ইরানে আমেরিকা-ইসরাইল জোটের হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা তীব্র হয়ে উঠলেও থামেনি আফগানিস্তানে পাকিস্তানের আগ্রাসী অভিযান। টানা চতুর্থ দিনের মতো কাবুলে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। একই সময়ে পাক যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে পাল্টা গুলি চালানোর ঘটনাও ঘটেছে।
রবিবার (১ মার্চ) আফগান আকাশসীমা লঙ্ঘনের জেরে আকাশ প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েনের কথা জানায় ইমারাতে ইসলামিয়া। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোরে পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান আফগান আকাশসীমায় অনুপ্রবেশ করলে তা প্রতিহত করতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ইমারাতে ইসলামিয়ার নেতৃত্বাধীন বাহিনী জানিয়েছে, কাবুলের উত্তরে পাকিস্তানের একটি হামলার চেষ্টা তারা ব্যর্থ করে দিয়েছে। আমেরিকার ব্যবহৃত ও সম্প্রসারিত সামরিক ঘাঁটি বাগরামকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর চেষ্টা করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী। গত বছর এই ঘাঁটি পুনর্দখলের আগ্রহ দেখিয়েছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এ ঘটনায় পাকিস্তান তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে ইসলামাবাদ এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, তারা প্রকাশ্য যুদ্ধে জড়িয়েছে। রবিবারও আফগান ভূখণ্ডের দক্ষিণ ঝোব সেক্টরের প্রায় ৩২ বর্গকিলোমিটার এলাকা তাদের বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে পাকিস্তানের দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন।
আফগান সরকারের মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত বলেন, বৃহস্পতিবার থেকে হামলার মাত্রা তীব্র হয়। একাধিক প্রদেশে পাকিস্তানের হামলায় ৫৫ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, নাঙ্গারহারে ড্রোন হামলায় এক নারী ও এক শিশু নিহত হন। পাকতিয়ায় মর্টারের আঘাতে আরও এক বেসামরিক নাগরিক নিহত হন এবং তার বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কুনার প্রদেশের তরুণ সাজিদ বলেন, সংঘাত শুরুর পর তার ভাই ঘর ছেড়ে যেতে রাজি হননি। তিনি ঘর দেখাশোনা করবেন বলে জানিয়েছিলেন। পরে নিকটস্থ মসজিদের উদ্দেশে বের হওয়ার সময় তিনি শহীদ হন।
তবে উভয় পক্ষের হতাহতের দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে সংঘাত বন্ধে আফগান পক্ষ আলোচনায় বসার ইঙ্গিত দিলেও পাকিস্তান তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি বলেছেন, কোনো আলোচনা হবে না, কোনো সংলাপ হবে না, কোনো দরকষাকষিও হবে না। তার ভাষায়, ইসলামাবাদের একমাত্র দাবি হলো, আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে যে সন্ত্রাসবাদ চালানো হচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে।
দুই প্রতিবেশী দেশের এই সংঘাতের শেকড় বহুদিনের পুরোনো। টিটিপি বা পাকিস্তানি তালেবান ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের সম্পর্কে তিক্ততা রয়েছে।
পাকিস্তানের অভিযোগ, কাবুল টিটিপিকে আশ্রয় দিচ্ছে। তবে ইমারাতে ইসলামিয়া এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, তাদের ভূখণ্ড কোনো প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে না।
পাকিস্তান সরকার জানিয়েছে, গত বছরের তুলনায় দেশটিতে টিটিপির তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইসলামাবাদভিত্তিক পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা ৭৫ শতাংশ বেড়ে ৩,৪১৩-এ পৌঁছেছে। একই সময়ে সহিংস ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে ২৯ শতাংশ। গত এক দশকের মধ্যে এটিই ছিল পাকিস্তানের সবচেয়ে সহিংস বছর।
এর আগে ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান আফগানিস্তানের নাঙ্গারহার ও পাকতিয়া প্রদেশে বিমান হামলা চালায়। টিটিপির আস্তানাকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু এতে ১৩ জন আফগান বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এ তথ্য জাতিসংঘের কাছেও বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে পৌঁছেছে।
সামরিক সক্ষমতায় দুই পক্ষের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। পাকিস্তানের হাতে উন্নত যুদ্ধবিমান, ট্যাংক ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদিকে আফগানিস্তানের কাছে আছে দুই দশকের বেশি সময় আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, পাশাপাশি জব্দ করা যুদ্ধযান ও সরঞ্জাম।
আফগান বাহিনী বর্তমানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে পাকিস্তানি সামরিক শিবিরে আঘাত হানছে। তুলনামূলক কম খরচের এই অস্ত্রই যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্র বদলে দিচ্ছে।
এ অবস্থায় উত্তেজনা কমানোর আন্তর্জাতিক আহ্বানও বাড়ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ, রাশিয়া, ইরান, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডান উভয় পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে।
২৭ ফেব্রুয়ারি ডিপ্লোম্যাটস উইদাউট বর্ডারস সতর্ক করে বলেছে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তা বিস্তৃত আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ডেকে আনতে পারে। তাই দুই দেশের সরকারকে সরাসরি সংলাপে ফেরার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা-ইসরাইল জোটের হামলার বিস্তৃতি নতুন আশঙ্কা তৈরি করেছে। এতে পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধ বিশ্ব কূটনীতির মনোযোগ হারাতে পারে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে গুরুত্ব কমে যেতে পারে।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) আফগান সরকারের মুখপাত্র আবদুল কাহহার বালখি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের ওপর হামলা এবং পরে উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের পাল্টা হামলার নিন্দা জানিয়ে সব পক্ষকে কূটনৈতিক উপায়ে মতপার্থক্য মেটানোর আহ্বান জানান। একই দিনে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও প্রায় একই ধরনের সংযমের আহ্বান জানায়।
আফগানিস্তানের সাবেক কূটনীতিক ওমর সামাদ সতর্ক করে বলেছেন, ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাত বন্ধের প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
তার ভাষায়, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে আমেরিকা ও ইসরাইলের সম্পৃক্ততা অনেক বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আর সেটিই এখন বিশ্বের অন্য সংঘাতগুলো থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিচ্ছে, যার মধ্যে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তের লড়াইও রয়েছে।
সূত্র : আল জাজিরা











