দখলকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ভূমি নজরদারি এবং সেখানে নির্মাণকাজসহ বিভিন্ন পরিবর্তন শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে দখলদার অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল। গবেষক ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এই প্রযুক্তি ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও স্থাপনা ধ্বংস এবং তাঁদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করতে সহায়তা করছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনের বরাতে সাফা নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ইসরাইলি অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রাফায়েলের তৈরি ‘ইমিসাইট’ নামের একটি প্রযুক্তি এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রযুক্তিটির মাধ্যমে বিস্তীর্ণ এলাকার ছবি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের পাশাপাশি ভূমিতে সংঘটিত পরিবর্তন শনাক্ত করা হয়। এসব পরিবর্তনকে অনুমোদন ছাড়া ভবন বা স্থাপনা নির্মাণের সম্ভাব্য আলামত হিসেবে চিহ্নিত করে পরবর্তী সময়ে উচ্ছেদ ও স্থাপনা ধ্বংসের কার্যক্রমে ব্যবহার করা হয়।
প্রাথমিকভাবে প্রযুক্তিটি নেগেভ অঞ্চলে ব্যবহার করা হয়। সেখানে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের স্বীকৃতি না পাওয়া ফিলিস্তিনি বেদুইন গ্রামগুলোকে নজরদারির আওতায় আনা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব এলাকার বাসিন্দাদের জন্য ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নির্মাণের অনুমতি পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
ইসরাইলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের বরাতে আল জাজিরা জানিয়েছে, এই প্রযুক্তির সাহায্যে ইসরাইলের ভূমি কর্তৃপক্ষ নেগেভ অঞ্চলের ১০ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা জরিপ করতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২ হাজার ৬০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি বেদুইন নাগরিককে উচ্ছেদের প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তিটি ভূমিকা রেখেছে।
পরবর্তী সময়ে পশ্চিম তীরেও প্রযুক্তিটির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ইসরাইলের ভূমি কর্তৃপক্ষের অধীনে পশ্চিম তীরে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি আইন প্রয়োগকারী ইউনিট গঠন করা হয়।
ইসরাইলি বসতিবিরোধী সংগঠন ‘পিস নাও’ এই পদক্ষেপকে পশ্চিম তীর সংযুক্তিকরণের দিকে একটি পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ ভূমিতে অনধিকার প্রবেশ হিসেবে বিবেচিত কার্যক্রম শনাক্ত করতে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
প্রাচীর ও বসতি প্রতিরোধ কমিশনের আমির দাউদ বলেন, এই ইউনিট গঠনের মাধ্যমে নেগেভ অঞ্চলে ব্যবহৃত নজরদারি ও উচ্ছেদের মডেল দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে স্থানান্তর করা হয়েছে। পশ্চিম তীরে সরাসরি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি ইসরাইলি সরকারি সংস্থাকে নিয়োজিত করার বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও এজ কম্পিউটিংয়ের উন্নতির ফলে নজরদারি ও পরিবর্তন শনাক্তের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হয়েছে। কিছু আধুনিক স্যাটেলাইট মহাকাশে অবস্থান করেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ছবি বিশ্লেষণ ও ভূমির পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারে। ফলে তথ্য পৃথিবীতে পাঠিয়ে পরে তা প্রক্রিয়াজাত ও মানুষের মাধ্যমে পর্যালোচনা করার জন্য অপেক্ষার প্রয়োজন কমে এসেছে।
‘পিস নাও’ ও ‘কেরেম নাভোত’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২২ সালের সময়ের তুলনায় ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পশ্চিম তীরের ‘সি’ অঞ্চল ও দখলকৃত পূর্ব আল-কুদসে ফিলিস্তিনিদের ভবন ধ্বংসের হার ৮০ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে বছরে গড়ে ৯৬৬টি ভবন ধ্বংস করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইসরাইলি বাহিনী ১ হাজার ২৮৮টি ফিলিস্তিনি স্থাপনা ধ্বংস করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখানে নজরদারি ও উচ্ছেদ কার্যক্রমের গতি বাড়ানোর প্রযুক্তি হিসেবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে বিস্তীর্ণ এলাকা জরিপ, পরিবর্তন শনাক্ত এবং সতর্কবার্তা তৈরি থেকে স্থাপনা ধ্বংসের প্রক্রিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপ দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। তবে স্থাপনা ধ্বংসের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ইসরাইলি কর্তৃপক্ষই নিয়ে থাকে।
এর পাশাপাশি দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণও অব্যাহত রয়েছে। ফিলিস্তিনিদের ভূমি নিয়ন্ত্রণ, স্থাপনা ধ্বংস ও বসতি সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে।
সূত্র : সাফা নিউজ এজেন্সি











