spot_img
spot_img

ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে রায়ে বাধ্য করায় আমেরিকায় ৯ অ্যাটর্নির পদত্যাগ

বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক ইসরাইল বিরোধী তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলা ফিলিস্তিনপন্থীদের বিরুদ্ধে রায়ে বাধ্য করার প্রতিবাদে আমেরিকায় ৯ অ্যাটর্নি পদত্যাগ করেছেন।

সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) মিডল ইস্ট মনিটরের এক প্রতিবেদনে একথা জানানো হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে ইহুদি শিক্ষার্থী ও কর্মীদের নাগরিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে মর্মে আইনি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আইনজীবীদের চাপ প্রয়োগ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।

লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের এক তদন্ত প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে আসে।

এতে আরো বলা হয়, কয়েক মাস পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গড়ে উঠা ইসরাইল বিরোধী তুমুল আন্দোলন দমাতে ইহুদি বিদ্বেষের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে ট্রাম্প প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে প্রশাসনের কথায় বাধ্য করতে ‘ইহুদি শিক্ষার্থী ও কর্মীদের নাগরিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে’ মর্মে আইনি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতেও চাপ প্রয়োগ করা হয় অ্যাটর্নি বা আইনজীবীদের। যার প্রতিবাদে পরবর্তীতে ৯জন অ্যাটর্নি পদত্যাগ করেন।

লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের তদন্তটিতে বিশেষত, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া)-তে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনকে লক্ষ্য করে চালানো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন রাজনৈতিক ও আইনি বলপ্রয়োগের বিষয়টি উঠে আসে।

দ্য টাইমস-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিচার বিভাগ এর সাবেক ওই ৯ জন অ্যাটর্নি জানান, তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই তাদের ইউসি (ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া) ক্যাম্পাসগুলোর বিরুদ্ধে মামলা প্রস্তুত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। একজন আইনজীবী এই প্রক্রিয়াকে “প্রতারণামূলক ও ভুয়া তদন্ত” বলে অভিহিত করেন।

ইউসিএলএ (ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া লস অ্যাঞ্জেলেস)-তে কথিত ইহুদিবিরোধী আচরণের তদন্তের দায়িত্বে থাকা সাবেক সিনিয়র ট্রায়াল অ্যাটর্নি এজাজ বালুচ বলেন,
“শুরুতেই আমাদের বলা হয়েছিল, মাত্র ৩০ দিনের মধ্যেই ইউসি (ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া)-র বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য কোনো একটি আইনি কারণ দাঁড় করাতে হবে। এতে স্পষ্ট হয়, এই উদ্যোগ কতটা গুরুত্বহীন ছিল। মূলত কী ঘটেছে তা জানার কোনো চেষ্টাই এতে ছিল না।”

তদন্ত প্রতিবেদন অনুসারে, ৯ জন আইনজীবীই ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে পদত্যাগ করেন। তাদের কেউ কেউ বলেন, তাদের এমন কাজ করতে বলা হচ্ছিল যা নৈতিক ও আইনি মানদণ্ড লঙ্ঘন করতে পারে। আর বাকিরা সতর্ক করে বলেছিলেন, রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্তদের আদর্শিক লক্ষ্য পূরণে পুরো প্রক্রিয়াটি হাইজ্যাক করা হয়েছিল।

এই তদন্তের সময়ই গাজ্জায় ইসরাইল পরিচালিত গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ইউসি-র একাধিক ক্যাম্পাসে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ হয়। যে গণহত্যায় এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

কিছু ইহুদি শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, তারা শত্রুতামূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। এজন্য তারা আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও দায়ের করে। তবে একই সঙ্গে বহু ইহুদি শিক্ষার্থী ইসরাইল পরিচালিত গণহত্যার বিরোধিতা করে গড়ে ওঠা ক্যাম্পাস এনক্যাম্পমেন্টগুলোর সংগঠক ছিলেন। তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলার পেছনে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছে।

এছাড়া ২০২৪ সালে ইউসিএলএ-র একদল ইহুদি শিক্ষার্থীর দায়ের করা একটি ফেডারেল মামলায় অভিযোগ করা হয় যে, বিশ্ববিদ্যালয়টি তাদের ইহুদিবিরোধী শত্রুতামূলক পরিবেশ থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। পরবর্তীতে ইউসি ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ৬.৪৫ মিলিয়ন ডলারে মামলাটি নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয়। পাশাপাশি ইসরাইল বিরোধী প্রতিবাদ সীমিত করার ও বিশ্ববিদ্যালয় নীতিমালা সংস্কারেও সম্মত হয়।

পদত্যাগ করা সাবেক আইনজীবীদের মতে, এই মামলায় উগ্রবাদী গণমাধ্যমের পক্ষপাতিত্বমূলক প্রতিবেদনগুলোই বিচার বিভাগের তদন্তের ভিত্তি হয়ে উঠে।

তবে ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস বা আদালতের কর্মীরা বলেন, শুরু থেকেই পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল সাজানো। কয়েকজন জানান, প্রমাণ সংগ্রহের আগেই তাদের ইউসি-র বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য একটি ‘যুক্তি-সমর্থন স্মারক’ লিখতে বাধ্য করা হয়। অপর একজন বলেন, তাকে অন্যান্য বৈষম্য সংক্রান্ত তদন্ত থেকে সরিয়ে কেবল ইউসি-র ওপর কাজ করতে দেওয়া হয়।

আরেক আইনজীবী বলেন, “আমাদের অনেকের কাছেই স্পষ্ট ছিল যে, এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলপ্রয়োগ। যা শেষ পর্যন্ত কারও উপকার করবে না। মনে হচ্ছিল, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ইউসিএলএ ছিল সেই কেন্দ্র যাকে ট্রাম্প প্রশাসন টার্গেট করতে চেয়েছিল, যেমন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে হার্ভার্ডকে করা হয়েছিল। প্রতিবাদকারীদের সামলানো নিয়ে হার্ভার্ডও ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের মুখে পড়েছিল।”

এছাড়া ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হারমিত ধিল্লন ইউসিএলএ-কে ফেডারেল নাগরিক অধিকার আইন লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছিল, ইহুদি শিক্ষার্থী ও কর্মীদের লক্ষ্য করে ক্যাম্পাসে যে শত্রুতামূলক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিশ্ববিদ্যালয় ব্যর্থ হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন ইউসি-র কাছে ১.২ বিলিয়ন ডলার জরিমানাও দাবি করে। দাবি তুলে ব্যাপক নীতিগত পরিবর্তনের।

গত মাসে এক ফেডারেল বিচারক রায় দেন যে ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিসের এর প্রস্তাবিত সমঝোতা ছিল জবরদস্তি ও প্রতিশোধমূলক।এজন্য সম্ভবত প্রথম সংশোধনীও লঙ্ঘন করা হয়েছে। পরবর্তীতে বিচারক জরিমানা ও নীতিগত পরিবর্তনের বিষয়টি স্থগিত করে দেয়, যদিও প্রশাসন ও ইউসি-র মধ্যে গোপনে আলোচনা চলমান থাকে।

সাবেক ডেপুটি চিফ ‘জেন সুইডিশ’ এই তদন্তকে “মসব দিক থেকেই অস্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্তরাই কার্যত তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই এর ফলাফল নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন।”

ডেনা রবিনসন নামের আরেক আইনজীবী যিনি নিজেও ইহুদি সতর্ক করে বলেন,
“আমি গভীরভাবে সন্দিহান যে, এই প্রশাসন সত্যিই ইহুদি লোকজন বা ইহুদিবিরোধিতাকে (এন্টিসেমিটিজম) নিয়ে আন্তরিকভাবে চিন্তিত।”

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ