নারীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত করতে চলতি বছরের ১৮ আগস্ট বিশেষায়িত গণপরিবহন ‘পিংক বাস’ চালু করে সরকার। শুরুর দিকে যাত্রীসংখ্যা কম থাকলেও এক মাসের মধ্যে তা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে কর্মদিবসে পরিচালিত এই বাসের সিংহভাগ যাত্রীই কর্মজীবী নারী ও ছাত্রী। সাধারণ যাত্রীদের তেমন সাড়া মিলছে না। অফিস সময়ের বাইরে বেশিরভাগ বাসও অনেকটাই ফাঁকা থাকছে। ফলে পিংক বাস পরিচালনায় সরকারকে প্রতিদিন বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
বিশেষায়িত এই নারী বাস সার্ভিস গত ১৮ আগস্ট চালু হয়। শুরুর দিকে দৈনিক যাত্রীসংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে ৬০০। এক মাসের মধ্যে তা বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০-তে পৌঁছায়। প্রতিদিন যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া বাবদ প্রায় ১৫ হাজার টাকা আয় হলেও সরকারকে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এভাবে ভর্তুকি দিয়ে পিংক বাস সার্ভিস কতদূর এগোবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিভিন্ন যাত্রী সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তবে কর্তৃপক্ষের দাবি, আগামী বছরের শুরুতে আধুনিক সুবিধাসংবলিত নতুন ১০০টি বাস বহরে যুক্ত হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে।
বিআরটিসি সূত্র জানায়, প্রথম ধাপে রাজধানী, বগুড়া ও চট্টগ্রামের ১৩টি রুটে ১৪টি পিংক বাস নামানো হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার ১০টি রুটে একটি একতলা ও নয়টি দ্বিতল বাস, বগুড়ার দুটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস এবং চট্টগ্রামের একটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস চলাচল করছে। বিশেষায়িত এই নারী বাস সার্ভিসের উদ্বোধন হয় ১৮ আগস্ট। পরদিন থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক মাসের মধ্যে ২০ দিন বাস সার্ভিস চালু ছিল। এ সময়ে বাসগুলোর মোট ট্রিপ হয়েছে ২৭২টি।
সূত্রমতে, সার্ভিস চালুর প্রথম দিন ১৯ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পিংক বাসে প্রায় ২১ হাজার যাত্রী ভ্রমণ করেছেন। গড়ে প্রতিদিন যাত্রী ছিলেন প্রায় ১ হাজার ৪০ জন। সার্ভিস চালুর প্রথম সপ্তাহে যাত্রীসংখ্যা হাজারের নিচে থাকলেও সময়ের সঙ্গে তা বেড়েছে। ২০ দিনে প্রায় তিন লাখ টাকা আয় হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন আয় হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। একই সময়ে সরকারকে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন ভর্তুকির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা।
বিআরটিসির কর্মকর্তারা জানান, সকাল ৭টা থেকে ৮টা ৪০ মিনিটের মধ্যে বাসগুলো ছেড়ে যাচ্ছে। এরপর ঢাকায় বিকেল ৪টা থেকে সাড়ে ৪টা এবং বগুড়া ও চট্টগ্রামে দুপুর ১টা ও বিকেল ৩টায় বাস চলাচল করছে। যাত্রী না পাওয়ায় দিনের বেশিরভাগ সময় বাসগুলো ডিপোতে অলস অবস্থায় থাকছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, বিআরটিসির মহিলা বাস সার্ভিস চালু করা একটি অদূরদর্শী প্রকল্প। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পরামর্শ কিংবা কোনো ধরনের জরিপ ছাড়াই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
মহিলাদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস কোনো কার্যকর সমাধান নয় উল্লেখ করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান আমার দেশকে বলেন, এটি একটি অকার্যকর প্রকল্প। বাসের রঙ পরিবর্তন করে ও নতুন নাম দিয়ে চালালেই সমাধান আসবে না। এটি নারীদের সঙ্গে উপহাস করার শামিল। তার মতে, সব বাসই নারী ও শিশুবান্ধব হতে হবে।
বিআরটিসির ডিজিএম (অপারেশন) শুকদেব ঢালী আমার দেশকে বলেন, মহিলা বাস সার্ভিসের ক্ষেত্রে সেবার দিকেই তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন। মহিলা যাত্রীদের ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। মাত্র এক মাসেই যাত্রীসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সামনে যাত্রীসংখ্যা আরও বাড়বে। এই মুহূর্তে লাভ-ক্ষতির হিসাবে না যাওয়াই ভালো।
পিংক বাস উদ্বোধনের সময় বিআরটিসি জানিয়েছিল, ঢাকা মহানগরীর ১০৬টি, চট্টগ্রামের ১২টি ও বগুড়ার ১৬টি স্পট থেকে যাত্রী ওঠানো-নামানো হবে। কিন্তু অনেক যাত্রী অভিযোগ করেছেন, অপেক্ষমাণ যাত্রী না দেখলে নির্ধারিত স্টপেজেও বাস দাঁড়াচ্ছে না। ফলে নিয়মিত যাত্রী ছাড়া অন্যরা বাসে উঠতে পারছেন না। চালকদের মধ্যে শুরুর স্টপেজ থেকে যাত্রী নিয়ে সরাসরি গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রবণতা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিসির এক কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, পুরুষ ও নারী চালকের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। নারী চালকরা পুরুষ চালকদের মতো স্টপেজে দাঁড়িয়ে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করতে এখনো অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেননি। প্রতিটি স্টপেজে অন্য বাসগুলোকে পাশ কাটিয়ে বাস দাঁড় করাতে হয়। অভিজ্ঞতা কম থাকায় নারী চালকরা আপাতত এই ঝামেলা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন। তবে ধীরে ধীরে তারাও অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন।
যাত্রীরা বলছেন, অনেকেই বাস ছাড়ার সময় এবং কোন স্টপেজে কখন পৌঁছাবে তার নির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য সময়সূচি না জানায় পিংক বাসে উঠতে পারছেন না। এ ছাড়া দিনে দুই বেলা বাস চলাচল এবং নির্দিষ্ট স্টপেজে থামার কারণে অনেক নারী পিংক বাসে আগ্রহী হচ্ছেন না। নারীদের মধ্যে বিশেষায়িত বাসে চলাচলের ব্যাপারেও সচেতনতার অভাব রয়েছে। আবার পিংক বাসের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় নারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কাও করছেন অনেকে। এসব কারণেও পিংক বাসে যাত্রী বাড়ছে না বলে যাত্রীদের কেউ কেউ মনে করছেন।
পিংক বাসে করে ফার্মগেট থেকে মতিঝিলে কর্মস্থলের উদ্দেশে যাত্রা করা লায়লা ইয়ামিন (৪০) বলেন, আগে তিনি সাধারণ বাসে যাতায়াত করতেন। পিংক বাস চালু হওয়ার পর থেকে প্রতিদিন এই বাসেই কর্মস্থলে যাচ্ছেন। প্রথম কয়েক দিন সময়সূচি নিয়ে সমস্যা হলেও এখন আর হচ্ছে না। মিরপুর-১২ থেকে আসা বাসটি সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে ফার্মগেট দিয়ে যায়। ফলে তাকে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
কারওয়ান বাজার দিয়ে যাওয়ার সময় গত বুধবার এক নারীকে দৌড়ে পিংক বাসে ওঠার চেষ্টা করতে দেখা যায়। কিন্তু সেখানে নির্ধারিত স্টপেজ না থাকায় ওই নারী সাধারণ বাসে ওঠেন। এ সময় পিংক বাসের যাত্রীরা জানান, রুটের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্টপেজ থাকলে আরও অনেকে এই বাসে যাতায়াত করতে পারতেন।
রেহানা পারভীন নামে এক যাত্রী জানান, নারী চালকরা একটু বেশি সতর্কতার সঙ্গে বাস চালানোর কারণে বাসে ধীরগতি দেখা যায়।
শনির আখড়া থেকে মতিঝিল রুটের বাসচালক সুপ্রিয়া কুণ্ডু আমার দেশকে বলেন, নারীরা বেশ আগ্রহ নিয়েই এই বাসে উঠছেন। আগামীতে যাত্রী আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মতিঝিল ডিপোতে গিয়ে দেখা যায়, নতুন বাজার, তালতলা, মিরপুর, মিরপুর-১০, মিরপুর-১২, মোহাম্মদপুর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা বাসগুলো সকালের ট্রিপ শেষ করে ডিপোতে অলস অবস্থায় রয়েছে। বিকেলে এসব বাস আবার নির্ধারিত স্থানে যাত্রী পরিবহনের জন্য বের হবে। এরপর যাত্রীদের নিজ নিজ গন্তব্যে নামিয়ে বাসগুলো আবার মতিঝিল ডিপোতে রাখা হবে।
নারী চালক যুক্ত হয়েছেন ১০ জন
প্রশিক্ষণ শেষে দ্বিতীয় ধাপে আরও ১০ জন নারী চালক গত বৃহস্পতিবার যোগ দিয়েছেন। ফলে বর্তমানে নারী চালকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ জনে। তৃতীয় ধাপের নারী চালকদের প্রশিক্ষণ চলতি মাসে শুরু হবে বলে জানিয়েছেন বিআরটিসি কর্মকর্তারা। এ ছাড়া ভবিষ্যতে ইলেকট্রিক বাস চালানোর জন্য প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে।
নতুন ১০০ বাসে থাকছে আধুনিক সুবিধা
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, পিংক বাসের বহরে আরও ১০০টি আধুনিক বাস যুক্ত করা হবে। বাসগুলো তুলনামূলক ছোট হবে। এতে ওয়াই-ফাই, সিসি ক্যামেরা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি)সহ অন্যান্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে।











