২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে উদযাপনের যে ট্রেন্ড সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করে, তা হলো নরওয়েজীয় ‘ভাইকিং রো’ ট্রেন্ড। নরওয়ে ফুটবল দলের সাফল্যের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এর জনপ্রিয়তা।
মধ্যযুগীয় বর্বরতার এই প্রতীকী উদযাপন ও ভাইকিং নামটি নরওয়ে ফুটবল দলের বদৌলতে নতুন করে বিশ্ববাসীর সামনে আসে। দলটি বিশ্বকাপ যাত্রা পূর্ব দলীয় ফটোসেশানে নিজেদের পূর্বপুরুষদের বর্বর ঐতিহাসিক পরিচয় বহন করা পোষাকে ছবি তুলে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
পরবর্তীতে একের পর এক সাফল্য ও ম্যাচ শেষে গ্যালারিতে থাকা সমর্থকদের নিয়ে দলটির সম্মিলিত ‘ভাইকিং রো’ উদযাপন ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে উন্মাদনা ছড়িয়ে দেয়। মাঠে, গ্যালারিতে, রাস্তায় কিংবা সোশ্যাল প্লাটফর্ম—যেখানেই নরওয়ের জয় কিংবা সমর্থক সেখানেই ‘ভাইকিং রো’ উদযাপন।
বাইরে থেকে এটি নিছক আনন্দঘন ফুটবল উদযাপন। কিন্তু এর আড়ালে যে ইতিহাসের অন্যতম বর্বর ও নৃশংসদের ‘ভাইকিং’ পরিচয়কে বিশ্বমঞ্চে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ইতিহাস-সচেতন মহলে।
নরওয়ের ফুটবল দল ২০২৬ বিশ্বকাপে দারুণ ছন্দে আছে। সম্প্রতি ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয়। এই জয়ের পর ‘রো’ উদযাপন আরো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। দেশটির পার্লামেন্টের পাশাপাশি নৌ, বিমান ও স্থল বাহিনীর সদস্যদেরও সম্মিলিতভাবে দাঁড় টানার ভঙ্গিমায় ‘ভাইকিং রো-ময়’ উদযাপন করতে দেখা যায়।
এমনকি বাংলাদেশেও ম্যাচটি শেষে বর্বরতার এই প্রতীকী উদযাপনের মাধ্যমে উল্লাস প্রকাশ করা হয়। বিশেষত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হল বা অডিটোরিয়ামে, যেখানে বড় পর্দায় ব্রাজিল বনাম নরওয়ে ম্যাচ প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। নরওয়ের রাষ্ট্রদূত এস্পেন রিকটার-ভেন্ডসেনও (Espen Rikter-Svendsen) সশরীরে উপস্থিত থেকে পর্দায় ম্যাচটি উপভোগ করেছিলেন এবং ম্যাচ শেষে ড্রাম বাজিয়ে ‘ভাইকিং রো’ উদযাপনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
নরওয়ে কোচ স্টালে সোলবাকেন এই উদযাপনকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে বলেছেন, যেন পুরো নরওয়ে একসঙ্গে দাঁড় টানছে।
কি এই ভাইকিং রো?
ভাইকিং মূলত প্রাচীন নর্স ভাষার একটি শব্দ। যার অর্থ জলদস্যু। স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চল বা বর্তমান নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্কের সমুদ্রচারী যোদ্ধা, জলদস্যু ও দাস ব্যবসায়ীরা ইতিহাসে ভাইকিং নামে পরিচিতি লাভ করে। আর নরওয়েজীয় ভাষায় ‘রো’ অর্থ দাঁড় টানা।
‘ভাইকিং রো’ মূলত এক ধরনের সমবেত উদযাপন ভঙ্গি, যেখানে অদৃশ্য নৌকায় বসে ‘রো’ ধ্বনি দিতে দিতে দাঁড় টানার মতো হাত নাড়তে হয়। এর শুরুতে থাকে ভাইকিংদের শিঙার আওয়াজ, নাহয় ড্রাম ক্ল্যাপিং।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই উদযাপন কি কেবল ফুটবলের আনন্দ? নাকি এর মাধ্যমে ভাইকিংদের বিধ্বংসী ও আগ্রাসী ইতিহাসকে ফুটবলের মোড়কে গ্রহণযোগ্য, আকর্ষণীয় ও গৌরবময় করে তোলা হচ্ছে?
ভাইকিংদের ইতিহাস শুধু সমুদ্রযাত্রা, সাহসিকতা বা অভিযানপ্রিয়তার ইতিহাস নয়। এটি ইউরোপে হামলা, লুটপাট, দাসত্ব বরণ করানো, ধর্মীয় স্থানে আক্রমণ এবং জনপদ ধ্বংসেরও ইতিহাস।
বর্বর ভাইকিংদের প্রথম বড় হামলার শিকার হয়েছিলো ইংল্যান্ড। ৭৯৩ সালের লিন্ডিসফার্ন গির্জায় তারা প্রথম বড় ধরণের হামলা চালায় বলে ইতিহাসে পাওয়া যায়। এই হামলা থেকেই ভাইকিং যুগের শুরু ধরা হয়।
লিন্ডিসফার্ন গির্জায় হামলার পর থেকে তারা নিয়মিত ইংল্যান্ডের উপকূলে হামলা চালাতো। হত্যাযজ্ঞ, ঘরবাড়ি ধ্বংস ও সম্পদ লুটের পাশাপাশি নারী-পুরুষ ও শিশুদের দাস হিসেবে ধরে নিয়ে যেতো।
শুধু ইংল্যান্ড নয়, ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলেও তারা একই কাজ করতো। গির্জা ও বাড়িঘরগুলোতে হামলা চালাতো। লোকজনকে হত্যা করতো নাহয় দাস বানাতো। সম্পদ লুট করে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতো।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল মেরিটাইম মিউজিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, ভাইকিংরা গির্জা থেকে সম্পদ লুট করার পাশাপাশি পুরোহিত বা সন্ন্যাসীদেরও হত্যা করতো কিংবা দাস হিসেবে বিক্রি করতো।
দাসপ্রথা ছিলো ভাইকিংদের গুরুতর বাস্তবতা। ডেনমার্কের ন্যাশনাল মিউজিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, ভাইকিংরা হেডেবি ও ভলগা অঞ্চলের বোলঘরের মতো বাণিজ্যকেন্দ্রে দাস বিক্রি করতো। দাসরা ঘরের কাজ, কৃষিকাজ এবং কঠিন শ্রমে ব্যবহৃত হতো। তাদের মানবিক বা ব্যক্তিগত অধিকার বলতে কিছুই থাকতো না; অনেক ক্ষেত্রে তাদের সাথে হুবহু পশুর মতো আচরণ করা হতো।
স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ইতিহাসবিদ নিল প্রাইসের আলোচনায় বলা হয়, ভাইকিং যুগে মানুষ ধরে আনা, বিক্রি করা ও জোরপূর্বক কাজে লাগানো ছিলো তাদের সংস্কৃতির কেন্দ্রীয় স্তম্ভ। অর্থাৎ ভাইকিংদের ইতিহাসকে শুধু নৌযাত্রা, বীরত্ব বা অভিযানের রোমাঞ্চে সীমাবদ্ধ করার অর্থ হলো ইতিহাসের বড় একটি অংশকে আড়াল করা।
একারণে নরওয়ের ‘ভাইকিং রো’ উদযাপনকে অনেকেই নিরীহ সাংস্কৃতিক আনন্দ হিসেবে দেখতে রাজি নন। ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যমের আলোচনাতেও দেখা গেছে, নরওয়ের এই ভাইকিং প্রতীক ব্যবহারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। তুরস্কের একটি সংবাদমাধ্যম একে নরওয়েজীয়দের বর্বর ও লুটেরা পূর্বপুরুষদের বিশ্বমঞ্চে ব্র্যান্ডে পরিণত করার অপচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছে।
আসলে আধুনিক খেলাধুলা অনেক সময় ইতিহাসকে নতুনভাবে প্যাকেজিং করে। কোনো জাতির অতীত থেকে বেছে নেওয়া হয় কেবল সাহস, শক্তি, অভিযান, ঐক্য ও বিজয়ের প্রতীক। বাদ পড়ে যায় লুটপাট, আগ্রাসন, দাসত্ব, হত্যাযজ্ঞ ও ধর্মীয় স্থাপনায় আক্রমণের মতো ভয়ংকর ও নৃশংস বাস্তবতা। ‘ভাইকিং রো’ উদযাপনের ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটছে বলে সমালোচকগণ দাবী করছেন।
নরওয়ের সমর্থকরা যখন ফুটবল মাঠে নিজেদের ‘ভাইকিং’ পরিচয়ে তুলে ধরছেন, তখন বিশ্বদর্শকের সামনে ভাইকিংদের একটি নম্র, আনন্দময় ও উৎসবমুখর ছবি হাজির হচ্ছে। সেখানে ভাইকিং মানে যেন সাহসী নাবিক, ঐক্যবদ্ধ জাতি, দাঁড় টানা জাহাজ এবং উৎসব। কিন্তু ইতিহাসের অন্য পিঠে আছে ধর্মীয় ও সাধারণ স্থাপনায় হামলা, ধর্মগুরু ও সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার, তাদের দাসবাজারে বিক্রি এবং ইউরোপজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়ার বাস্তবতা।
নরওয়ের বিশ্বকাপ সাফল্য তাদের জাতীয় আনন্দের বিষয় হতে পারে। ফুটবলের মাঠে সমর্থকদের আবেগ ও উল্লাস প্রকাশ করাও স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আবেগের সঙ্গে যখন ‘ভাইকিং’ প্রতীককে গৌরবের ভাষায় ফিরিয়ে আনা হয়, তখন ইতিহাসের দায়ও সামনে আসে। কোনো জাতি তার অতীতের একাংশকে রোমাঞ্চ হিসেবে তুলে ধরে অন্য অংশকে আড়াল করলে, তা আর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যগত উদযাপনের সীমানায় থাকে না; তা হয়ে ওঠে ইতিহাসের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপব্যবহার।
ফুটবল বিশ্বকাপকে বলা হয় “দ্যা গ্রেটেস্ট শো অন দ্যা আর্থ”। অর্থাৎ পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা প্রদর্শনী। এমন বৈশ্বিক প্রদর্শনী বা আসরে যেকোনো কিছুই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। লক্ষ-কোটি মানুষ তা দেখে, অনুকরণ করে, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। ইতিহাসের দায় থেকে তাই নরওয়ের এই উদযাপনকে কেবল খেলার আনন্দ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ফুটবল এখানে ইতিহাসের এক নতুন পর্দা তৈরি করছে। সেই পর্দার সামনে দেখা যাচ্ছে উল্লাস, ঢোল, শিঙা ও দাঁড় টানার ছন্দ; আর পর্দার পেছনে চাপা পড়ছে ভাইকিংদের সর্বনাশা আগ্রাসন, হত্যাযজ্ঞ, লুটপাট ও দাস-ব্যবসার অতীত।










