জাতীয় প্রেস ক্লাবে জুলাই সনদ, গণভোট ও নির্বাচনী এজেন্ডায় আধিপত্যবাদবিরোধী গণআকাঙ্ক্ষা এবং ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিফলনের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে মূল্যবোধ আন্দোলন। সংগঠনটি বলেছে, পরিভাষার মারপ্যাঁচে এবং নীতিগত উদ্যোগের আড়ালে দেশে এলজিবিটি, সমকামিতা ও ট্রান্সজেন্ডারবাদের নামে পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। তাদের মতে, এ প্রবণতা কেবল সামাজিক ও নৈতিক কাঠামোকেই নয়, জাতির ধর্মীয় চেতনা এবং রাষ্ট্রের মৌলিক মূল্যবোধকেও গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাই রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এলজিবিটি এজেন্ডা প্রতিরোধ, জনআকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী জুলাই সনদের সংশোধন এবং গণভোটের কাঠামো সংস্কারের দাবি জানায় সংগঠনটি।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি)য় জাতীয় প্রেস ক্লাবের মাওলানা আকরম খাঁ হলে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
মূল্যবোধ আন্দোলনের মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মাদ সাদাত বলেন, “ফ্যাসিবাদের আমল থেকেই আমরা ট্রান্সজেন্ডার ইস্যু নিয়ে প্রতিবাদ করে আসছি। যার কারণে সরকার পাঠ্যপুস্তকে শরীফ শরীফার আপত্তিকর গল্প বাদ দিতে বাধ্য হয়। ট্রান্সজেন্ডার সুরক্ষা আইন পাশ করার পাঁয়তারা হয়েছিলো। আমরা এর বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলাম।” তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় নীতির মধ্যে এমন ধারা ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে যা ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে সংঘর্ষপূর্ণ। তাদের প্রতিবাদ ধারাবাহিক থাকায় কিছু উদ্যোগ থেকে সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইঞ্জিনিয়ার সাদাত ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, শহীদ আবু সাঈদসহ শত শত শহীদ ইসলামী মূল্যবোধে তাড়িত হয়েই আত্মত্যাগ করেছেন। তিনি দাবি করেন, আবু সাঈদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এলজিবিটি বিরোধিতার সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। একইসঙ্গে তিনি বলেন, শহীদ ওসমান হাদি ভারতীয় আধিপত্যবাদকে চ্যালেঞ্জ করার পাশাপাশি এলজিবিটি ও ট্রান্সজেন্ডারের নামে পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের পথেও বাধা হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বলেন, সভ্যতা ও মূল্যবোধ বিনাশী সমকামী বিকৃতাচার প্রতিষ্ঠার অপতৎপরতার বিরুদ্ধে নীতি নির্ধারক মহল, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং শিক্ষক বুদ্ধিজীবীদের সচেতনতা গড়ে তুলতে নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মূল্যবোধ আন্দোলন।
ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মাদ সাদাত বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় একজন ব্যক্তি নিজেকে কখনো ট্রান্সনারী আবার কখনো সমকামী পুরুষ দাবি করে “অপরাধমূলক কাজে” জড়িয়েছে এবং বিশিষ্ট গবেষক ড. মোহাম্মাদ সরোয়ার হোসেন ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আসিফ মাহতাব উৎসকে বারবার হত্যার প্ররোচনা দিয়ে আসছে। তিনি বলেন, “তাদের শিরশ্ছেদকৃত মাথা দিয়ে ফুটবল খেলার কার্টুন অঙ্কন করে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করে সে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে থানায় একাধিক সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।
তার ভাষায়, “এই হত্যা প্ররোচনা ও হুমকির বিরুদ্ধে ২৫০ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি প্রদান করেছেন। কিন্তু দুঃখজনক যে, আজ পর্যন্ত কোনো আইনপ্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।” তিনি আরও দাবি করেন, ওই ব্যক্তি প্রকাশ্যে পুলিশের নাকের ডগায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বসে সমকামী বিয়ের অধিকারের দাবিতে অনশন করেছে এবং লাগাতার গালাগালিসহ হত্যার হুমকি দিয়ে চলেছে। ইঞ্জিনিয়ার সাদাত বলেন, “বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী সমকামিতা নিষিদ্ধ এবং দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু এই সমকামীর অপরাধকে আমলে নেয়া হচ্ছে না।”
তিনি দাবি করেন, এতে প্রতীয়মান হয় যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অপরাধের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে পক্ষপাতমূলক ও বৈষম্যপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। তিনি শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের আটক ও বিচারে শ্লথগতি এবং শিক্ষকদ্বয়ের বিরুদ্ধে হত্যাহুমকিদাতাদের ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়াকে বৈষম্যের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এহেন আচরণে তারা প্রচন্ড সংক্ষুব্ধ, তবে তারা “হাদির দেখানো পথ” থেকে পিছু হটবেন না।
এরপর ইঞ্জিনিয়ার সাদাত বলেন, দেশ বর্তমানে দুই ধরনের আধিপত্যবাদের শিকার, “ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী আধিপত্যবাদ এবং এলজিবিটি ও ট্রান্সজেন্ডারবাদের মাধ্যমে পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ বা কালচারাল ফ্যাসিজম।” তিনি দাবি করেন, অত্যন্ত সূক্ষ্ম কৌশলে শব্দ বা পরিভাষার মারপ্যাঁচে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করে সমকামী বান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠার নীল নকশা বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এর মধ্যে রয়েছে লিঙ্গ বৈচিত্র্য, লিঙ্গ সমতা, সাম্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের মতো পরিভাষা।
ইঞ্জিনিয়ার সাদাত বলেন, ইসলামের দৃষ্টিতে লিঙ্গ কেবল দুইটি নারী ও পুরুষ। তিনি আরও বলেন, হিজড়া কোনো পৃথক লিঙ্গ নয়, এটি লিঙ্গ প্রতিবন্ধিতা। নারী হয়ে পুরুষের বেশধারণ, পুরুষ হয়ে নারীর বেশধারণ, হরমোন থেরাপি ও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে লিঙ্গ পরিবর্তনের চেষ্টা এবং সমকামিতা ইসলামে হারাম বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, সারা বিশ্বের উলামায়ে কেরাম ট্রান্সজেন্ডারবাদকে কুফরী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
ইঞ্জিনিয়ার সাদাত “অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র” প্রসঙ্গে বলেন, ‘অন্তর্ভুক্তি’ একটি আন্তর্জাতিক পরিভাষা, স্থানীয়ভাবে কেউ কী বোঝে বা না বোঝে তা নয়; বরং এই পরিভাষার প্রণেতারা কী বোঝাতে চান সেটি অনুধাবন করতে হবে। তিনি দাবি করেন, জাতিসংঘ ও পশ্চিমা বিশ্বে এলজিবিটি অন্তর্ভুক্তি অন্তর্ভুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি ইউএনডিপির ৫১টি সূচকের কথা উল্লেখ করে বলেন, এগুলোকে এলজিবটিআই ইনক্লুশন ইনডেক্স বলা হয় এবং এসব সূচক পূরণ হলে সংসদে কোটা, শিক্ষাক্রমে তথ্য সংযোজন, আইনি বৈধতা, এনজিও কার্যক্রম অবাধ হওয়া এবং রাষ্ট্রীয় অর্থে চিকিৎসাসহ বিভিন্ন বিষয়ে চাপ তৈরি হতে পারে বলে তারা মনে করেন।
সংবাদ সম্মেলনে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ এর সহযোগী অধ্যাপক এবং মূল্যবোধ আন্দোলনের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মাদ সরোয়ার হোসেন বলেন, চায়না, রাশিয়া এবং তুরস্ক এলজিবিটির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। তিনি দাবি করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইউএসএইডের মাধ্যমে দেশে এলজিবিটি বান্ধব সমাজ গঠনের কার্যক্রম চলছিল। তিনি আরও বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ডিইআই প্রোগ্রামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সেসব বাতিল করায় বাংলাদেশে ইউএসএইডের ফান্ড বন্ধ হয়ে গেছে। তার ভাষায়, দেশের মানুষের মূল্যবোধের বিপক্ষে গিয়ে কেবল বাইরের শক্তিকে সন্তুষ্ট করার জন্য এলজিবিটি বান্ধব নীতি গ্রহণ করা নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ এবং গণআকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে।
ড. মোহাম্মাদ সরোয়ার হোসেন আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুরু থেকেই ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক একটি আদর্শিক অবস্থান নিয়েছে এবং সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এলজিবিটি এজেন্ডা দিন দিন আরও প্রকাশ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক হচ্ছে। তিনি সরকারের এলজিবিটি বান্ধব কার্যক্রমের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিভিন্ন আয়োজন, সংস্কার প্রস্তাবনা, অর্থ বরাদ্দ, বিদেশি সংস্থার অফিস খোলা, কোটাসহ নানা উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন এবং বলেন, এতসব ঘটনার পর সরকার ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এমন দাবি বিশ্বাসযোগ্য নয়।
গণভোট প্রসঙ্গে ড. সরোয়ার হোসেন বলেন, বর্তমান কাঠামোতে একজন ভোটারকে সবগুলো বিষয়ের সাথে একমত হতে হবে, নচেৎ সবগুলো নাকচ করতে হবে, যা ন্যায়সংগত নয়। তিনি সংবিধানের মূলনীতিতে “আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং কুরআন সুন্নাহ পরিপন্থী কোনো আইন বা বিধি না থাকার ব্যাখ্যা অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। তা সম্ভব না হলে জুলাই সনদের ৭, ৮, ২১ ও ২২ নম্বর অনুচ্ছেদের বিষয়গুলো ভবিষ্যৎ সংসদের হাতে রেখে এগুলোকে গণভোটের আওতামুক্ত করে হ্যাঁ না ভোটের আয়োজনের প্রস্তাব দেন। বিকল্প হিসেবে তিনি তিনটি অপশন রাখার দাবি জানান, হ্যাঁ, আপত্তিসহ হ্যাঁ এবং না।











