আগামী ২৪ ডিসেম্বর ১০ দফা দাবিতে গণমিছিলের ঘোষণা করেছে জামায়াত। রাজধানী ঢাকার একটি স্থানীয় মিলনায়তনে কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে দেশবাসীর উদ্দেশে বক্তব্য প্রদান ও কর্মসূচি ঘোষণা করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
শনিবার (১০ ডিসেম্বর) রাজধানীর একটি মিলনায়তনে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে দেশবাসীর উদ্দেশে বক্তব্য প্রদান ও কর্মসূচি ঘোষণা করেন তিনি।
জামায়াতের আমির ১০ দফা দাবি উল্লেখ করে আগামী ২৪ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহর ও জেলায় জেলায় গণমিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ আজ এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নিপতিত। দেশ অব্যাহতভাবে নতুন নতুন সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সামাজিক অঙ্গণে এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি বিদ্যমান।
তিনি বলেন, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে নির্বাচনের নামে প্রহসনের আয়োজন করে অন্যায় ও অনৈতিকভাবে বাংলাদেশের ক্ষমতা দখল করা হয়। আজ বাংলাদেশে জনগণের ভোটাধিকার নেই, কথা বলা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। চলাফেরা, মিছিল-মিটিং, সভা-সমাবেশ করার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশ আজ এক অধিকারহারা জাতিতে পরিণত হয়েছে। সরকার দেশের প্রশাসন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে দলীয়করণ করেছে।
জামায়াতের আমির বলেন, ক্রমাগতভাবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি তেল, কৃষি ও শিক্ষা উপকরণ এবং ভোজ্যতেলের মূল্য দফায় দফায় বৃদ্ধি পেয়ে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। দেশে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংকটের কারণে জনগণকে ব্যাপক দুর্ভোগের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
১০ দফা দাবি
১। অবিলম্বে বর্তমান অনির্বাচিত, অবৈধ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করে গণতন্ত্র হরণকারী, দুর্নীতিবাজ ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্ট সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে এবং ১৯৯৬ সালে সংবিধানে সংযোজিত ধারা ৫৮-খ, গ ও ঘ এর আলোকে নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ একটি অন্তর্বর্তীকালীন কেয়ারটেকার সরকার গঠন করতে হবে।
২। কেয়ারটেকার সরকার বর্তমান নির্বাচন কমিশন বাতিল করে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করবে। ওই নির্বাচন কমিশন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অনিবার্য পূর্বশর্ত হিসেবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আরপিও সংশোধন, ইভিএম পদ্ধতি বাতিল ও পেপার ব্যালটের মাধ্যমে ভোটের ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার বাতিল করতে হবে।
৩। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ সব বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মী, আলেম-উলামা, মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিকদের সাজা বাতিল, সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, সব শ্রেশি-পেশার মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন বন্ধ ও সব রাজনৈতিক কারাবন্দিদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
৪। অবিলম্বে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ সব দলের অফিস খুলে দেওয়া, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে স্থগিত করা জামায়াতের নিবন্ধন ও প্রতীক ফিরিয়ে দেওয়া এবং দেশে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক সভাসহ সব ধরনের সভা-সমাবেশ ও মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সব দলকে স্বাধীনভাবে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনে প্রশাসন ও সরকারি দলের মাধ্যমে সব ধরনের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। স্বৈরাচারী কায়দায় বিরোধী কণ্ঠকে স্তব্ধ করার লক্ষ্যে নতুন মামলা ও নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার বন্ধ করতে হবে।
৫। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮, সন্ত্রাস দমন আইন-২০০৯ এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪ সহ মৌলিক মানবাধিকার হরণকারী সব আইন-কানুন বাতিল করতে হবে।
৬। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস, সার ও পানিসহ সেবা খাতগুলো মূল্যবৃদ্ধির গণবিরোধী সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে এবং কৃষি ও শিক্ষা উপকরণ, শিশুখাদ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করতে হবে। মুদ্রাস্ফীতির আলোকে শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, নারী-শিশু নির্যাতন, শিশুশ্রম বন্ধ করা ও কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।
৭। গত ১৫ বছর ধরে বিদেশে অর্থপাচার, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত ও শেয়ার বাজারসহ রাষ্ট্রীয় সবক্ষেত্রে সংঘটিত দুর্নীতি চিহ্নিত করার লক্ষ্যে একটি স্বাধীন শক্তিশালী কমিশন গঠন করতে হবে। সুদ, ঘুষ বন্ধ করাসহ ছাত্র-যুব সমাজের চরিত্র রক্ষা ও মাদকের ছোবল থেকে যুব সমাজকে উদ্ধার এবং ধর্মীয় শিক্ষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বন্ধ করতে হবে।
৮। গত ১৫ বছরে গুমের শিকার সব নাগরিকদের উদ্ধার করতে হবে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন বন্ধ ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার আইনগত বিচারের ব্যবস্থা করে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘর, উপাসনালয় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সম্পত্তি দখলের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়ায় শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৯। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের উপযোগী করার লক্ষ্যে সরকারি হস্তক্ষেপ পরিহার করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
১০। সীমান্ত হত্যা বন্ধ ও দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জাতিকে দ্বিধা-বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র বন্ধ করে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
জামায়াত আমির ১০ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী ২৪ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহর ও জেলায় জেলায় গণমিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মতিউর রহমান আকন্দের সঞ্চালনায় সভায় উপস্থিত ছিলেন নায়েবে আমির ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, নায়েবে আমির ও সাবেক এমপি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ তাহের, ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মাছুম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি হামিদুর রহমান আযাদ, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সেলিম উদ্দিন।










