পাঁচ বছর হয়ে গেল আল্লামা হাফেজ জুনাইদ বাবুনগরী রহ. আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু পাঁচ বছরেও তাঁর রেখে যাওয়া শূন্যতা পূরণ হয়নি। সময় এগিয়েছে, দেশের রাজনীতি ও পরিস্থিতি বদলেছে, তবু বাংলাদেশের ইসলামপন্থী আন্দোলনের স্মৃতিতে তাঁর সংগ্রামী জীবন আজও অমলিন।
তাঁকে স্মরণ করলে পাশাপাশি দুটি চিত্র সামনে আসে। একদিকে হাদিসের মসনদে বসা একজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস, অন্যদিকে ইসলাম ও মুসলমানদের অধিকারের প্রশ্নে রাজপথে দাঁড়িয়ে থাকা সেই একই মানুষ। শাপলা গণহত্যা, গ্রেপ্তার, রিমান্ড, নির্যাতন ও দীর্ঘ অসুস্থতা তাঁর জীবনে গভীর ক্ষত রেখে গিয়েছিল। কিন্তু এসবের কোনোটিই তাঁকে নিজের অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি।
কারাগার থেকে ফিরে তিনি আবার হাদিসের দরস দিয়েছেন, আবার আন্দোলনের ময়দানে নেতৃত্ব দিয়েছেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত ঈমান ও আদর্শের প্রশ্নে অবিচল থেকেছেন। এই লড়াকু জীবনই তাঁকে লাখো মানুষের হৃদয়ে আলাদা জায়গা দিয়েছে।
তাই তাঁর ইন্তেকালের পাঁচ বছর পর তাঁকে ফিরে দেখা শুধু একজন প্রয়াত আলেমকে স্মরণ করা নয়। এর সঙ্গে ফিরে আসে বাংলাদেশের ইসলামপন্থী আন্দোলনের একটি দীর্ঘ সংগ্রামী অধ্যায়, যেখানে ইলম, ত্যাগ, জুলুম-নির্যাতন সহ্য করা এবং নিজের অবস্থানে অটল থাকার ইতিহাস এক মানুষের জীবনে একসঙ্গে মিলেছিল।
হাদিসের মসনদ থেকে আন্দোলনের ময়দানে
আল্লামা বাবুনগরীর প্রধান পরিচয় ছিল একজন প্রখ্যাত আলেম ও মুহাদ্দিস হিসেবে। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে হাজার হাজার শিক্ষার্থী তাঁর কাছে হাদিস পড়েছেন। বাবুনগর মাদরাসা থেকে হাটহাজারী মাদরাসা, জীবনের বড় একটি সময় তিনি ইলম, দরস, গবেষণা ও দ্বীনি শিক্ষার খেদমতে কাটিয়েছেন।
হাটহাজারী মাদরাসায় মুহাদ্দিস ও শায়খুল হাদিস হিসেবে দীর্ঘদিন হাদিসের দরস দিয়েছেন তিনি। দেশজুড়ে ছড়িয়ে আছেন তাঁর অসংখ্য ছাত্র ও শাগরেদ।
কিন্তু তাঁর জীবন শুধু কিতাব ও মাদরাসার চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
ইসলাম, আলেমসমাজ ও মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকারের প্রশ্ন সামনে এলে তাঁকে দেখা গেছে আন্দোলনের ময়দানে। কখনো সমাবেশের মঞ্চে, কখনো রাজপথে, কখনো আন্দোলনের নেতৃত্বে।
রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রক্ষার আন্দোলন, শিক্ষানীতিবিরোধী আন্দোলন, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে থেমিসের মূর্তি অপসারণের আন্দোলন, ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন ইসলামি ইস্যুতে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান নেতা।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার পর সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্বে আসেন তিনি। পরবর্তী এক দশকে হেফাজতের প্রায় প্রতিটি বড় আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে যায়। শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর ইন্তেকালের পর ২০২০ সালে তিনি হেফাজতে ইসলামের আমীর নির্বাচিত হন। ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত সেই দায়িত্বে ছিলেন।
তবে তাঁর সংগ্রামী জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় হয়ে আছে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর।
শাপলা
২০১৩ সালে ইসলামবিদ্বেষী অপতৎপরতার প্রতিবাদ এবং ১৩ দফা দাবিকে সামনে রেখে দেশজুড়ে গড়ে ওঠে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন। সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন আল্লামা বাবুনগরী।
৫ মে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক আলেম, মাদরাসার ছাত্র ও সাধারণ মানুষ রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে জড়ো হন। গভীর রাতে সেখানে গণহত্যা চালায় হাসিনা সরকার।
শাপলা গণহত্যার সেই রাত আল্লামা বাবুনগরীর জীবনেও গভীর ক্ষত রেখে যায়।
সেদিন তিনি ময়দান ছেড়ে সরে যাননি। পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলেও শেষ পর্যন্ত নেতাকর্মীদের সঙ্গে ছিলেন। শাপলার সেই রাতের পরই শুরু হয় তাঁর জীবনের আরেক কঠিন অধ্যায়।
পরদিন ৬ মে রাজধানীর লালবাগ এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৭ মে আদালত তাঁকে ৯ দিনের রিমান্ডে পাঠান। এরপর আরও কয়েকটি মামলায় নতুন করে তাঁকে রিমান্ডে নেওয়া হয়।
হাদিসের মসনদে বসা একজন প্রবীণ মুহাদ্দিসের দিন কাটতে থাকে আদালত, রিমান্ড আর কারাগারে।
রিমান্ডে আল্লামা বাবুনগরীর ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনের মাধ্যমে তাঁকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
রিমান্ডের নির্যাতন ও বন্দিত্বে তাঁর শরীর মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়ে। পরিস্থিতি একপর্যায়ে এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে, তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে বাধ্য হয় হাসিনা সরকার। সেখানে তাঁর অবস্থার আরও অবনতি হলে এবং পরিস্থিতি নিয়ে চাপ বাড়তে থাকলে তড়িঘড়ি করে তাঁর জামিনের ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয় সরকার।
কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও শাপলার ক্ষত তাঁর জীবন থেকে মুছে যায়নি। রিমান্ড, নির্যাতন ও অসুস্থতার প্রভাব দীর্ঘদিন তাঁর শরীরে ছিল। চলাফেরাতেও সেই দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু শরীর দুর্বল হলেও তাঁর অবস্থান দুর্বল হয়নি।
কারাগার ও রিমান্ড থেকে ফিরে আবার হাদিসের মসনদে বসেছেন আল্লামা বাবুনগরী। আবার দরস দিয়েছেন, মানুষের সামনে কথা বলেছেন এবং আন্দোলনের ময়দানে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
শাপলা তাঁর কাছে শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না। এর মূল্য তাঁকে নিজের শরীর দিয়েও দিতে হয়েছিল।
শাপলার পর হেফাজতের ভেতরে সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ও আন্দোলনের কৌশল নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ শুরু হয়। এক শ্রেণির নেতা সরকারের সঙ্গে আপসের পথে এগোলেও আল্লামা বাবুনগরী সেই পথে হাঁটেননি। আওয়ামী সরকারের ভূমিকা নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। শাপলা গণহত্যার স্মৃতি ভুলে যেতে দেননি।
জেল তাঁকে থামাতে পারেনি। রিমান্ড তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ করতে পারেনি। অসুস্থতাও তাঁকে আন্দোলনের ময়দান থেকে সরিয়ে রাখতে পারেনি।
কোনো শক্তি, ভয় কিংবা প্রলোভনের কাছে মাথা নত করেননি তিনি।
রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, শিক্ষানীতি, মূর্তি ও ভাস্কর্য, ইসলাম ও মুসলমানদের অধিকার এবং আলেমদের ওপর দমন-পীড়নের প্রশ্নে তাঁর কণ্ঠ বারবার উচ্চারিত হয়েছে।
এই আপসহীনতাই তাঁর লড়াকু জীবনের অন্যতম প্রধান পরিচয় হয়ে আছে।
ইনসাফ
আল্লামা বাবুনগরীর ভাবনা শুধু রাজপথের আন্দোলনে সীমাবদ্ধ ছিল না। ইসলাম, মুসলমান ও মুসলিম বিশ্বের কথা মানুষের কাছে শক্তভাবে তুলে ধরতে একটি কার্যকর সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তাও তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন।
২০১৪ সালে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ও দিকনির্দেশনা ছিল। প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে এগোবে, কোন আদর্শ ও লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করবে, শুরু থেকেই এসব বিষয়ে তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন। ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পর তিনি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ইন্তেকাল পর্যন্ত সেই দায়িত্বে ছিলেন।
তবে তাঁর ভূমিকা শুধু চেয়ারম্যানের পদে সীমাবদ্ধ ছিল না। ইনসাফের প্রতিষ্ঠা, গড়ে ওঠা ও পরবর্তী পথচলায় তিনি ছিলেন একজন অভিভাবক ও দিকনির্দেশক।
ইনসাফের প্রতি তাঁর স্নেহ ছিল, প্রত্যাশাও ছিল অনেক। ইনসাফ আরও শক্তিশালী হোক, ইসলাম ও মুসলমানদের কথা সাহসের সঙ্গে মানুষের সামনে তুলে ধরুক, সেই আকাঙ্ক্ষা তিনি বারবার প্রকাশ করেছেন।
২০১৮ সালে ইনসাফের চতুর্থ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, “ইনসাফ ইসলামী মিডিয়া জগতে একটি বিপ্লবের নাম। একটি ইনকিলাবের নাম।”
একই বক্তব্যে তিনি মুসলিম উম্মাহর জন্য বাস্তবমুখী, তথ্যনির্ভর ও শক্তিশালী মিডিয়া গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। উলামায়ে কেরামকে শ্রম, মেধা, পরামর্শ ও অর্থ দিয়ে এই ময়দানে ভূমিকা রাখার আহ্বানও জানিয়েছিলেন।
মিডিয়ার শক্তি সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি ছিল স্পষ্ট। তিনি বুঝতেন, মুসলমানদের অধিকার, সংকট ও বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হলে নিজেদের শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম প্রয়োজন। রাজপথে যেমন নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে হয়, তেমনি সংবাদ ও জনমতের ময়দানেও নিজেদের কণ্ঠ শক্তিশালী করতে হয়।
ইনসাফের ইতিহাসে তাই আল্লামা বাবুনগরী শুধু একজন চেয়ারম্যানের নাম নন। প্রতিষ্ঠানটির জন্ম ও গড়ে ওঠার সঙ্গে তাঁর অবদান জড়িয়ে আছে। ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত তাঁর দিকনির্দেশনা, স্নেহ ও অভিভাবকত্ব ইনসাফের পথচলার স্মৃতিরই অংশ।
২০২১
শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর ইন্তেকালের পর হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীরের দায়িত্ব নেন আল্লামা বাবুনগরী। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বস্তিতে সংগঠন পরিচালনার সুযোগ তিনি পাননি। তাঁকে ঘায়েল করা এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন হেফাজতকে দুর্বল করতে একের পর এক চাপ ও ষড়যন্ত্র শুরু করে হাসিনা সরকার।
এর মরণকামড় আসে ২০২১ সালে।
হাসিনা সরকারের আমন্ত্রণে গুজরাটের কশাই হিসেবে পরিচিত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে আসেন। তাঁর আগমনের প্রতিবাদে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হয়। আলেম-উলামা, মাদরাসার ছাত্র ও সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসেন।
সেই আন্দোলন দমাতে গুলি ও হত্যাকাণ্ডের পথ বেছে নেয় হাসিনা সরকার। হাটহাজারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীরা নিহত হন।
এরপর শুরু হয় দেশের আলেম-উলামা ও হেফাজত নেতাদের ওপর ইতিহাসের অন্যতম বড় ক্র্যাকডাউন।
একের পর এক শীর্ষ আলেম ও হেফাজত নেতাকে গ্রেপ্তার করা হতে থাকে। মামলা, রিমান্ড ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে দেশের বহু পরিচিত ও শীর্ষ আলেমকে কারাগারে পাঠানো হয়।
কেউ কারাগারে, কেউ রিমান্ডে। কারও বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা। বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ আলেমরাও বাদ যাননি। কারাগারের কঠিন পরিবেশে অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন অনেকে। জুলুমের শিকার আলেমদের পরিবার থেকেও আসছিল অসহায় আর্তনাদ।
এই দমন-পীড়নের পুরো চাপ এসে পড়ে আল্লামা বাবুনগরীর ওপর।
একদিকে তাঁর নেতৃত্বাধীন হেফাজতকে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা ও দেশের শীর্ষ আলেমদের একের পর এক কারাবরণ। চারদিকে মামলা, গ্রেপ্তার, রিমান্ড আর রাষ্ট্রীয় চাপ।
তাঁকে ঘায়েল করা এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন হেফাজতকে নির্মূল করে দেওয়াই ছিল এই দমন অভিযানের মূল লক্ষ্য।
কিন্তু সেই কঠিন সময়েও তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি।
কারাবন্দি আলেম-উলামাদের মুক্ত করা তাঁর অন্যতম প্রধান চিন্তায় পরিণত হয়। সরকারের কাছে বারবার তাঁদের মুক্তি দাবি করেছেন। মামলা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ আলেমদের কারাগারে রাখার প্রতিবাদ করেছেন। নিজের বয়স ও অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে তাঁদের মুক্ত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।
এই চাপ তিনি শুধু সাংগঠনিকভাবেই বহন করেননি। এর প্রভাব পড়েছিল তাঁর শরীরেও।
শাপলার রিমান্ড ও নির্যাতনের ক্ষত তখনও তাঁর শরীরে। বয়স বেড়েছে। নানা রোগে আগে থেকেই দুর্বল ছিলেন। তার ওপর সহযোদ্ধাদের গণগ্রেপ্তার, কারাগারে থাকা আলেমদের কষ্ট, তাঁদের পরিবারের আর্তনাদ এবং সংগঠনের ওপর অব্যাহত চাপ তাঁকে ভেতর থেকে আরও ভেঙে দেয়।
শরীর ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছিল।
তারপরও তিনি থামেননি।
ইন্তেকালের অল্প সময় আগেও তাঁর কণ্ঠে ছিল কারাবন্দি আলেমদের মুক্তির দাবি। যে মানুষটি নিজে শাপলার পর কারাগার, রিমান্ড ও নির্যাতন সহ্য করেছিলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আবার তাঁকেই লড়তে হচ্ছিল কারাবন্দি আলেমদের জন্য।
নিজের অসুস্থ শরীরের চেয়েও তখন তাঁর কাছে বড় হয়ে উঠেছিল সহযোদ্ধাদের মুক্তির চিন্তা।
জীবনের শেষ সময়টি তাই আল্লামা বাবুনগরীর জন্য শুধু অসুস্থতার সময় ছিল না। ছিল হাসিনা সরকারের প্রবল চাপ, দেশজুড়ে আলেমদের গণগ্রেপ্তার, মামলা-রিমান্ড, জুলুমের শিকার সহযোদ্ধাদের আর্তনাদ এবং তাঁদের মুক্তির জন্য শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার এক কঠিন অধ্যায়।
বিদায়
এই প্রবল চাপ ও দুশ্চিন্তার মধ্যেই আসে ২০২১ সালের ১৯ আগস্ট।
হাটহাজারীতে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর আল্লামা বাবুনগরীকে দ্রুত চট্টগ্রামের সিএসসিআর হাসপাতালে নেওয়া হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সেখানেই তিনি ইন্তেকাল করেন।
ইন্তেকালের সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ হাটহাজারীর দিকে ছুটতে শুরু করেন।
আলেম, ছাত্র, বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী, ভক্ত-অনুসারী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও তাঁকে শেষবারের মতো দেখতে সেখানে পৌঁছান।
যে হাটহাজারীতে জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি হাদিস পড়িয়েছেন, যে হাটহাজারী থেকে তাঁর বহু আন্দোলনের ডাক ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে, শেষবারের মতো সেখানেই ফিরে আসেন তিনি।
সেদিন আর কোনো দরস ছিল না। কোনো সমাবেশও ছিল না।
ছিল তাঁকে শেষ বিদায় জানাতে মানুষের ঢল।
মানুষের উপস্থিতিতে জানাজাস্থল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। পরে হাটহাজারী মাদরাসার কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
সেই জনসমুদ্র ছিল তাঁর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আস্থার প্রকাশ।
শূন্যতা
পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে।
দেশের রাজনীতি বদলেছে। ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। অনেক হিসাব বদলে গেছে। কিন্তু আল্লামা বাবুনগরীর রেখে যাওয়া শূন্যতা পূরণ হয়নি।
আজও তাঁকে স্মরণ করলে হাদিসের মসনদে বসা সেই মুহাদ্দিসের ছবি সামনে আসে। একই সঙ্গে ভেসে ওঠে আন্দোলনের ময়দানে দাঁড়িয়ে থাকা দৃঢ় মানুষটির মুখ।
শাপলা থেকে কারাগার, রিমান্ড থেকে অসুস্থতা, আবার সেখান থেকে মাদরাসা ও আন্দোলনের ময়দানে ফিরে আসা, তাঁর লড়াকু জীবনের এসব অধ্যায় আজও মানুষের স্মৃতিতে অমলিন।
জীবনের শেষ প্রান্তেও তাঁকে দেখতে হয়েছে সহযোদ্ধাদের গণগ্রেপ্তার ও কারাবরণ। নিজের অসুস্থ শরীর নিয়েও শেষ পর্যন্ত তাঁদের মুক্তির চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।
আল্লামা বাবুনগরীর সংগ্রামের ইতিহাস বাংলাদেশের ইসলামপন্থী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে মিশে আছে। এমন এক অধ্যায়, যেখানে হাদিসের একজন মুহাদ্দিসকে ইসলাম ও মুসলমানদের অধিকারের প্রশ্নে বারবার রাজপথে নামতে হয়েছে। কারাগারে যেতে হয়েছে। রিমান্ড ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। অসুস্থ শরীরেও নিজের অবস্থান ধরে রাখতে হয়েছে।
তিনি রেখে গেছেন হাজার হাজার ছাত্র। রেখে গেছেন ইলমি খেদমত ও গ্রন্থের উত্তরাধিকার। রেখে গেছেন আন্দোলন ও সংগ্রামের স্মৃতি। রেখে গেছেন শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা।
আর রেখে গেছেন নিজের ঈমান, আদর্শ ও অবস্থানে অবিচল থাকার দীর্ঘ ইতিহাস।
পাঁচ বছর ধরে তিনি আমাদের মাঝে নেই। তাঁর দরস নেই, সেই দৃঢ় কণ্ঠ নেই, আন্দোলনের ময়দানে তাঁর উপস্থিতিও নেই।
কিন্তু তাঁর শূন্যতা রয়ে গেছে।
শাপলা গণহত্যার কথা উঠলে, আলেমদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের ইতিহাস সামনে এলে কিংবা বাংলাদেশের ইসলামপন্থী আন্দোলনের আপসহীন নেতৃত্বের ইতিহাস ফিরে দেখা হলে আজও সামনে আসে সেই নাম।
আল্লামা হাফেজ জুনাইদ বাবুনগরী রহ.।
হাদিসের মসনদ থেকে রাজপথ, শাপলা থেকে কারাগার, জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত নিজের অবস্থানে অবিচল ছিলেন তিনি। তাঁর সেই সংগ্রামী জীবন আজও মানুষের স্মৃতিতে অমলিন।
আল্লাহ তায়ালা তাঁকে মাগফিরাত দান করুন এবং জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা নসিব করুন। আমিন।










