spot_img
spot_img

বাব আল-মান্দাবের উপকূলীয় এলাকা পুনর্দখলে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর অভিযান

সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশের উপকূলীয় এলাকা পুনর্দখলে দ্রুত অভিযান শুরু করেছে। সরকারের দাবি, মোকা শহর পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকা পুনর্দখলের এই অভিযানে গত মাসে ইরান-সমর্থিত হুথিদের দখলে যাওয়া অধিকাংশ এলাকা থেকে তাদের হটিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সোমবার (৬ অক্টোবর) রাতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের বাহিনী সৌদি আরবের ব্যাপক বিমান হামলার সহায়তায় মোকা শহরের উপকণ্ঠে পৌঁছে যায়। সরকারের চারটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। তাদের দাবি, হুথি যোদ্ধারা পার্বত্য এলাকায় পিছু হটছিল। ইয়েমেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মোকা শহর সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে।

এর জবাবে হুথিরা জানিয়েছে, তারা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রাবিগে আরামকোর একটি তেল শোধনাগার, আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং খামিস মুশাইত সামরিক ঘাঁটি। রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।

তবে হুথিদের এসব দাবি তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সৌদি আরব ও আরামকোও এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি।

এই অগ্রগতি নিশ্চিত হলে ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার কারণে জ্বালানি বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতার পাশাপাশি লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথের ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণও দুর্বল হবে। তবে অন্য অবস্থান থেকে হুথিরা ড্রোনের মাধ্যমে জাহাজে হামলা চালাতে পারবে।

হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটও সোমবার রাতে জানিয়েছে, তাদের নৌবাহিনী ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলীয় হুদাইদা প্রদেশে একটি সামরিক অভিযান চালিয়েছে। এর আগে সরকারি বাহিনী প্রণালির মুখে অবস্থিত ধুবাব জেলায় একটি বিমানপথসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অবস্থান দখল করেছিল। গত মাসে হুথিরা ওই এলাকা দখল করার পর জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল।

সরকারি বাহিনী কতটা অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা রয়টার্স স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। ২০১৪ সাল থেকে রাজধানী সানা-সহ ইয়েমেনের জনবহুল অনেক এলাকার নিয়ন্ত্রণে থাকা হুথিরা বলেছে, সৌদি-সমর্থিত সরকারের এসব দাবি ভিত্তিহীন।

এদিকে ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজের কাছে হুথিরাও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। ইয়েমেন সরকারের পাঁচজন সামরিক সূত্র জানিয়েছে, তারা একটি পাহাড়ি সড়কের কিছু অংশ দখল করেছে। এতে সরকারি বাহিনী অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। তবে সরকারের একজন সূত্র ওই সড়ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

হুথিরা সৌদি আরবের আকাশসীমায় চলাচলকারী বিমান ও অন্যান্য যানবাহনে হামলারও হুমকি দিয়েছে

সংঘাত আরও তীব্র হওয়ায় রিয়াদের মিত্ররাও পদক্ষেপ নিয়েছে। সোমবার রিয়াদে অনুষ্ঠিত এক জরুরি বৈঠকে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় দ্রুত সৌদি আরবে সামরিক বাহিনী ও সামরিক সক্ষমতা মোতায়েনে সম্মত হয়েছে। দেশ তিনটির যৌথ বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

লড়াইয়ের কারণে ইয়েমেনের মানবিক সংকট আরও ভয়াবহ হয়েছে। ইয়েমেন আরব অঞ্চলের সবচেয়ে দরিদ্র রাষ্ট্র। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা সোমবার জানিয়েছে, যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ার পর থেকে ১ লাখ ৮৪ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল-আলিমি রোববার শপথ করে বলেছেন, “দেশকে সন্ত্রাসী মিলিশিয়ার নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত না করা পর্যন্ত” তিনি লড়াই চালিয়ে যাবেন।

সৌদি আরব সোমবার জানিয়েছে, বাব আল-মান্দাব প্রণালি ও ইয়েমেনি স্থলবাহিনীকে বিমান সহায়তা দিতে তারা শত শত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। ইয়েমেন সরকার জানিয়েছে, তারা সানা প্রদেশসহ বিভিন্ন রণাঙ্গনে হামলা শুরু করেছে।

হুথি-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সানা প্রদেশের সানহান ও সাওয়ান জেলায় হামলায় দুইজন নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছে।

দক্ষিণ-পশ্চিম ইয়েমেনে সবচেয়ে তীব্র লড়াই

ইয়েমেনের বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ চললেও সবচেয়ে তীব্র লড়াই হচ্ছে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। এর মধ্যে রয়েছে প্রণালির কাছের উপকূলীয় এলাকা এবং তাইজের আশপাশের পাহাড়ি অঞ্চল।

ইয়েমেন সরকারের পাঁচটি সামরিক সূত্র জানিয়েছে, হুথিরা তাইজ-আদেন সড়কের একটি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এতে সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। রোববার হুথি যোদ্ধারা আল-তুরবাহ শহরের ভেতরেও নতুন করে অগ্রসর হয়েছে বলে তারা জানিয়েছে। তবে সরকারের আরেকটি সূত্র এ দাবি অস্বীকার করেছে।

হুথি-নিয়ন্ত্রিত একটি সংবাদ সংস্থা সোমবার এক সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, হুথিরা তাইজ প্রদেশের আল-মাওয়াসিত জেলা থেকে সরকারি বাহিনীকে সরিয়ে দিয়েছে। তারা ইয়েমেনের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট কাউন্সিলের প্রধান আল-আলিমির বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে বলেও জানানো হয়েছে।

ইয়েমেন সরকারের সামরিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, এসব অগ্রগতির ফলে পাঁচ লাখের বেশি মানুষের বসবাসকারী তাইজ শহর এবং সেখানে অবস্থানরত হাজার হাজার সরকারি যোদ্ধা হুথি বাহিনী দিয়ে ঘেরাও হয়ে পড়েছে।

তাইজের ঠিক বাইরে আল-মুধাফফার এলাকায় একটি পেট্রল স্টেশনের সামনে দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। এলাকাটি হুথিদের অবরোধের মধ্যে থাকা অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। সেখানে মানুষ জ্বালানি ও রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের জন্য অপেক্ষা করছিল।

শেহাব হাজা বলেন, তাইজে প্রতিদিনের পরিস্থিতি এমনই।

সৌদিতে সামরিক বাহিনী মোতায়েনে মক্কা জোটের সম্মতি

বৈঠকের পর দেওয়া এক বিবৃতিতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান হুথিদের বিরুদ্ধে ইসলামের পবিত্রতম দুই স্থান মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টার অভিযোগ করেছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, “মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা এবং সৌদি আরবের শহর, বেসামরিক স্থাপনা ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে চলমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে পক্ষগুলো। একই সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে যেকোনো হামলা বা হুমকি তারা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।”

আগস্টে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র লক্ষ্য হলো যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতা শক্তিশালী করা। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিনটি দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

সূত্র : রয়টার্স, আরিয়ানা নিউজ

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ