আবারও বড় ধরনের সামরিক হামলার শিকার হলে আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। সম্ভাব্য হামলার জবাব হিসেবে আমেরিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনার পাশাপাশি আমেরিকার সামরিক অভিযানকে সমর্থনকারী দেশগুলোর স্থাপনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের কিছু স্থানেও হামলার বিষয় বিবেচনা করছেন ইরানের সামরিক কমান্ডাররা। একই সময়ে তেহরান কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ইরানের কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে মনে করছেন, এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আমেরিকা নতুন করে সামরিক হামলা শুরু করলে এবার আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী জবাব দিতে হবে। একই সময়ে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা আরও বাড়া ঠেকানোর চেষ্টা করছে তেহরান।
তিন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা এবং আলোচনা সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছেন। এই পরিকল্পনায় শুধু আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার পরিবর্তে আমেরিকার আগ্রাসনকে সমর্থনকারী দেশগুলোর স্থাপনা এবং সম্ভব হলে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের কিছু স্থানকেও লক্ষ্যবস্তু করার বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে।
গত সপ্তাহে নিউইয়র্ক থেকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশে ফেরার পর থেকে আমেরিকা আবার হামলা চালালে কী ধরনের জবাব দেওয়া হবে এবং কখন দেওয়া হবে, তা নিয়ে ইরানের সামরিক কমান্ডার ও শীর্ষ কর্মকর্তারা আলোচনা জোরদার করেছেন। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। দুই পক্ষের কেউই সমঝোতায় যাওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে না বলে মনে হওয়ায় সামরিক পরিকল্পনা আরও জোরদার হয়েছে।
চলমান সংঘাত শুরু হয়েছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইসরাইলের হামলার পর। ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতিতে ৪০ দিনের যুদ্ধ থামলেও এরপরও বিক্ষিপ্তভাবে শত্রুতা অব্যাহত রয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার বড় ধরনের হামলা শুরু করবেন, নাকি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার মতো সীমিত পদক্ষেপ নেবেন, তা নিয়ে তেহরান এখনো নিশ্চিত নয়।
তিনি বলেন, ইরান প্রতীকী পদক্ষেপের জবাবে প্রতীকী জবাব দেওয়ার বদলে নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার আশায় উত্তেজনা আরও বাড়াতে বদ্ধপরিকর বলে মনে হচ্ছে।
তেহরান দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ঝুঁকিও বিবেচনা করছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধটি আমেরিকানদের মধ্যে জনপ্রিয় নয়। একই সময়ে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় জ্বালানির উচ্চ মূল্যও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
দুই ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন করে আমেরিকা বড় ধরনের হামলা চালালে ইরানকে সহায়তা করার জন্য লেবানন, ইয়েমেন ও ইরাকে থাকা মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্দেশনা ছিল এমন একটি সমন্বিত জবাবের জন্য প্রস্তুত থাকা, যা ‘হরমুজ প্রণালি থেকে শুরু করে এ অঞ্চলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের আমেরিকার স্বার্থ পর্যন্ত’ বিস্তৃত হতে পারে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধের তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি।
তবে বৃহত্তর সংঘাতের প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি তেহরান এখনো আলোচনার পথ খোলা রাখছে। ইরানের হিসাব-নিকাশের পেছনে আরেকটি বড় উদ্বেগ রয়েছে, আমেরিকার অবরোধের মধ্যে দেশটির অর্থনীতি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সহ্য করতে পারবে কি না।
আমেরিকার অবরোধ ইরানের তেল রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। তেল দেশটির রাজস্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এর আগে থেকেই বহু বছরের নিষেধাজ্ঞা এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট সাধারণ ইরানিদের ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে।
গত সপ্তাহে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তেহরান কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠায়। প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হলে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া এবং সাত দিনের মধ্যে পুরো অঞ্চলে শত্রুতা বন্ধ করা সম্ভব হতে পারে বলে জানিয়েছে ইরান।
ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রস্তাবটিতে যুদ্ধ বন্ধ করা, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আমেরিকার অবরোধ তুলে নেওয়া, অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলার জব্দ থাকা ইরানি অর্থ ছাড় করা এবং ইরানের ওপর আরোপিত তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা ছাড় দেওয়ার বিষয় রয়েছে।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) ট্রাম্প জানান, তিনি ইরানের ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) কাতারের মাধ্যমে আমেরিকার একটি জবাব তেহরানের কাছে পৌঁছেছে এবং ইরান এখন সেটি পর্যালোচনা করছে। ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছে, ওয়াশিংটন চায় ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি আলোচনার অংশ হোক। তবে তেহরানের অবস্থান হলো, তাদের নির্ধারিত সাতটি শর্ত পূরণ হওয়ার পরই পারমাণবিক আলোচনা শুরু হতে পারে। তার আগে নয়।
ইরানের এক কর্মকর্তা বলেন, ইরান যদি সরাসরি আমেরিকার জবাব প্রত্যাখ্যান না করে এবং পরোক্ষ আলোচনা চলতেও থাকে, তবুও দুই পক্ষের মধ্যে কোনো চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচির পরিচালক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা এখনো সীমিত।
তিনি বলেন, ইরান আমেরিকার অবরোধ দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে না। এতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে এবং পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্র : রয়টার্স











