ভারতশাসিত কাশ্মীরে এক জ্যেষ্ঠ বিদ্রোহী কমান্ডারকে হত্যা করা হয়েছে বলে ভারতের দাবির বিরোধিতা করেছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। এরই মধ্যে গণমাধ্যমের সামনে এমন এক ব্যক্তিকে হাজির করা হয়েছে, যাকে ভারত ও দেশটির সংবাদমাধ্যম নিহত যোদ্ধা হিসেবে শনাক্ত করেছিল। এতে কথিত বন্দুকযুদ্ধে আসলে কে নিহত হয়েছেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমদ শরীফ চৌধুরী ভারতের দাবি প্রত্যাখ্যান করে এটিকে সাজানো ঘটনা বলে উল্লেখ করেন।
চৌধুরী মোহাম্মদ আসিফ নামে যে ব্যক্তিকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করেন তিনি জানান, তিনি পাকিস্তানের সাবেক সেনাসদস্য এবং ২০২৩ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়েছেন।
এর একদিন আগে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ভারতীয় সেনারা ভারতশাসিত কাশ্মীরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এক অভিযানে মুসা নামে পরিচিত লস্কর-ই-তাইয়েবার এক জ্যেষ্ঠ কমান্ডারকে হত্যা করেছে। তাকে আসিফ ফৌজি নামেও পরিচিত বলে উল্লেখ করা হয়।
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুধবারের এই হত্যাকাণ্ডকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির জন্য বড় ধরনের আঘাত হিসেবে বর্ণনা করে। মন্ত্রণালয়টি জানায়, ২০২২ সাল থেকে বিতর্কিত এই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি বড় হামলার জন্য দায়ী চার সদস্যের কমান্ডার দলের তিনিই ছিলেন সর্বশেষ জীবিত সদস্য।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের হাসির মধ্যে চৌধুরী রসিকতা করে বলেন, তো এই হলো সেই সুপারম্যান। আপনারা এই সুপারম্যানকে দেখতে পাচ্ছেন। আসুন ভাই। আপনার এসব কৃতিত্বের কথা আমাদের বলুন। আপনি কী কী করে আসছেন তা বলুন।
আসিফ গণমাধ্যমকে বলেন, কাশ্মীরে বন্দুকযুদ্ধে তার নিহত হওয়ার খবর ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর তার বন্ধুরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি বলেন, তাদের উদ্বেগের জবাবে আমি বলেছি, আমি এখানে জীবিত ও সুস্থ আছি।
নিজের পরিচয় পরিষ্কার করতে তিনি সামনে এসেছেন বলে জানান আসিফ। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো তার হত্যার খবর প্রচারের সময় তার জাতীয় পরিচয়পত্র ও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করায় তিনি বিস্মিত হয়েছেন বলেও জানান।
সাবেক এই সেনাসদস্য বলেন, “আমি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সম্প্রচার দেখেছি। সেখানে আমার ছবি ও ব্যক্তিগত সামরিক রেকর্ড দেখিয়ে দাবি করা হচ্ছিল, কাশ্মীরে আমি শহীদ হয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমি পুরোপুরি বিস্মিত হয়েছিলাম। আমি তখন বাড়িতে বসে ছিলাম অথচ তারা দাবি করছিল, কাশ্মীরে আমাকে হত্যা করা হয়েছে। আল্লাহর রহমতে আমি জীবিত এবং আপনাদের সামনে উপস্থিত।”
‘আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কোনো দেশ এমন কাজ করে না’
চৌধুরী অভিযোগ করেন, ভারত বিদ্রোহীদের সহিংসতার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করতে মিথ্যা অভিযোগ তৈরি করছে এবং সাজানো অভিযান পরিচালনা করছে।
তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক ও বিব্রতকর বিষয়। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কোনো দেশ এমন কাজ করে না।”
চৌধুরী আরও অভিযোগ করেন, ভারত কাশ্মীরের মুসলিমদের কারাগারে বন্দি করছে। তিনি বলেন, তাদের বাইরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয় এবং সেটিকে সাজানো পতাকাবদল অভিযান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এটিকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখানো হয়।
তিনি আরও বলেন, এবার তারা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে। তারা বলেছে, এটি খুব একটা চমকপ্রদ নয়। তাই পাকিস্তানের একজন সেনাসদস্যকে নিয়ে আসি এবং এমনভাবে উপস্থাপন করি যে আমরা তাকে হত্যা করেছি।
এই ঘটনা পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে আরেকটি সশস্ত্র সংঘাতের সূত্রপাত করতে পারে কি না জানতে চাইলে শরীফ বলেন, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। তিনি “অত্যন্ত কঠোর” পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি দেন।
তিনি বলেন, তারা যদি কিছু করতে চায় তাহলে তাদের স্বাগতম। তবে বিষয়টি পরিষ্কার থাকুক, এবার আমরা তাদের এত সহজে ছেড়ে দেব না। এবার তাদের কৌশলগত বোকামির জন্য পাকিস্তান যে মূল্য তাদের দিতে বাধ্য করবে তা অত্যন্ত, অত্যন্ত কঠোর হবে।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এ সময় দেশ দুটি তিনটি যুদ্ধে জড়িয়েছে। এর মধ্যে দুটি যুদ্ধ হয়েছে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে।
বিতর্কিত হিমালয় অঞ্চলটি দুই দেশের মধ্যে বিভক্ত। তবে উভয় দেশই পুরো কাশ্মীরের ওপর নিজেদের দাবি করে।
নয়াদিল্লির শাসনের বিরুদ্ধে ১৯৮৯ সালে জনপ্রিয় সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর থেকে ভারত ওই অঞ্চলে ৫ লাখের বেশি সেনা মোতায়েন করেছে।
অধিকাংশ কাশ্মীরি বিদ্রোহীদের সেই দাবিকে সমর্থন করেন, যেখানে বলা হয়েছে জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত ভোটের মাধ্যমে তাদের ভূখণ্ডকে হয় পাকিস্তানের অধীনে যুক্ত করতে হবে অথবা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ভারতের শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক।
সূত্র : টিআরটি











