spot_img
spot_imgspot_img

নারীদের বিষয়ে আফগান নীতি পশ্চিমা মানদণ্ডে বিচার নয় : মাওলানা মুত্তাকী

নারীদের বিষয়ে আফগান সরকারের নীতিকে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের মানদণ্ডে বিচার না করার আহ্বান জানিয়েছেন ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাওলানা আমির খান মুত্তাকী। একই সঙ্গে আফগানিস্তানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাকে অন্যায় উল্লেখ করে আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্বাভাবিক ও শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তোলার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন তিনি।

সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নারী শিক্ষা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, বৈদেশিক সম্পর্ক ও আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন মাওলানা আমির খান মুত্তাকী।

নারী ও মেয়েদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণের বিষয়ে আফগান সরকারের নীতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মুত্তাকী বলেন, আফগানিস্তানের নিজস্ব সংস্কৃতি, সামাজিক বাস্তবতা ও মূল্যবোধ বিবেচনা না করে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এসব বিষয় মূল্যায়ন করা উচিত নয়।

তিনি বলেন, “নারীদের সঙ্গে আচরণের বিষয়টি পশ্চিমা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের চশমা দিয়ে দেখা উচিত নয়। আফগান মূল্যবোধকে বিবেচনায় নিতে হবে।”

মুত্তাকী জানান, বর্তমানে আফগানিস্তানের স্কুল ও মাদরাসায় ৩০ লাখের বেশি মেয়ে পড়াশোনা করছে। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত মেয়েদের আধুনিক বিষয়ও পড়ানো হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত ৩০ লাখের বেশি মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে এবং তাদের শিক্ষাদানে নারী শিক্ষকরাও যুক্ত রয়েছেন।

মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের শিক্ষা দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে ভবিষ্যতে নারী শিক্ষক ও চিকিৎসকের ঘাটতি দেখা দিতে পারে বলে বিদেশি কূটনীতিক ও বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, সে বিষয়েও কথা বলেন আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

মুত্তাকী বলেন, “এটি সত্যিই একটি সমস্যা। বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।”

তবে বর্তমানে আফগানিস্তানে নারী শিক্ষক ও চিকিৎসকের ঘাটতি নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতেও যেন এমন সংকট তৈরি না হয়, সে বিষয়ে আফগান কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

আফগানিস্তানের ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কঠোর সমালোচনা করেন মাওলানা আমির খান মুত্তাকী। এসব নিষেধাজ্ঞার যৌক্তিক ভিত্তি নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি।

মুত্তাকী বলেন, “এটি আফগানদের প্রতি অন্যায়। এটি একটি অজুহাত। আফগানিস্তানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পেছনে যৌক্তিক কোনো কারণ নেই।”

তিনি বলেন, আফগানিস্তান প্রায় ৪০ বছর ধরে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছে। বিশেষ করে আমেরিকা ও ন্যাটোর নেতৃত্বাধীন ২০ বছরের যুদ্ধের তুলনায় বর্তমানে দেশটির পরিস্থিতি অনেক ভালো।

নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি এবং পপি চাষ নির্মূলের বিষয়ও তুলে ধরেন আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার মতে, আফগানিস্তানে ঘটে যাওয়া এসব ইতিবাচক পরিবর্তনেরও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া উচিত।

আফগানিস্তানে আল-কায়েদা বা অন্য কোনো বিদেশি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে বলে যে অভিযোগ করা হয়, তা প্রত্যাখ্যান করেন মুত্তাকী।

তিনি বলেন, আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে কোনো গোষ্ঠীকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা করতে দেওয়া হবে না।

বিদেশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি নিয়ে প্রচারিত অভিযোগের বিষয়ে মুত্তাকী বলেন, “এখন পর্যন্ত কেউ কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি।”

বৈদেশিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইমারাতে ইসলামিয়া পূর্ব ও পশ্চিম উভয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে চায়।

মুত্তাকী বলেন, “আঞ্চলিক ও পূর্বাঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনীতি, রাজনীতি, পারস্পরিক সম্পর্ক ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের সম্পর্ক অনেক এগিয়েছে।”

ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গেও আফগানিস্তানের যোগাযোগ ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে বলে জানান তিনি।

বেলজিয়ামে আফগান অভিবাসীদের নিয়ে সাম্প্রতিক কারিগরি আলোচনাকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন মাওলানা আমির খান মুত্তাকী। এ ধরনের যোগাযোগ ভবিষ্যতে আরও ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

আফগান সরকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেন মুত্তাকী। রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইমারাতে ইসলামিয়াকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়াকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইমারাতে ইসলামিয়া ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইতিবাচক ও স্বাভাবিক সম্পর্ক চায়। তবে আফগানিস্তানে কোনো বিদেশি সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি গ্রহণ করা হবে না।

তিনি বলেন, আফগানিস্তান একটি উন্নয়নশীল দেশ এবং বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। তবে আমেরিকান বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে আফগানিস্তানে কতটা আগ্রহী, সে বিষয়ে সরকারের কাছে স্পষ্ট তথ্য নেই।

দেশে বিপুলসংখ্যক আফগানের প্রত্যাবর্তনের বিষয়েও কথা বলেন মুত্তাকী। তিনি জানান, প্রায় ৬০ লাখ আফগানের প্রত্যাবর্তন দেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। তবে ফিরে আসা ব্যক্তিদের নিজ নিজ এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

মুত্তাকী বলেন, দেশে ফেরা অনেক আফগান দক্ষ কর্মী। তারা ইতোমধ্যে দেশের উন্নয়ন ও পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে শুরু করেছেন।

আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইমারাতে ইসলামিয়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করতে চায় এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পৃক্ততা বজায় রাখতে আগ্রহী।

সূত্র : বিবিসি

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ