spot_img

ইসরাইলের সঙ্গে গোপন আঁতাতের অভিযোগে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমেদিনেজাদকে গৃহবন্দি

ইসরাইলের সঙ্গে গোপন আঁতাতের প্রমাণ পাওয়ার পর ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদকে দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী, (আইআরজিসি) গৃহবন্দি করে রেখেছে বলে দাবি করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।

ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে আহমেদিনেজাদকে ক্ষমতায় বসানোর লক্ষ্যে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিস্তারিতও প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যমটি।

সোমবার (১৩ জুলাই) সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরের পর বছর ধরে আহমেদিনেজাদকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ব্যবহারের চেষ্টা চালিয়েছে ইসরাইল। এমনকি তার শাসনামল শেষ হওয়ার পর তাকে ইরানপন্থি নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও করা হয়েছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে একটি অস্বাভাবিক ঘটনার সূত্রপাত হয়। লুদোভিকা ইউনিভার্সিটি অব পাবলিক সার্ভিসের রেক্টর অধ্যাপক গেরগেলি ডেলি হাঙ্গেরি সরকারের এক শীর্ষ কর্মকর্তার কাছ থেকে একটি অদ্ভুত অনুরোধ পান। ওই কর্মকর্তা তাকে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক একটি সম্মেলন আয়োজন এবং সেখানে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদকে আমন্ত্রণ জানানোর আহ্বান জানান।

তবে ওই সম্মেলনের আড়ালে ভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। হাঙ্গেরির ওই কর্মকর্তা অধ্যাপক ডেলিকে জানিয়েছিলেন, সম্মেলনটি কেবল একটি ছদ্মবেশ বা ‘ফ্রন্ট’। এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল বুদাপেস্টে আহমেদিনেজাদের সঙ্গে তার কট্টর শত্রু ইসরাইলের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের গোপন বৈঠকের ব্যবস্থা করা।

অধ্যাপক ডেলি জানতেন, আহমেদিনেজাদকে আমন্ত্রণ জানালে তার নিজের ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন হতে পারে। তবে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে হয়তো মানুষের জীবন রক্ষায় ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন।

ডেলি বলেন, ‘যখন দুটি শত্রুপক্ষ নিজেদের মধ্যে কথা বলতে চায়, তখন তাদের সেই সুযোগ করে দেওয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করাই শ্রেয়।’

অভিযানের সংবেদনশীল তথ্যের বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমেরিকান ও ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, ২০২৪ সালে আহমেদিনেজাদের ওই বিশ্ববিদ্যালয় সফর এবং পরের বছর দ্বিতীয় দফায় সেখানে যাওয়া ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ ছিল।

ইসরাইল মূলত আহমেদিনেজাদকে গোয়েন্দা সম্পদ বা ‘এজেন্ট’ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিল, যাতে সময় ও সুযোগ বুঝে তাকে ইরানের নতুন নেতা হিসেবে ক্ষমতায় বসানো যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আহমেদিনেজাদকে কেন্দ্র করে ইসরাইলের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের এই পরিকল্পনা ছিল অবিশ্বাস্য। কারণ, নিজের শাসনামলে তিনিই ইরানের পরমাণু কর্মসূচির গতি বাড়িয়েছিলেন, নিয়মিত ইসরাইলকে ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছিলেন এবং ইহুদি নিধনযজ্ঞ বা ‘হলোকোস্ট’ অস্বীকার করেছিলেন।

আমেরিকান কর্মকর্তাদের দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গোপনে আহমেদিনেজাদের আবাসন ও বিদেশ ভ্রমণের খরচ দিয়েছে ইসরাইল। বুদাপেস্ট সফরসহ কয়েকটি বিদেশ সফরে ইসরাইলি এজেন্টরা তার সঙ্গে বৈঠকও করেছিলেন। এই গোপন প্রচেষ্টা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে, যখন ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। তেহরানে কঠোর নজরদারিতে থাকা আহমেদিনেজাদকে সেখান থেকে সরিয়ে নিতে একটি দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালিত হয়।

বর্তমান সরকারকে উৎখাত করে আহমেদিনেজাদকে ক্ষমতায় বসানোর পরিকল্পনা কার্যকর করাই ছিল ওই অভিযানের মূল লক্ষ্য। তবে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি ভেস্তে যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি আহমেদিনেজাদের বাসভবনে হামলা চালায় ইসরাইলি বিমান। ওই হামলার লক্ষ্য ছিল তার দেহরক্ষীদের ভবন ও সাঁজোয়া গাড়ি। ইরানের চারজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, হামলার পরপরই একটি কালো পিউজো গাড়ি এসে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্য থেকে আহমেদিনেজাদকে দ্রুত সরিয়ে নেয়।

অভিযানের বিষয়ে অবগত আমেরিকান ও ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, গাড়িটি চালাচ্ছিলেন মোসাদের এজেন্টরা। তারা আহমেদিনেজাদকে ইরানের ভেতরেই একটি নিরাপদ আশ্রয় বা ‘সেফ হাউসে’ নিয়ে যান। তবে ঘটনার বিষয়ে অবগত ব্যক্তিরা বলেছেন, আকস্মিক ও হুলস্থুল উদ্ধার অভিযান নিয়ে আহমেদিনেজাদ বেশ বিরক্ত হয়েছিলেন। ইসরাইলের সহায়তায় পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পরিকল্পনা নিয়েও তার মোহভঙ্গ ঘটে।

পরে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে তিনি ওই সেফ হাউস ছেড়ে চলে যান। এরপর গত সোমবারের আগ পর্যন্ত তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। সোমবার ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় অল্প সময়ের জন্য তাকে দেখা যায়।

তেহরানের সরকার উৎখাতের এই পরিকল্পনা নিয়ে ইসরাইলি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।

পরিকল্পনার আরেকটি অংশ ছিল উত্তর ইরাকে অবস্থানরত ইরানি কুর্দি-বিরোধী বাহিনীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়া। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তারা পশ্চিম ইরানে প্রবেশ করে এলাকা দখল এবং পরে রাজধানী তেহরানের দিকে অগ্রসর হতো। তবে সেই প্রচেষ্টা কখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে আহমেদিনেজাদের ভূমিকার বিষয়টি প্রথম প্রকাশের পর গত মে মাসে পিবিএসের টক শো ‘ফায়ারিং লাইন’-এ ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান তামির হ্যাইম্যান বলেছিলেন, সরকার পরিবর্তনের ওই পরিকল্পনায় বেশ কিছু অনন্য বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়েছিল এবং আহমেদিনেজাদ সেই প্রক্রিয়ার অংশ ছিলেন।

২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আহমেদিনেজাদ। সে সময় তিনি দেশটির অন্যতম কট্টরপন্থি রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ইসরাইলকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার কথা বলতেন। তার শাসনামলেই ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুনরায় শুরু করে, যা দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সন্দেহ বাড়িয়েছিল।

২০০৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার পুনর্নির্বাচনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গড়ে ওঠা আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করা হয়। তার শাসনামলে ভিন্নমতাবলম্বী ও বিরোধীদের গণফাঁসি এবং বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছাড়ার পরবর্তী বছরগুলোতে নিজের কট্টর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলেন আহমেদিনেজাদ। তিনি ইসরাইলবিরোধী বক্তব্য দেওয়াও বন্ধ করেন এবং নিজেকে উদারপন্থি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু করেন।

বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি ইরানের পপসংগীত সংস্কৃতির প্রশংসা করেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়নের সমালোচনা করেন এবং শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। একপর্যায়ে নিজের চিরচেনা ঢিলেঢালা খাকি উইন্ডব্রেকার পোশাক ছেড়ে দর্জির তৈরি আধুনিক স্যুট পরা শুরু করেন আহমেদিনেজাদ। অগোছালো দাড়ি ছেঁটে পরিপাটি হন, বোটক্স চিকিৎসা নেন এবং ইংরেজি শেখা শুরু করেন।

তেহরানে নিজের কার্যালয়ে প্রতিদিন সকালে সাধারণ মানুষের অভিযোগ শোনার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৈঠক করতেন তিনি। সরকারি ঋণের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সুপারিশপত্রও লিখতেন। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে শহর ও গ্রামের সমর্থকদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করতেন।

ইরান সরকারের সঙ্গে আহমেদিনেজাদের সম্পর্ক ছিল জটিল। শীর্ষ নেতারা তার ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করলেও সর্বোচ্চ নেতাকে পরামর্শ দেওয়া উচ্চপর্যায়ের কাউন্সিলে তাকে একটি আসন দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে, ফেব্রুয়ারিতেও তিনি কাউন্সিলের একটি বৈঠকে অংশ নেন।

ইরানের অনেকেই আহমেদিনেজাদের পরিবর্তনকে রাজনৈতিক চাতুর্য হিসেবে দেখতেন। তাদের ধারণা ছিল, জনপ্রিয় ভাবমূর্তি ধরে রাখতেই তিনি নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেছিলেন। তবে শ্রমজীবী ইরানিদের মধ্যে তার বড় একটি সমর্থকগোষ্ঠী ছিল। তার উপদেষ্টারাও নিশ্চিত ছিলেন, সাবেক এই প্রেসিডেন্ট আবার ক্ষমতায় ফিরতে চান।

আহমেদিনেজাদের সাবেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আবদুররেজা দাভারি টেলিফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আহমেদিনেজাদ অর্থের জন্য এমন কাজ করবেন না। তার অর্থ ও বড় অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক আছে। তিনি এটি ক্ষমতার জন্য করবেন। তিনি ক্ষমতার শীর্ষে বসতে চান।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আহমেদিনেজাদের ঘনিষ্ঠ সার্কেলের একজন সহযোগী বলেছেন, বিদেশি শক্তির সহায়তায় ইরানের ভবিষ্যৎ নেতা হওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা তিনি কয়েকজন অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযোগীকে জানিয়েছিলেন।

তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পর অযোগ্য ঘোষিত হওয়ায় আহমেদিনেজাদ ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বর্তমান ব্যবস্থা বহাল থাকলে তার পক্ষে আর ক্ষমতায় ফেরা সম্ভব হবে না।

ওই সহযোগী বলেন, আহমেদিনেজাদ উদ্বিগ্ন ছিলেন যে, যুদ্ধ কিংবা সরকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আমেরিকা ও ইসরাইল হয়তো ইরানের বাইরে থাকা কোনো বিরোধী নেতাকে বেছে নেবে, যিনি দেশ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। এতে ইরান অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে বলে তিনি মনে করতেন।

আহমেদিনেজাদ নিজেকে রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের মতো একজন সংস্কারক হিসেবে দেখতেন। তিনি বলতেন, ক্ষমতায় ফিরলে ইরান ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেবে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের’ অংশ হিসেবে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে।

ইসরাইলের দুজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেছেন, ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আহমেদিনেজাদের সঙ্গে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর দূরত্ব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। বিশেষ করে আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতি আহমেদিনেজাদের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ ইসরাইলের নজর কেড়েছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইআরজিসির গোয়েন্দা শাখা আল-কুদস ফোর্স বিদেশি হস্তক্ষেপ থেকে দেশকে রক্ষার দায়িত্ব পালন করে। সংস্থাটি ২০১৭ সাল থেকেই আহমেদিনেজাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করেছিল। আইআরজিসির দুই সদস্য ও একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন, ২০১৭ সালে আহমেদিনেজাদ যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পরে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে প্রকাশ্যে চিঠি পাঠাতে শুরু করেন, তখন সেই সন্দেহ আরও বেড়ে যায়।

চলতি বছর ইসরাইলি হামলার পর আইআরজিসির নজরদারি থেকে প্রথমবারের মতো মুক্ত হন আহমেদিনেজাদ। পরে ইরানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তদন্ত শুরু করে এবং ইসরাইলের সঙ্গে তার যোগাযোগের সূত্র উদঘাটন করে। ইসরাইলি এজেন্টরা ঠিক কবে প্রথম আহমেদিনেজাদকে নিজেদের দলে টানার চেষ্টা করেছিল, তা স্পষ্ট নয়। তবে ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, ২০২৩ সালে পরিবেশবিষয়ক একটি সম্মেলনে অংশ নিতে গুয়াতেমালা সফরে গিয়ে ইসরাইলি এজেন্টদের সঙ্গে তার প্রথম যোগাযোগ হয়।

গুয়াতেমালা সরকারের পক্ষ থেকে আহমেদিনেজাদকে ওই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। দেশটির সঙ্গে ইসরাইলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তেহরান বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বাহিনী তাকে বোর্ডিং পাস দিতে অস্বীকৃতি জানালে সফরটি প্রায় বাতিল হয়ে যায়। এর প্রতিবাদে তিনি বিমানবন্দরেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন।

সাধারণ যাত্রী ও বিমানবন্দর কর্মীদের সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের মাধ্যমে ঘটনাটিকে জনসম্পৃক্ত নাটকে পরিণত করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ইরানি কর্তৃপক্ষ তাকে সফরের অনুমতি দেয়।

পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে প্রথমবার হাঙ্গেরি সফর করেন আহমেদিনেজাদ। লুদোভিকা ইউনিভার্সিটির সম্মেলনে যোগ দিয়ে বুদাপেস্টে মোসাদপ্রধান ডেভিড বার্নিয়ার সঙ্গে তিনি দেখা করেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

ভিক্টর অরবানের নেতৃত্বাধীন হাঙ্গেরির সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক ইউরোপের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় ঘনিষ্ঠ ছিল। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও লুদোভিকা ইউনিভার্সিটিতে ভাষণ দেন এবং একটি সম্মাননা গ্রহণ করেন।

সফরের একটি ভিডিওতে আহমেদিনেজাদ বলেন, ‘কিছু মানুষ আমাকে গুয়াতেমালায় ভ্রমণ করতে নিষেধ করেছিলেন। আমি তাদের বলেছিলাম, আমার ভাই, যিনি পরিবেশমন্ত্রী, তিনি আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এটি লাতিন আমেরিকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশ।’

এর দুই মাস পর, ২০২৫ সালের জুনে ইরানে ইসরাইল যুদ্ধ শুরু করার কয়েক দিন আগে আহমেদিনেজাদ আবার বুদাপেস্টে যান। প্রতিবেদনে বলা হয়, সফরটি ছিল ইসরাইলি গোয়েন্দাদের সঙ্গে তার গোপন বৈঠকের একটি ছদ্মবরণ।

বিদেশ সফরে তার সঙ্গে থাকা আইআরজিসির আনসার ইউনিটের দেহরক্ষীরা বলেছেন, সফরের সময় অন্তত দুইবার তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য নিখোঁজ ছিলেন আহমেদিনেজাদ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলনে আহমেদিনেজাদ ইংরেজিতে বক্তব্য দেন। একই সঙ্গে নিজের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী বক্তব্যের শুরুতে কুরআনের আয়াত পাঠ না করে উপস্থিত সবাইকে অবাক করেন।

নীল রঙের স্যুট পরা আহমেদিনেজাদ সেদিন ‘মানবিকতা’ ও ‘পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থা’ নিয়ে কথা বলেন। একটি নতুন বিশ্ব কীভাবে গড়ে উঠতে পারে, সে বিষয়েও নিজের মতামত তুলে ধরেন।

পরে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর অধ্যাপক ডেলির হাতে ইরানের প্রাচীন কবি ফেরদৌসীর বিখ্যাত ‘শাহনামা’ গ্রন্থটি তুলে দেন। ডেলিও তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রতীক উপহার দেন।

গত মাসে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ডেলি বলেন, আহমেদিনেজাদকে আমন্ত্রণ জানানোর ক্ষেত্রে তাকে মূলত একজন ‘পুতুল’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে তেহরানের বাড়ি থেকে কালো পিউজো গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়ার পর গত সপ্তাহ পর্যন্ত আহমেদিনেজাদকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।

সোমবার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় তার আকস্মিক উপস্থিতি সবাইকে অবাক করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তীব্র গরমের মধ্যেও তিনি ভারী জ্যাকেট ও সার্জিক্যাল মাস্ক পরে জানাজায় অংশ নেন।

সেখানে আহমেদিনেজাদ মাথা নিচু করে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার চারপাশে ছিল কঠোর নিরাপত্তাবলয়।

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ