রহস্যময় সিদ্ধান্ত নিলেন তুরস্কের আসন্ন নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৩য় অবস্থানে থাকা মুহাররম ইনচে।
বৃহস্পতিবার (১১ মে) শক্তিশালী অবস্থানে থেকেও কাউকে সমর্থন না দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
হোমল্যান্ড পার্টির প্রধান মুহাররম বলেন, আমি আমার প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। আর এটি আমি আমার দেশের জন্য করছি।
নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেও এর সুস্পষ্ট কোনো কারণ তিনি উল্লেখ করেননি। শুধু এতটুকু বলেছেন যে, তুরস্ক আমার ভাবমূর্তি রক্ষা করতে পারেনি। অথচ ভাবমূর্তি একজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচনের একেবারে আগ-মুহুর্তে কোনো জোট এবং প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত না জানিয়ে সরে দাঁড়ানোয় তার দল হোমল্যান্ড নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তুরস্কের ভবিষ্যতের জন্য হোমল্যান্ড পার্টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্যই এই দলের সংসদে থাকা উচিত। এই দলের জন্য প্রতিটি ঘর থেকে অন্তত একটি ভোটের আশা রাখি।
নিরঙ্কুশ বিজয় পেতে নিখুঁত পরিকল্পনা থাকা ও কোনো ধরণের অজুহাত থাকা অনুচিত এদিকে ইঙ্গিত করে মুহাররম বলেন, তারা যদি নির্বাচনে হেরে যায় তাহলে এর দোষ আমাদের ঘাড়ে চাপাতে চায়বে। অথচ দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর নির্বাচনে তাদের কোনো অজুহাত থাকা অনুচিত।
মূলত তার বিরুদ্ধে সম্প্রতি অভিযোগ উঠে যে, তিনি প্যালেসে গিয়ে এরদোগানের সাথে দেখা করে এসেছেন এবং নির্বাচনে এরদোগান বিরোধীদের ভোট পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে তাকে অর্থ প্রদান করা হয়। এছাড়া তার একটি আপত্তিকর ভিডিও ক্লিপও ছড়িয়ে দেওয়া হয়, পরবর্তীতে যা ফেইক ভিডিও ক্লিপ হিসেবে প্রমাণিত হয়।
এমন লজ্জাজনক পরিস্থিতি ও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য জনিত কারণ দেখিয়ে তিনি বুধবার (১০ মে) তুরস্কের পশ্চিমাঞ্চলের নির্বাচনী র্যালীও বাতিল করে দেন বলে জানা যায়।
অপরদিকে মুহাররম ইনচের এমন সিদ্ধান্তে প্রেসিডেন্ট পদের দৌড়ে থাক শীর্ষ দুই প্রার্থী এরদোগান ও কিলিচদার ওগলু মন্তব্য করেছেন।
কিলিচদার ওগলু এক টুইট বার্তায় এবিষয়ে বলেন, ইনচেকে আমাদের জোটে শরীক হওয়ার আহবান জানিয়েছিলাম। সেই পথ এখনো তার জন্য খোলা রয়েছে। পুরোনো বৈরিতা ও দ্বন্দ্ব একপাশে রেখে তাকে আবারো বলতে চাই, আপনাকে তুর্কি টেবিল (ন্যাশনাল এলায়েন্স/সিক্স টেবিল) জোটে স্বাগতম। আপনি দয়া করে এখানে আসুন।
আর আঙ্কারার এক জনসভায় বক্তৃতাকালে এরদোগান এবিষয়ে বলেন, একজন তার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এই ঘটনায় আমি খুবই দুঃখিত। কারণ আমি কিছুই জানি না। আমার কৌতুহল হচ্ছে যে আসলে কি হয়েছিলো তার সাথে!
এছাড়া তার সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত এরদোগানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও জোটকে শক্তিশালী করবে বলে জোর আশংকা প্রকাশ করছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকগণ।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রে মুহাররম ইনচের সমর্থক ও দলের ভোট এরদোগানের বিপক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার একটি কারণ হলো, তার নীতির অধিকাংশই প্রধান বিরোধী জোট ন্যাশনাল এলায়েন্স ও সিএইচপি দলনেতা কিলিচদার ওগলুর নীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণতা।
আর ইনচের দল হোমল্যান্ড পার্টি হলো এবারের নির্বাচনের একমাত্র দল যারা কোনো জোটের সমর্থন ছাড়া একাই প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।
এছাড়া মুহাররম ইনচে ২০২১ সালে সিএইচপি থেকে বের হয়ে হোমল্যান্ড পার্টি গঠনের আগে ২০১৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সিএইচপির হয়ে এরদোগানের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। যা সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলছে যে, তার দলের সমর্থন এরদোগান বিরোধী জোট ন্যাশনাল এলায়েন্সে যাবে।
অপরদিকে তুরস্কের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পোলিং ফার্ম ‘কোন্ডা’ একটি জরীপ চালায়। সর্বশেষ জরীপের তথ্য অনুযায়ী ৪ প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীদের মধ্যে মুহাররম ইনচের পক্ষে ভোট এসেছিলো ২.২ শতাংশ, সিনান ওগানের পক্ষে এসেছিলো ৪.৮ শতাংশ, এরদোগানের পক্ষে ৪৩.৭ শতাংশ আর কিলিচদার ওগলুর পক্ষে এসেছিলো সর্বমোট ৪৯.৩ শতাংশ।
অবশ্য এই জরীপটিতে মোট ৮১ প্রদেশের মধ্য থেকে ৩১ টি প্রদেশের মাত্র ৩৪৮০ জন নাগরিক অংশগ্রহণ করেছিলো।
জানা যায়, তুরস্কে প্রেসিডেন্ট পদে বিজয়ী হতে হলে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীকে অবশ্যই ৫০ শতাংশের উপরে ভোট পেতে হয়। আর সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলে নির্বাচনের ২ সপ্তাহ পর শীর্ষ ২ প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে যে কোনো একজনকে বেছে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া থাকে তা উতরে যেতে হয়।
তুরস্কের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পোলিং ফার্ম ‘কোন্ডার’ রিপোর্ট অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রক্রিয়া যদি ২য় রাউন্ডে গড়ায় তবে মুহাররম ইনচে ও সিনান ওগানের ভক্ত-সমর্থকদের অধিকাংশেরই ভোট যাবে কিলিচদার ওগলুর ঝুলিতে। যা তাকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে নিয়ে যাবে।
তবে মুহাররম ইনচের ভাইরাল আপত্তিকর ফেইক ভিডিও ক্লিপ ও নিন্দনীয় অভিযোগের পর দেওয়া বিবৃতি ভিন্ন ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
কারণ আঙ্কারায় হোমল্যান্ড পার্টির প্রধান কার্যালয়ের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, তুর্কি প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে এমন অপবাদ কখনোই পরিলক্ষিত হয়নি। এসবে আমি মোটেও ভীত নই। কারণ আমি আমার মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিচ্ছি ঠিকই কিন্তু তা করছি শুধুমাত্র আমার মাতৃভূমির জন্য। মাতৃভূমির স্বার্থ রক্ষায় এটি সহায়ক হবে।
উল্লেখ্য, এরদোগানের প্রধান বিরোধী কিলিচদার ওগলু সম্প্রতি সুস্পষ্ট ঘোষণা দেন যে, তিনি জয়ী হলে দেশকে এরদোগানের নীতি ও পরিকল্পনা থেকে দূরে সরিয়ে আনবেন। অথচ এই এরদোগানের হাত ধরেই তুরস্ক আজ সর্বক্ষেত্রে বিশ্বশক্তিদের পাল্লা দেওয়ার সক্ষমতায় পৌঁছেছে।
এছাড়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিমানবন্দর কামাল আতাতুর্ক বিমানবন্দরকে এভিয়েশন ও স্পেস সেন্টারে রূপান্তরের জন্য সরাসরি আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর তত্বাবধানে পরিচালিত আমেরিকান কোম্পানি এসএনসির হাতে তুলে দেওয়ারও ঘোষণা দেন কট্টর সেক্যুলারিজমে বিশ্বাসী এই নেতা। যা তুরস্ক জুড়ে সর্ব মহলে তুমুল বিতর্কের পাশাপাশি অসন্তোষ সৃষ্টি করে।
সূত্র: আল জাজিরা











