ভারতে হিন্দুদের ধর্মীয় আয়োজন কুম্ভমেলাকে সামনে রেখে মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনে শত বছরের বেশি পুরোনো শাহি মসজিদের একটি অংশ ভেঙে ফেলার অনুমতি দিয়েছে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট।
২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভমেলায় কয়েক কোটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীর সমাগম হবে, এমন যুক্তিতে মসজিদের পাশের সড়ক ১৫ মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত করতে চায় উজ্জয়িন পৌর করপোরেশন। এ জন্য মসজিদের একটি অংশ সরানোর নোটিশের বিরুদ্ধে করা দুটি আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আদালত।
বিচারপতি সন্দীপ এন ভাটের বেঞ্চ এ রায় দেন। আদালত বলেছেন, পৌর করপোরেশন প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে এবং মসজিদ কর্তৃপক্ষকে বক্তব্য জানানোর সুযোগও দিয়েছে।
মসজিদের অংশ ভাঙার সিদ্ধান্তে ভারতের সংবিধানের ১৪, ২৫, ২৬ ও ৩০০এ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘিত হয়নি বলেও মন্তব্য করেছেন আদালত।
২০২৮ সালের ২৭ মার্চ থেকে ২৭ মে পর্যন্ত মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনে সিংহস্থ কুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিপুলসংখ্যক হিন্দু ধর্মাবলম্বীর সমাগমকে সামনে রেখে শহরের বিভিন্ন সড়ক ও অবকাঠামো পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
শতবর্ষী শাহি মসজিদটি মহাকালেশ্বর মন্দিরের প্রায় বিপরীতে এবং ক্ষিপ্রা নদীর কাছাকাছি অবস্থিত।
আদালত বলেছেন, কুম্ভমেলায় কয়েক কোটি মানুষের উপস্থিতি, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, জননিরাপত্তা ও বৃহত্তর জনস্বার্থ বিবেচনায় পৌর করপোরেশনের পদক্ষেপ আইনসম্মত।
অন্যদিকে মসজিদ কর্তৃপক্ষ আদালতে তুলে ধরেন, সড়ক প্রশস্ত করার জন্য যে অংশ ভাঙার পরিকল্পনা করা হয়েছে, এর মধ্যে মসজিদের নামাজ আদায়ের স্থান বা জামাতখানার একটি অংশ, প্রায় ১২০ ফুট উঁচু মিনার এবং মাজার চৌক শাহি রয়েছে।
শতবর্ষী এ মসজিদের জামাতখানা, ওজুর ব্যবস্থা ও মিনার মুসল্লিদের ধর্মীয় কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জনস্বার্থের নামে সড়ক প্রশস্তকরণ শত বছরের বেশি সময় ধরে ব্যবহৃত মুসলিম উপাসনালয়ে ধর্ম পালনের সাংবিধানিক অধিকারকে অগ্রাহ্য করতে পারে না বলে আদালতে যুক্তি দেন মসজিদ কর্তৃপক্ষ।
ভারতের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদের অধীনে ধর্ম পালনের অধিকারসংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট রায়গুলোও আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হয়।
একই সঙ্গে আদালতকে জানানো হয়, উজ্জয়িন পৌর করপোরেশন মধ্যপ্রদেশ মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন আইন অনুযায়ী নির্ধারিত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করেনি এবং মধ্যপ্রদেশ ওয়াকফ বোর্ডকেও যথাযথভাবে নোটিশ দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে পৌর করপোরেশন জানায়, কেবল শাহি মসজিদকে লক্ষ্য করে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একই সড়কের উন্নয়ন প্রকল্পে ইতোমধ্যে ১০টি মন্দির এবং আরও একটি মসজিদের কিছু অংশ সরানো হয়েছে।
শহরের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৮০টি ধর্মীয় স্থাপনার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে আদালতে জানায় পৌর করপোরেশন।
পৌর করপোরেশন আরও জানায়, সড়ক প্রশস্ত করতে শাহি মসজিদের মোট স্থাপনার ১০ শতাংশেরও কম অংশ অপসারণ করতে হবে।
এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আদালত মসজিদ কর্তৃপক্ষের দুটি আবেদন খারিজ করে দেন। এর ফলে কুম্ভমেলার জন্য সড়ক প্রশস্ত করতে শতবর্ষী মসজিদের অংশ ভাঙার ক্ষেত্রে আইনি বাধা দূর হলো।
শাহি মসজিদটি ‘শাহি মসজিদ ওয়াকফ পঞ্চায়েত মোচিয়ান’ নামেও পরিচিত এবং ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে নিবন্ধিত।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির উল্লেখ করা ঐতিহাসিক নথিতে এর শতবর্ষী ইতিহাসের তথ্য পাওয়া যায়।
১৯২৫ সালের ১৭ মার্চ সিন্ধিয়া আমলের গোয়ালিয়র সরকারের টাউন ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের একটি চিঠিতে ওই এলাকায় জমি অধিগ্রহণের সময় মসজিদের অবশিষ্ট অংশ অক্ষত রাখার নির্দেশের উল্লেখ রয়েছে।
১৯৮৫ সালের মধ্যপ্রদেশ সরকারের গেজেটেও মসজিদ এবং এর জমির পরিমাপের উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া মসজিদ পরিচালনা কমিটি জানিয়েছে, যান চলাচল সহজ করতে ১৯৭৫ সালে তারা স্বেচ্ছায় কিছু জমি ছেড়ে দিয়েছিল।
ভারতে হিন্দু ধর্মীয় স্থানে যাতায়াত সহজ করার প্রকল্পে মসজিদের অংশ ভাঙার ঘটনা এটিই প্রথম নয়।
এর আগে বিজেপিশাসিত উত্তরপ্রদেশের বারাণসীর ডাল মান্ডিতে কাশি বিশ্বনাথ ধামে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের যাতায়াত সহজ করার জন্য সড়ক ১৭ দশমিক ৪ মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত করার প্রকল্পে ছয়টি মসজিদের অংশ ভেঙে ফেলা হয়।
বিজেপি সরকারের ২২৪ কোটি রুপির ওই প্রকল্পে ১৮০টি দোকান ও বাড়িও ভাঙা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই মুসলিমদের মালিকানাধীন অথবা মুসলিমদের পরিচালিত ছিল।
সূত্র : মাকতুব মিডিয়া












