চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে চারজন বাংলাদেশি নিহত এবং আরও ছয়জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ভারতের অভ্যন্তর থেকে ২৯ জন বাংলাভাষী মানুষকে বাংলাদেশে জোরপূর্বক ‘পুশইন’ করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সহিংসতায় ২৭ জন নিহত, ২২৩ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার এবং ৫৬ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে আক্রান্ত হয়েছেন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ প্রকাশিত ত্রৈমাসিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সীমান্তে বিএসএফের গুলিবর্ষণ ও সহিংসতায় বাংলাদেশিদের প্রাণহানি অব্যাহত রয়েছে। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার আহমেদাবাদ ইউনিয়নের চিমটিবিল, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ এবং ফেনী সীমান্তে গুলি চালিয়ে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন ও মানবাধিকার সনদের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘অপ্রত্যাবর্তন নীতি’ অলঙ্ঘনীয় হলেও বিএসএফ ভারত থেকে নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ ২৯ জন বাংলাভাষী মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও সিমেন্টের খুঁটি নির্মাণের চেষ্টা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে গুলি ছুড়ে বালু ও পাথর উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত চারটি নৌকা ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত তিন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ২৭ জন নিহত এবং ১ হাজার ৯০ জন আহত হয়েছেন। এ সময়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা সংঘর্ষের ৪৫টি ঘটনায় চারজন নিহত ও ৪৮০ জন আহত হন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একটি অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে সাতজন এবং গণঅধিকার পরিষদের একটি অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে ছয়জন আহত হন। পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশে হামলা ও বাধা দেওয়ার ঘটনাও অব্যাহত ছিল।
নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার চিত্রও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ২২৩ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১৫০ জন কন্যাশিশু ও ৭৩ জন নারী। দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪৪ জন, যার মধ্যে ২৩ জন নারী ও ২১ জন শিশু। ধর্ষণের পর ১০ জনকে হত্যা করা হয়েছে।
যৌতুকসংক্রান্ত সহিংসতায় ২৬ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে আটজনকে হত্যা করা হয়েছে এবং চারজন আত্মহত্যা করেছেন। অন্যদিকে, পাসপোর্ট ও টিকিট থাকা সত্ত্বেও তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ বিদেশে যেতে বাধা দেওয়াকে সংস্থাটি সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে বর্ণিত অবাধ চলাচলের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে।
পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকরাও বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও দমনপীড়নের শিকার হয়েছেন। ‘অধিকার’-এর তথ্যমতে, এই তিন মাসে একজন সাংবাদিক নির্যাতিত, ২২ জন আহত, ১৩ জন লাঞ্ছিত এবং ১৬ জন সরাসরি হুমকির শিকার হয়েছেন। শাসকদলের নেতাকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে এসব হামলার অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে কারাগারে মোট ৩০ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২৯ জন ‘অসুস্থতাজনিত’ এবং একজন নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময়ে নিম্ন আদালত ৮৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।
এ ছাড়া চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই বা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে গণপিটুনিতে ২২ জন নিহত হয়েছেন। জ্বালানি সংকট ও বকেয়া বেতনের অসন্তোষের মধ্যে আশুলিয়ার প্রীতি গ্রুপ কারখানায় আগুনে সাতজন নিহত ও ১৫ জন আহত হন। সীতাকুণ্ডে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে নয়জন শ্রমিকের মৃত্যু এবং ৩০ জন আহত হন।
‘অধিকার’-এর পর্যালোচনায় র্যাবের পরিবর্তে নতুন বিল পাসের মাধ্যমে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ গঠন এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’ ও ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনে আন্তর্জাতিক ‘প্যারিস নীতিমালা’ অনুসরণ না করায় এটি সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে ‘অধিকার’ বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্যারিস নীতিমালার আলোকে মানবাধিকার কমিশন আইন সংশোধন, গুমের সঠিক তদন্ত ও ভিকটিম পরিবারকে আইনি প্রতিকার প্রদান, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতন বন্ধ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধে সরকারের কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ।











