হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানবীর চিন্তা মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। মাওলানা থানবীর পাঠানো আলেমদের সঙ্গে বৈঠকে ধর্ম ও রাজনীতিকে পৃথক রাখার পক্ষে মত দিলেও তাঁদের যুক্তি শোনার পর জিন্নাহর বক্তব্যে পরিবর্তন আসে। পরদিন পাটনা অধিবেশনে তিনি ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরেন। পরবর্তী সময়ে দিল্লির আরেক বৈঠকে জিন্নাহ বলেন, ‘আমি এখন ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি, ইসলামে রাজনীতি ধর্ম থেকে পৃথক নয়; বরং ধর্মের অধীন।’
জিন্নাহর সঙ্গে আলেমদের এসব আলোচনার বিবরণ পাওয়া যায় মাওলানা জাফর আহমদ ওসমানীর স্মৃতিচারণ এবং মাওলানা শব্বীর আলী থানবীর ‘রুয়েদাদ’-এ।
মাওলানা থানবী মুসলিম লীগের প্রতি সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি দলটির নেতৃত্বকে ইসলামী অনুশাসনের প্রতি যত্নশীল করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি চাইতেন, মুসলমানদের রাজনৈতিক নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করুন এবং ইসলামী বিধিবিধান মেনে চলুন।
এ উদ্দেশ্যে জিন্নাহসহ মুসলিম লীগের নেতাদের কাছে চিঠি পাঠানোর পাশাপাশি ধর্মীয় পরামর্শ দেওয়ার জন্য আলেমদের প্রতিনিধিদল পাঠান তিনি।
এই উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস মাওলানা জাফর আহমদ ওসমানী। তিনি মাওলানা থানবীর ঘনিষ্ঠ শাগরেদ এবং মুসলিম লীগের বিষয়ে তাঁর অন্যতম পরামর্শদাতা ছিলেন।
মাওলানা থানবীর ভাতিজা ও ঘনিষ্ঠ শাগরেদ মাওলানা শব্বীর আলী থানবীও এই উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। জিন্নাহর সঙ্গে সরাসরি আলোচনা এবং তাঁর কাছে মাওলানা থানবীর ধর্মীয় পরামর্শ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
পাটনার বৈঠকে ধর্ম ও রাজনীতি নিয়ে আলোচনা
১৯৩৮ সালের ২৬ থেকে ২৯ ডিসেম্বর পাটনায় মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। অধিবেশনের আগে মাওলানা থানবীর পাঠানো আলেমদের একটি প্রতিনিধিদল জিন্নাহর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্যোগ নেয়।
অধ্যাপক আহমদ সাঈদের ‘মাওলানা আশরাফ আলী সাহেব থানবী আওর তাহরিকে আজাদি’ গ্রন্থের ১৩০ নম্বর পৃষ্ঠায় মাওলানা জাফর আহমদ ওসমানীর স্মৃতিচারণ উদ্ধৃত হয়েছে।
সেখানে তিনি জানান, পাটনায় পৌঁছে মাওলানা শব্বীর আলী থানবী বলেন, মুসলিম লীগের আদর্শিক অবস্থান সম্পর্কে জিন্নাহর সঙ্গে সরাসরি আলোচনা না করে তাঁরা অধিবেশনে অংশ নেবেন না।
পরে লিয়াকত আলী খান সেদিন সন্ধ্যায় জিন্নাহর সঙ্গে আলেমদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন।
বৈঠকে আলেমরা জিন্নাহকে বোঝান, মুসলমানরা একটি ধর্মীয় জাতি। তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও পরিচয়কে রাজনীতি থেকে পৃথক রাখলে মুসলিম লীগ সাধারণ মুসলমানের হৃদয় জয় করতে পারবে না।
তাঁরা মাওলানা মুহাম্মাদ আলী জওহর ও মাওলানা শওকত আলীর রাজনৈতিক আন্দোলনের উদাহরণ তুলে ধরেন। আলেমদের বক্তব্য ছিল, রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়ার ফলে আলী ভ্রাতৃদ্বয়ের আন্দোলন মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিল। মুসলিম লীগের রাজনীতিতেও ইসলামের গুরুত্ব তুলে ধরতে জিন্নাহকে পরামর্শ দেন তাঁরা।
মাওলানা জাফর আহমদ ওসমানীর বর্ণনায়, আলোচনার শুরুতে জিন্নাহ ধর্ম ও রাজনীতিকে পৃথক রাখার পক্ষে মত প্রকাশ করেন।
জবাবে আলেমরা তাঁকে বোঝান, ধর্ম ও রাজনীতিকে এভাবে পৃথক করার ধারণা ইউরোপীয় রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। ইসলামের ইতিহাসে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে এমন বিচ্ছিন্নতা ছিল না।
নিজেদের যুক্তি ব্যাখ্যা করতে তাঁরা তুরস্কে মোস্তফা কামালের খিলাফত বিলুপ্তির উদাহরণ তুলে ধরেন। খিলাফত বিলুপ্তি ও পরবর্তী সংস্কারের ফলে তুরস্কের ক্ষমতা ও মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তাঁরা যুক্তি দেন।
বৈঠকের পর জিন্নাহর ভাষণে মাওলানা থানবীর চিন্তার প্রতিফলন
মাওলানা জাফর আহমদ ওসমানী জানান, আলেমদের এসব যুক্তি জিন্নাহর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। পরদিন পাটনা অধিবেশনে তিনি ইসলামকে শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরেন।
জিন্নাহর সেই ভাষণের পর দিল্লি থেকে প্রকাশিত ‘আল আমান’ পত্রিকার সম্পাদক মাওলানা মাযহারুদ্দীন প্রথম পাতায় একটি সংবাদ প্রকাশ করেন।
সংবাদটির শিরোনামের বাংলা অর্থ ছিল, ‘জিন্নাহর ভাষণে হাকীমুল উম্মত থানবীর চিন্তার প্রভাব’।
মাওলানা জাফর আহমদ ওসমানীর স্মৃতিচারণে পাটনার বৈঠকে আলেমদের আলোচনা এবং পরদিন জিন্নাহর ভাষণে তার প্রতিফলনের বিষয়টি এভাবেই উঠে এসেছে।
জিন্নাহর জামাতে নামাজ আদায়
বৈঠকে আলেমরা জিন্নাহকে নিয়মিত নামাজ আদায়ের পরামর্শও দেন। তাঁরা পরদিন সবাইকে নিয়ে জামাতে নামাজ আদায়ের প্রস্তাব করেন।
এ সময় জিন্নাহ আশঙ্কা প্রকাশ করেন, জামাতে নামাজের ইমাম কে হবেন, তা নিয়ে দেওবন্দি, সুন্নি ও শিয়াদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিতে পারে। মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টায় এমন বিরোধ সৃষ্টি হোক, তা তিনি চাননি।
আলেমরা তাঁকে আশ্বস্ত করেন, তিনি যাঁর পেছনে নামাজে দাঁড়াবেন, অন্যরাও তাঁর পেছনে দাঁড়াবেন।
মাওলানা জাফর আহমদ ওসমানী তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন, পরদিন বেলা একটায় মুসলিম লীগের অধিবেশন নামাজের জন্য স্থগিত করা হয়। স্থানীয় কাজি ইমামতি করেন। জিন্নাহ তাঁর পেছনে দাঁড়ালে সমবেত লোকজনও জামাতে নামাজ আদায় করেন।
দিল্লির বৈঠকে জিন্নাহর নিজের বক্তব্য
পাটনার পরও মাওলানা থানবীর পক্ষ থেকে জিন্নাহর সঙ্গে ধর্মীয় যোগাযোগ অব্যাহত থাকে।
১৯৩৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে আলেমদের আরেকটি প্রতিনিধিদল জিন্নাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। প্রতিনিধিদলে মাওলানা জাফর আহমদ ওসমানী, মুফতী মুহাম্মাদ শফী ও মাওলানা শব্বীর আলী থানবীসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এই বৈঠকেও ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
মাওলানা শব্বীর আলী থানবীর ‘রুয়েদাদ’-এর সপ্তম পৃষ্ঠায় জিন্নাহর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
আলোচনার পর জিন্নাহ বলেন, ‘এখন আমি বুঝতে পেরেছি, ইসলামে রাজনীতি ধর্ম থেকে পৃথক নয়; বরং ধর্মের অধীন।’
দিল্লির বৈঠকে জিন্নাহর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ধর্ম ও রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি সরাসরি প্রকাশ পায়।
মাওলানা থানবীর ধর্মীয় পরামর্শে জিন্নাহর আস্থা
দিল্লির বৈঠকের পরও মাওলানা শব্বীর আলী থানবীর সঙ্গে জিন্নাহর সাক্ষাৎ ও আলোচনা চলতে থাকে।
মাওলানা শব্বীর আলী থানবীর ‘রুয়েদাদ’-এ জিন্নাহর সঙ্গে পরবর্তী সাক্ষাতেরও বিবরণ রয়েছে।
এক সাক্ষাতে জিন্নাহ জানান, অনেক আলেম তাঁর কাছে এসে সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করেন। অথচ রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। অন্যদিকে ধর্মীয় বিষয়ে তাঁর জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে।
মাওলানা থানবী তাঁকে রাজনৈতিক পরামর্শ দেওয়ার পরিবর্তে ধর্মীয় বিষয় বোঝানোর জন্য প্রতিনিধি পাঠান। মাওলানা শব্বীর আলী থানবীর মাধ্যমে তিনি এমন ধর্মীয় বিষয় জানতে পারছেন, যা অন্যদের কাছ থেকে জানার সুযোগ হয়নি।
জিন্নাহ আরও আলোচনা শোনার আগ্রহ প্রকাশ করেন। মাওলানা শব্বীর আলী থানবীর আরও কিছু বলার থাকলে তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনবেন বলেও জানান।
‘রুয়েদাদ’-এর দশম পৃষ্ঠায় আরেকটি সাক্ষাতের বিবরণ রয়েছে। সেখানে ধর্মীয় বিষয়ে মাওলানা থানবীর প্রতি নিজের আস্থা প্রকাশ করে জিন্নাহ জানান, আগে তিনি বিষয়গুলো বোঝার জন্য প্রশ্ন করতেন। কিন্তু এখন থেকে মাওলানা শব্বীর আলী থানবী ধর্মীয় বিষয়ে যে নির্দেশনা দেবেন, তা গ্রহণ করতে তিনি প্রস্তুত। কারণ, মাওলানা থানবীর ধর্মীয় জ্ঞান ও বিচার-বিবেচনার ওপর তাঁর পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
জিন্নাহর এসব বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, মাওলানা থানবীর পাঠানো আলেমদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ধর্মীয় বিষয়ে তাঁদের পরামর্শ গ্রহণ করতেও তিনি আগ্রহী ছিলেন।
মাওলানা শব্বীর আহমদ ওসমানীর ভূমিকা
মাওলানা থানবীর এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শাইখুল ইসলাম মাওলানা শব্বীর আহমদ ওসমানী। তিনি দারুল উলূম দেওবন্দের সাবেক সদর মুহতামিম ও প্রখ্যাত মুহাদ্দিস।
১৯৩৮ সালে বোম্বেতে মুসলিম লীগের একটি অধিবেশনে তাঁর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিলেন মাওলানা থানবী। কিন্তু মায়ের অসুস্থতার কারণে সেই সফর বাতিল হয়।
পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের দাবির পক্ষে ওলামাদের সংগঠিত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন মাওলানা শব্বীর আহমদ ওসমানী। মুসলিম লীগের সমর্থনে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পাকিস্তানের পক্ষে থাকা আলেমদের পৃথকভাবে সংগঠিত করার কাজেও তিনি নেতৃত্ব দেন।
জিন্নাহর পরবর্তী রাষ্ট্রচিন্তায় ইসলামী নীতি
মাওলানা থানবীর পাঠানো আলেমদের সঙ্গে বৈঠক ও ধর্মীয় আলোচনার পরবর্তী বছরগুলোতেও জিন্নাহর রাজনৈতিক বক্তব্যে ইসলামী নীতির গুরুত্ব উঠে আসে।
১৯৪৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার জনগণের উদ্দেশে এক বেতার ভাষণে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সংবিধান সম্পর্কে বক্তব্য দেন তিনি।
জিন্নাহ বলেন, পাকিস্তানের সংবিধান তখনো প্রণীত হয়নি। তবে তাঁর বিশ্বাস, সংবিধানটি হবে গণতান্ত্রিক এবং এতে ইসলামের মৌলিক নীতিগুলো স্থান পাবে।
একই বক্তব্যে তিনি ইসলামকে গণতন্ত্র, সমতা ও ন্যায়বিচারের শিক্ষাদাতা হিসেবে তুলে ধরেন। ধর্মীয় নেতাদের শাসনাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি অমুসলিম নাগরিকদের সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথাও বলেন।
জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনে ইসলামী নীতির গুরুত্ব কেবল একটি ভাষণ বা বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তবে মাওলানা থানবীর পাঠানো আলেমদের সঙ্গে তাঁর আলোচনা, ধর্মীয় বিষয়ে তাঁদের পরামর্শ গ্রহণ এবং পরবর্তী বক্তব্যগুলোতে ইসলামের অবস্থান নিয়ে তাঁর চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়।
বিশেষ করে পাটনার বৈঠক সম্পর্কে মাওলানা জাফর আহমদ ওসমানীর স্মৃতিচারণ এবং দিল্লির বৈঠকে জিন্নাহর নিজের বক্তব্য মাওলানা থানবীর সঙ্গে তাঁর চিন্তাগত সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হয়ে রয়েছে।
সূত্র : ভেঙ্কট ধুলিপালা, ক্রিয়েটিং আ নিউ মদিনা; অধ্যাপক আহমদ সাঈদ, মাওলানা আশরাফ আলী সাহেব থানবী আওর তাহরিকে আজাদি; মাওলানা শব্বীর আলী থানবীর রুয়েদাদের উদ্ধৃত বিবরণ; জিন্নাহর ১৯৪৮ সালের ভাষণ।











