতে অন্য সদস্যরা সহযোগিতা করতে পারে বলে তিনি জানান।

তার মতে, হুথিদের মোকাবিলায় সৌদি আরবের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা পাকিস্তানের রয়েছে।

তবে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব জওহর সেলিমের মতে, এই মুহূর্তে সৌদি আরবের যুদ্ধে পাকিস্তানের সরাসরি অংশগ্রহণের প্রয়োজন নেই। বরং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক যুদ্ধ ঠেকানোতেই ইসলামাবাদ বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে সৌদি আরবের কিং ফয়সাল সেন্টারের বিশ্লেষক উমর করিম মনে করেন, পাকিস্তান-সৌদি সম্পর্কের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। নিষ্ক্রিয় থাকার রাজনৈতিক মূল্য বাড়ছে এবং শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের পাশে দাঁড়িয়ে চুক্তির প্রতিশ্রুতি পূরণে পাকিস্তানকে চাপের মুখে পড়তে হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তার মতে, আপাতত সৌদি আরব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে এবং কোন পদক্ষেপে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যাবে, তা নির্ধারণের চেষ্টা করছে।

সূত্র: রয়টার্স, আলজাজিরা

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ