spot_img
spot_img

শীতের বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসে বিপর্যস্ত গাজ্জার বাস্তুচ্যুতরা, পানিতে ডুবেছে হাজারো তাঁবু

যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষত না শুকাতেই গাজ্জায় শুরু হয়েছে শীতের দুর্ভোগ। শীতের বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসে বাস্তুচ্যুতদের জরাজীর্ণ তাঁবু উড়ে গেছে কিংবা পানিতে ডুবে গেছে। এতে হাজার হাজার পরিবারকে প্রচণ্ড শীতের মধ্যে কাদাপানিতে রাত কাটাতে হয়েছে। ভিজে গেছে শিশুদের বিছানা ও চাদরসহ পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।

শনিবার (৭ নভেম্বর) ভোরে গাজ্জা উপত্যকায় আঘাত হানা গভীর নিম্নচাপের কারণে হাজার হাজার পরিবারকে এ দুর্ভোগে পড়তে হয়। শীতের প্রকৃত দুর্যোগ শুরু হওয়ার আগেই বৃষ্টির পানির সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে এসব পরিবারকে।

গত রাত থেকে জাবালিয়া, বেইত লাহিয়া, নুসেইরাত, দেইর আল-বালাহ ও গাজ্জা নগরীর বাস্তুচ্যুতদের শিবিরগুলো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রবল ঝোড়ো বাতাস ও ভারী বৃষ্টিতে হাজার হাজার তাঁবু পানিতে ডুবে গেছে কিংবা উড়ে গেছে। সন্তানদের রক্ষা করতে হিমশিম খেয়েছেন বাস্তুচ্যুত মা-বাবারা। ভেজা মাটিতে শীত ও অসহায়ত্বে কাঁপতে থাকা শিশুদের নিরাপদ রাখার সামর্থ্য ছিল না অনেক পরিবারের।

নিজের তাঁবু পানিতে ডুবে যাওয়ার পর আকস্মিক এই বিপর্যয়ের ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন মুহাম্মদ আল-মিসরি। সাফা সংবাদ সংস্থাকে তিনি বলেন, আমরা ভেজা অবস্থাতেই ঘুমিয়েছি। ভোরের প্রথম প্রহরেই পানি আমার তাঁবুতে ঢুকে পড়ে। এতে শিশুদের চাদর ও বিছানা নষ্ট হয়ে গেছে।

মুহাম্মদ আল-মিসরি ও তার পরিবারকে পুরো রাত প্রচণ্ড শীতের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে কাটাতে হয়েছে। ঝোড়ো বাতাসে তাঁবুর ছাদ যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কায় তারা সারারাত উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন।

তিনি প্রশ্ন করেন, শিশুদের অপরাধ কী? তাদের অপরাধ শুধু এই বিপর্যস্ত ভূমিতে জন্ম নেওয়া? তারা কোনো চাদর ছাড়াই ঘুমাতে যায়, আবার ঘুম থেকে জেগে ওঠে।

একই দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন ৪৫ বছর বয়সী ওয়াফা আল-বুরাইম। সন্তানদের নিয়ে ঘুম থেকে উঠে আল-আত্তার এলাকায় বৃষ্টির কাদা ও শিশুদের আতঙ্কের মধ্যে কাটানো দুঃসহ সময়ের বর্ণনা দিয়েছেন তিনি।

সাফাকে নিউজকে আল-বুরাইম বলেন, সবকিছু পানিতে ডুবে গেছে। পানি তাঁবুর ভেতরে ঢুকে পড়েছে এবং আমাদের সামান্য জিনিসপত্রও নষ্ট করে দিয়েছে। বিছানা, আটা, রান্নাঘরের জিনিসপত্র, কিছুই রক্ষা পায়নি।

তিনি আরও বলেন, গাজ্জার মায়েরা আবারও পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়েছেন। তাঁরা পরিবারগুলোর জন্য সামান্য উষ্ণতা কিংবা বসার মতো একটুকরো শুকনো জায়গাও জোগাড় করতে পারছেন না। গোলাবর্ষণের নরক থেকে পালিয়ে আসা এসব পরিবার এখন বৃষ্টির কাদায় ডুবে যাচ্ছে।

উত্তর গাজ্জা থেকে বাস্তুচ্যুত ইমাদ মুহসিন বলেন, এই নিম্নচাপ শুধু বৃষ্টি নিয়ে আসেনি, বরং এটি ছিল এক ধ্বংসাত্মক আঘাত। ঝড় তাঁবুগুলো উপড়ে ফেলেছে এবং সেগুলোকে বিশাল জলাশয়ে পরিণত করেছে।

সেই রাতের বর্ণনা দিয়ে তিনি আরও বলেন, আমরা দাঁড়িয়ে কিংবা বসে রাত কাটিয়েছি। গত রাতের পানিতে ডুবে যাওয়ার পর আদৌ ঘুমাতে পেরেছিলাম কি না, তা-ই বুঝতে পারিনি। এরপর রাতেই আবার বৃষ্টি শুরু হয়।

তার স্ত্রী বলেন, তাঁবুর ভেতরে জমে থাকা পানি হাত দিয়ে সরানোর জন্য পরিবারের সদস্যরা পালা করে রাত কাটিয়েছেন। একই সঙ্গে আটা ও আমাদের কাপড়চোপড়ের মধ্যে যা কিছু রক্ষা করা সম্ভব, সেগুলো বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন।

অন্যদিকে রামি আবু হাজরাস বলেন, গত রাতের দুর্ভোগ যুদ্ধের শুরুর দিকের কঠিন দিনগুলোর স্মৃতি আবারও ফিরিয়ে এনেছে, তবে এবার ভিন্ন রূপে।

তিনি বলেন, এটি আমাদের রাফাহতে তাঁবুর ভেতরে কাটানো প্রথম শীতের রাতটির কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। তখনও ছিল প্রচণ্ড শীত, তাঁবুতে পানি ঢুকেছিল, আর ঘুমানোর কোনো সুযোগ ছিল না।

বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে তাঁবুগুলোর মধ্যবর্তী জায়গা অত্যন্ত সংকীর্ণ হওয়ায় গত রাতে বৃষ্টির ঢলের পানি সরাতে পারেননি অনেকে। কোনো সংস্থা বা পক্ষের কাছ থেকেও সহায়তা পৌঁছায়নি। ফলে নিজেদের দুর্ভোগ মোকাবিলায় সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েছেন তারা।

বাস্তুচ্যুতদের তাঁবুতে প্রথমবার পানি ঢোকার মুহূর্তগুলোর ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন রুকাইয়া আল-শায়ের। তিনি জানান, পরিবারগুলো এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে, যেখানে তীব্র শীত থেকে রক্ষা পাওয়ার মতো কোনো আশ্রয় ছাড়াই ভেজা মাটিতে রাত কাটাতে হয়েছে।

তিনি বলেন, আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে শীতে কাঁপতে থাকা শিশুদের কান্না ও অভিযোগ। সেখানে আমি একাই ছিলাম। গরম রাখার কোনো ব্যবস্থা ছিল না, এমনকি ভারী বৃষ্টি ঠেকানোর মতো উপযুক্ত ত্রিপলও ছিল না।

বাস্তুচ্যুত খলিল হামুদার জোড়াতালি দেওয়া তাঁবুতে মধ্যরাতে পানি ঢুকে পড়ে। এ অবস্থায় খালি পায়ে থাকা সন্তানদের নিয়ে প্রবল বৃষ্টির মধ্যে খোলা জায়গায় বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন তিনি।

তিনি আরও বলেন, বৃষ্টির কারণে তাঁবুর ছাদ নিচে নেমে এসেছিল। তাই আমরা অন্য একটি জায়গায় গিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করেছি।

অন্যদিকে জিয়াদ সালেহা জানিয়েছেন, প্রবল বাতাসে জরাজীর্ণ তাঁবুটি উড়ে যাওয়া ঠেকাতে তিনি সারারাত তাঁবুর খুঁটি ধরে বসে ছিলেন। অথচ কাদাপানিতে সম্পূর্ণ ডুবে যাওয়া সন্তানদের বিছানার চাদরগুলো রক্ষার জন্য কিছুই করতে পারেননি।

আগেও পানিতে ডুবে যাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার বাস্তুচ্যুতরা জানিয়েছেন, একই ধরনের কঠিন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটছে। অথচ অবকাঠামো কিংবা তাঁবুগুলোর প্রস্তুতিতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি।

তারা আরও জানিয়েছেন, নাইলনের ব্যাগ ও কার্টন দিয়ে তাঁবু মেরামতের চেষ্টা এখন অর্থহীন হয়ে পড়েছে। কারণ, প্রবল বৃষ্টির সামনে এসব উপকরণ কোনো কাজে আসছে না। বৃষ্টি কেবল ধ্বংস আর বিপর্যয়ই রেখে যাচ্ছে।

এই বিপর্যয়ের মধ্যে গাজ্জার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল সতর্ক করে বলেছেন, এই নিম্নচাপ আসন্ন কঠিন শীত মৌসুমের বিপদের পূর্বসংকেত।

তিনি বিশ্বের দেশগুলো এবং নিশ্চয়তাদানকারী পক্ষগুলোর প্রতি জরুরি চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে উদ্ধারকারী যান ও সরঞ্জাম, শীতকালীন প্রয়োজনীয় সামগ্রী, তাঁবু এবং প্রয়োজনীয় জ্বালানি গাজ্জায় প্রবেশ করতে পারে। এসব সরঞ্জাম ও জ্বালানি পেলে বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মীরা তাঁদের মানবিক দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।

গাজ্জা উপত্যকায় মোট ২ হাজার ১৬৬টি জরুরি সহায়তার আহ্বান জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে গতকাল উদ্ধারকর্মীরা মাত্র ২১৮টিতে সাড়া দিতে পেরেছেন।

সূত্র : সাফা নিউজ এজেন্সি

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ