বুধবার | ৪ ফেব্রুয়ারি | ২০২৬
spot_img

এপস্টেইন ফাইলস; পশ্চিমা ও ইসলামী সমাজে নারী

মানব ইতিহাসে এমন সময় এসেছে, যখন ক্ষমতার নেশা ও নৈতিক অবক্ষয়ের ফলে মানবতার বিবেক ম্লান হয়ে গেছে। এমনই এক আধ্যাত্মিক ও নৈতিক বিস্মৃতির যুগে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। ইসলাম তখন শুধু একটি ধর্ম হিসেবে নয়, বরং একটি গভীর নৈতিক পুনর্জাগরণ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

সেই সময়ে সমাজের অবহেলা ও নির্যাতনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল দুর্বল জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারীরা। ঐশী ওহির মাধ্যমে ইসলাম মানবতার সংজ্ঞা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে এবং নারীসত্তাকে পবিত্র আমানত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তার স্বাভাবিক মর্যাদা নিশ্চিত করে।

এর বিপরীতে, সমকালীন পশ্চিমা সভ্যতা নিজেকে স্বাধীনতা ও নারীর অধিকারের প্রধান রক্ষক হিসেবে তুলে ধরলেও, তার আড়ালে শোষণ ও নৈতিক অবক্ষয়ের বাস্তবতা ক্রমেই প্রকাশ পাচ্ছে।

ইসলামে নারীর অবস্থান

ইসলাম এমন একটি সামাজিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে নারীদের সম্মান, নিরাপত্তা এবং উদ্দেশ্যমুখী স্বাধীনতা দেওয়া হয় একটি সুরক্ষিত নৈতিক পরিবেশের মধ্যে। ইসলামে নারীকে কখনোই বাজারের পণ্য বা রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত করা হয়নি। বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের লালনকারী এবং সমাজের নৈতিক ভিত্তির রক্ষক হিসেবে তাদের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

ইসলামী নীতিবোধ নারীদের পণ্যায়ন ও অশ্লীলতার হাত থেকে রক্ষা করে এবং সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় তাদের অপরিহার্য ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেয়। ইতিহাসে দেখা গেছে, যে কোনো সভ্যতা মুক্তির নামে নারীদের ব্যবহার করেছে, বাস্তবে সে তাদের সম্মান হরণ করেছে, ইসলাম সেই পথ থেকে নারীকে সুরক্ষিত রেখেছে।

এপস্টেইন কেলেঙ্কারি ও পশ্চিমা সমাজ

অন্যদিকে, পশ্চিমা বিশ্ব যা প্রায়ই নিজেকে গণতন্ত্র ও লিঙ্গসমতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে, ক্রমেই দুর্বল নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। জেফ্রি এপস্টেইন ও তার সহযোগীদের নিয়ে সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্য কোনো বিচ্ছিন্ন কেলেঙ্কারি নয়; বরং পশ্চিমা সমাজের ক্ষমতাধর একটি শ্রেণির গভীর নৈতিক পচনের প্রতিফলন।

ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্যে উঠে এসেছে, কীভাবে অসংখ্য কিশোরী ভয়াবহ যৌন নির্যাতন ও মানবপাচারের শিকার হয়েছে। এসব ঘটনা কোনো ব্যতিক্রম নয়; বরং একটি বিস্তৃত নৈতিক সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।

এর আগেও ২০০৮ সালে গ্যাব্রিয়েলা রিকো ক্ষমতাবান অভিজাতদের বিরুদ্ধে নরখাদন ও আচারভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তুলেছিলেন। সে সময় এসব অভিযোগ মানসিক বিভ্রম বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ফাঁস হওয়া নথিতে সেই অভিযোগগুলোর সঙ্গে ভয়াবহ সাদৃশ্য পাওয়া যায়। নথিগুলোতে মানুষের মাংস ও রক্ত ভক্ষণসহ অকথ্য কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। এতে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ও ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একটি শোষণমূলক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বাধীনতার স্লোগান ও বাস্তব চিত্র

সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, যে ব্যক্তি ও ব্যবস্থা ইসলামের নারীনীতির সমালোচনা করে, তারাই বাস্তবে নারীদের বিজ্ঞাপন, রাজনৈতিক স্বার্থ ও কামনা-বাসনা পূরণের উপকরণে পরিণত করেছে। পশ্চিমা স্বাধীনতার ধারণা বহু ক্ষেত্রে নারীর অস্তিত্বকেই পাচারের পণ্যে রূপ দিয়েছে। মুক্তির নামে তাদের নিরাপত্তা ও নিষ্পাপতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে সভ্যতাগত পার্থক্য, একটি ব্যবস্থা প্রকাশ্যে কামনাকে বাজারজাত করে, অন্যটি নৈতিকতার অধীনে তা নিয়ন্ত্রণ করে।

ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানের ফরমান

এই প্রেক্ষাপটে ইমারাতে ইসলামিয়া সাম্প্রতিক ফরমানগুলো ইসলামী নীতিরই ধারাবাহিকতা। এসব ফরমানের মাধ্যমে জোরপূর্বক বিয়ে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, নারীদের অনুকূলহীন অবস্থায় বিবাহে বাধ্য করা থেকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে এবং তাদের সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

এগুলো কোনো বিধিনিষেধ নয়; বরং সমাজের ভেতরে নারীর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে নেওয়া সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ। এতে আবারও স্পষ্ট হয়, পশ্চিমা আধুনিকতা যেখানে লাগামহীন কামনাকে অগ্রাধিকার দেয়, সেখানে ইসলামী সভ্যতা সম্মান ও নৈতিকতার সীমার মধ্যে স্বাধীনতাকে পরিচালিত করে।

উপসংহার

এখন প্রশ্ন, কোন সভ্যতা সত্যিকার অর্থে নারীর সুরক্ষা দেয়, আর কোনটি তাদের মর্যাদা নিয়ে বাণিজ্য করে? উত্তর পাওয়া যায় বাস্তবতায়। যে সমাজ স্বাধীনতাকে কামনার বাজারে পরিণত করে, সে শেষ পর্যন্ত নিজের নৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করে। আর যে সমাজ নৈতিকতা ও সম্মানের কাঠামোর মধ্যে স্বাধীনতাকে সংজ্ঞায়িত করে, সে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের মর্যাদা রক্ষা করে।

মর্যাদাপূর্ণ মানব ভবিষ্যৎ গড়তে হলে এমন নীতির প্রয়োজন, যা মানবতাকে সম্মান করে, গ্রাস করে না। ইসলামী কাঠামো তার সূচনা থেকেই নারীসত্তার পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষায় অবিচল। নারীর অধিকারের প্রকৃত সুরক্ষা শোষণ আড়াল করা স্লোগানে নয়, বরং সম্মান, নিরাপত্তা ও অর্থবহ সামাজিক ভূমিকার নিশ্চয়তা দেওয়া নীতিতেই নিহিত।

সূত্র: হুরিয়াত রেডিও

spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ