spot_img

বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়ী সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর মৃত্যু বার্ষিকী

আজ বুধবার (৪ মার্চ) মুসলিম উম্মাহর অবিসংবাদিত বীর, পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়ী সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর ইন্তেকাল বার্ষিকী। ১১৯৩ সালের এই দিনে সিরিয়ার দামেস্কে এই মহান মুজাহিদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও তাঁর শৌর্য, বীরত্ব, ইনসাফ ও ঈমানি দৃঢ়তা আজও বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়ে অফুরন্ত প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।

সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর শ্রেষ্ঠ কীর্তি শুধু যুদ্ধজয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল শতধা বিভক্ত মুসলিম উম্মাহকে এক পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ করা। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াইয়ের আগে তিনি মিশর, সিরিয়া, ইয়েমেন ও মেসোপটেমিয়ার মুসলিম ভূখণ্ডগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল দূর করে একটি সুদৃঢ় ইসলামি শক্তি গড়ে তোলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই ঐক্যই ছিল ক্রুসেডার আগ্রাসন প্রতিরোধের মূল ভিত্তি।

তাঁর জীবনের মুকুটমণি ছিল ১১৮৭ সালের ঐতিহাসিক হিত্তিনের যুদ্ধ এবং পবিত্র জেরুজালেম বা বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধার। দীর্ঘ ৮৮ বছর ক্রুসেডারদের অবৈধ ও নিষ্ঠুর দখলের পর তাঁর বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্বেই মসজিদে আকসায় আবারও আজানের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়। হিত্তিনের প্রান্তরে ক্রুসেডারদের বিশাল ও সুসজ্জিত বাহিনীকে চরমভাবে পরাজিত করে তিনি মুসলিম উম্মাহর হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনেন। এই বিজয় শুধু একটি ভূখণ্ডের বিজয় ছিল না, বরং এটি ছিল ইসলামি আত্মমর্যাদার ঐতিহাসিক পুনর্জাগরণ।

বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়ের পর ইউরোপের সম্মিলিত খ্রিষ্টান শক্তি তৃতীয় ক্রুসেডের ডাক দেয়। ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড দ্য লায়নহার্টের নেতৃত্বে বিশাল বাহিনী মুসলিমদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়। কিন্তু সালাহউদ্দীন আইয়ুবী পাহাড়ের মতো অটল থেকে সেই সম্মিলিত আক্রমণ রুখে দেন এবং পবিত্র ভূমির সুরক্ষা নিশ্চিত করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তীব্র লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজা রিচার্ড অসুস্থ হলে তাঁর জন্য ব্যক্তিগত চিকিৎসক পাঠানোর যে মহানুভবতা তিনি দেখিয়েছিলেন, তা ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

পরাক্রমশালী বিজয়ী হওয়ার পাশাপাশি সালাহউদ্দীন আইয়ুবী ছিলেন ইসলামি ইনসাফ ও ক্ষমার মূর্ত প্রতীক। ১০৯৯ সালে ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দখল করে হাজার হাজার মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। মসজিদে আকসার চত্বর রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। কিন্তু সুলতান সালাহউদ্দীন যখন শহরটি বিজয় করেন, তখন তিনি সাধারণ খ্রিষ্টানদের ওপর সামান্যতম প্রতিশোধও নেননি। তাঁর এই ক্ষমাশীলতা ইসলামের মহান আদর্শকেই উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরেছিল।

বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে ও দুনিয়াবিমুখ। ইন্তেকালের পর তাঁর ব্যক্তিগত কোষাগারে এতটুকু অর্থও পাওয়া যায়নি, যা দিয়ে তাঁর কাফন-দাফনের খরচ মেটানো যায়। নিজের সম্পদ তিনি গরিব-দুঃখী মানুষ এবং দ্বীনের সুরক্ষার কাজে বিলিয়ে দিয়েছিলেন।

বর্তমান সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে মুসলিমরা আগ্রাসনের শিকার এবং পবিত্র মসজিদে আকসায় আবারও অবৈধ দখলদারদের আস্ফালন চলছে, তখন সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর জীবন ও সংগ্রাম মুসলিম উম্মাহর জন্য বড় পথনির্দেশনা হয়ে আছে। বাতিলের বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন অবস্থান এবং উম্মাহর ঐক্যের চেতনা আজও বর্তমান প্রজন্মের জন্য অনন্ত প্রেরণার বাতিঘর।

spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ