১৯৬৫ সালের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে একাধিক রণাঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সাফল্য অর্জন করে পাকিস্তান। লাহোর অভিমুখে ভারতীয় বাহিনীর অগ্রযাত্রা প্রতিহত করা, শিয়ালকোটের চাবিন্দায় প্রতিরক্ষা অবস্থান ধরে রাখা এবং পাল্টা অভিযানে ভারতের খেমকরণ শহর দখল ছিল দেশটির উল্লেখযোগ্য অর্জন। এসব সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি সেনা কর্মকর্তা, সৈনিক ও বৈমানিকেরা।
বিশেষ করে বেদিয়ান রণাঙ্গনে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভারতীয় বাহিনীর একের পর এক আক্রমণ প্রতিহত করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের যুদ্ধক্ষমতা নিয়ে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা ভেঙে দেয় তাঁদের এই কৃতিত্ব। যুদ্ধ শেষে ব্যাটালিয়নটি অর্জন করে ১৫টি সামরিক পদক ও সম্মাননা।
২২ সেপ্টেম্বর যুদ্ধবিরতির ৬১তম বার্ষিকীতে ফিরে দেখা যাক পাকিস্তানের সামরিক অর্জন এবং সেই যুদ্ধে বাঙালি সেনাদের বীরত্বের ইতিহাস।
কাশ্মীর থেকে শুরু সর্বাত্মক যুদ্ধ
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভক্তির পর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের বিরোধ শুরু হয়। প্রথম যুদ্ধের পর জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সংঘর্ষ থামলেও কাশ্মীর সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।
১৯৬৫ সালের আগস্টে ভারতীয় নিয়ন্ত্রণে থাকা কাশ্মীরে অপারেশন জিব্রাল্টার শুরু করে পাকিস্তান। সশস্ত্র অনুপ্রবেশের মাধ্যমে স্থানীয় বিদ্রোহ সৃষ্টি ছিল অভিযানের উদ্দেশ্য। প্রত্যাশিত বিদ্রোহ না ঘটায় পরিকল্পনাটি সফল হয়নি।
এরপর ১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী অপারেশন গ্র্যান্ড স্লাম পরিচালনা করে আখনুর অভিমুখে অগ্রসর হয়। অভিযানে ভারতীয় বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ হুমকির মুখে পড়লেও আখনুর দখলের লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
৬ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তানের পাঞ্জাবে অভিযান শুরু করে। লাহোর, কাসুর ও শিয়ালকোটসহ বিস্তৃত অঞ্চলে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এসব রণাঙ্গনে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলার পাশাপাশি পাল্টা অভিযান পরিচালনা করে।
বিভিন্ন রণাঙ্গনে পাকিস্তানের সামরিক সাফল্য
লাহোরের দিকে ভারতীয় বাহিনীর অগ্রযাত্রার অন্যতম পথ ছিল অমৃতসর ও ওয়াগা হয়ে। পাকিস্তানি সেনারা বাম্বাওয়ালি রাভি বেদিয়ান বা বিআরবি খাল বরাবর প্রতিরক্ষা অবস্থান গড়ে তোলেন। ভারতীয় বাহিনী সীমান্তবর্তী কয়েকটি এলাকায় অগ্রসর হলেও লাহোর শহর দখল করতে পারেনি।
শিয়ালকোটের চাবিন্দায় ভারতীয় সাঁজোয়া বাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানি ট্যাংক ও পদাতিক ইউনিটগুলোর তীব্র সংঘর্ষ হয়। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে একাধিক ভারতীয় আক্রমণ প্রতিহত করে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখেন পাকিস্তানি সেনারা। চাবিন্দার প্রতিরোধ পাকিস্তানের সামরিক ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে ওঠে।
কাসুর অঞ্চলেও পাল্টা অভিযান পরিচালনা করে পাকিস্তান। ৮ সেপ্টেম্বর দেশটির সেনাবাহিনী ভারতের খেমকরণ শহর দখল করে। তবে আসাল উত্তরে ভারতীয় প্রতিরোধে পাকিস্তানি সাঁজোয়া বাহিনীর পরবর্তী অগ্রযাত্রা থেমে যায় এবং উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়।
যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে সমুদ্রেও। ৭ ও ৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যবর্তী রাতে পাকিস্তান নৌবাহিনীর সাতটি জাহাজ ভারতের দ্বারকা উপকূলে গোলাবর্ষণ করে। অপারেশন সোমনাথ নামে পরিচালিত এই অভিযান পাকিস্তানের নৌযুদ্ধের ইতিহাসে স্থান পেয়েছে।
লাহোর ও চাবিন্দার প্রতিরোধ এবং খেমকরণ দখল ছিল পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অর্জন। দেশটির প্রতিরক্ষা দিবসে এসব ঘটনা বিজয়ের ইতিহাস হিসেবে স্মরণ করা হয়। তবে সামগ্রিক যুদ্ধটি শেষ হয়েছিল সামরিক অচলাবস্থায়। কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের পাকিস্তানি লক্ষ্যও পূরণ হয়নি।
বেদিয়ানে বাঙালি সেনাদের দুর্দান্ত প্রতিরোধ
১৯৪৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার কুর্মিটোলায় প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে গঠিত এই ব্যাটালিয়ন সিনিয়র টাইগার্স নামেও পরিচিত ছিল।
১৯৬৫ সালে ব্যাটালিয়নটি লাহোর সেনানিবাসে অবস্থান করছিল। অধিনায়ক ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহের খায়রুল হক, সংক্ষেপে এ টি কে হক। উপাধিনায়ক ছিলেন মেজর মঙ কিউ। আলফা কোম্পানির নেতৃত্বে ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। প্রায় ৭৫০ সদস্যের ব্যাটালিয়নটির অধিকাংশই ছিলেন বাঙালি।
ভারতীয় আক্রমণের আশঙ্কায় ৪ সেপ্টেম্বর রাতে তাঁদের লাহোরের দক্ষিণ পূর্বে বেদিয়ান এলাকায় মোতায়েন করা হয়। পাকিস্তানের একাদশ পদাতিক ডিভিশনের অধীন ১০৬ পদাতিক ব্রিগেডের অংশ হিসেবে তাঁরা বিআরবি খালের পশ্চিম তীরে প্রতিরক্ষা অবস্থান গ্রহণ করেন।
৬ সেপ্টেম্বর ভোর চারটার দিকে ভারতীয় বাহিনী পদাতিক সৈন্য, ট্যাংক ও বিমান সহায়তায় বেদিয়ান হেডওয়ার্কসে আক্রমণ চালায়।
প্রায় পাঁচ ঘণ্টার তীব্র লড়াইয়ের পর ভারতীয় বাহিনীর প্রথম আক্রমণ প্রতিহত করেন বাঙালি সৈনিকেরা। এরপর দিনের বিভিন্ন সময়ে এবং রাতেও নতুন করে আক্রমণ চালানো হয়। কিন্তু প্রথম ইস্ট বেঙ্গলের সদস্যরা নিজেদের প্রতিরক্ষা অবস্থান ধরে রাখেন।
পাকিস্তানের আর্মি ইনস্টিটিউট অব মিলিটারি হিস্ট্রির গবেষণায়ও প্রথম ইস্ট বেঙ্গলের এই প্রতিরোধের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে বাঙালি সেনাদের সাহসিকতা ও দৃঢ়তার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে সেখানে।
অধিনায়ক এ টি কে হক চারটি রাইফেল কোম্পানির প্রতিরক্ষা সমন্বয় করেন। যুদ্ধের শুরুতে অ্যাডজুট্যান্ট ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন সীমান্তরক্ষীদের কাছ থেকে ভারতীয় আক্রমণের খবর পেয়ে দ্রুত ব্রিগেড সদর দপ্তরকে অবহিত করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁদের অবস্থানের ওপর গোলাবর্ষণ শুরু হয়।
ভারতীয় বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে বিশেষ কৌশলও গ্রহণ করেন বাঙালি কর্মকর্তারা। ব্যাটালিয়ন অধিনায়কের নির্দেশে বেদিয়ান হেডওয়ার্কসের স্লুইস গেট দিয়ে পুরোনো আপার বারি দোয়াব খালে পানি প্রবাহিত করা হয়। এতে ক্যাথানওয়ালা এলাকার অংশবিশেষ প্লাবিত হয়ে ভারতীয় বাহিনীর অগ্রযাত্রায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
পৃথক এক অভিযানে ভারতীয় বাহিনীর ১১ সদস্যের একটি অনুসন্ধানী দল আটক করেন বাঙালি সৈনিকেরা। অভিযানে অংশ নেন হাবিলদার লুৎফর রহমান চৌধুরী।
ওসমানী ও মেজর জিয়াউর রহমানের ভূমিকা
১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময় কর্নেল এম এ জি ওসমানী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরে ডেপুটি ডিরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশনস পদে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হন।
সামরিক ইতিহাসবিদ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. বায়েজিদ সরোয়ারের গবেষণায় ওসমানীর বেদিয়ান সফরের বিবরণ রয়েছে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে সেখানে গিয়ে প্রথম ইস্ট বেঙ্গলের কর্মকর্তা ও সৈনিকদের উৎসাহিত করেন তিনি। বাঙালি সেনাদের সামরিক সক্ষমতা প্রমাণের আহ্বান জানান।
বেদিয়ান রণাঙ্গনে আলফা কোম্পানির নেতৃত্বে ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। ভারতীয় বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করে তাঁর কোম্পানি সামরিক কৃতিত্ব অর্জন করে।
১৯৭৪ সালের ২৬ মার্চ সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত ‘একটি জাতির জন্ম’ নিবন্ধে জিয়াউর রহমান এই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি জানান, বেদিয়ানে তাঁর ব্যাটালিয়ন সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল এবং ব্যাটালিয়নের পুরস্কারপ্রাপ্ত কোম্পানিটি ছিল তাঁর নেতৃত্বাধীন আলফা কোম্পানি। একই সাথে যুদ্ধে বীরত্বের জন্য তাঁকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক বীরত্বসূচক খেতাব হিলাল ই জুরাত প্রদান করা হয়।
তাঁর নেতৃত্বাধীন আলফা কোম্পানি যুদ্ধক্ষেত্রে বিধ্বস্ত একটি ভারতীয় ট্যাংকও উদ্ধার করে। ট্যাংকটি পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে যুদ্ধস্মারক হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়।
জিয়াউর রহমান তাঁর স্মৃতিচারণে পাকিস্তানি সামরিক মহলে বাঙালিদের যুদ্ধক্ষমতা সম্পর্কে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণার কথাও তুলে ধরেন। বেদিয়ানের যুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কৃতিত্ব সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছিল।
পদকপ্রাপ্ত বাঙালি বীর ও সৈনিকদের আত্মত্যাগ
বেদিয়ানে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি কে হক সিতারা ই জুরাত খেতাব অর্জন করেন।
একই খেতাব পান সুবেদার আজিম খান ও সুবেদার মুহাম্মদ আলী। তাঁদের নাম পাকিস্তানের সামরিক ইতিহাস ইনস্টিটিউটের প্রকাশিত সম্মাননা তালিকায় রয়েছে।
সাধারণ সৈনিকদের মধ্যেও অনেকে সাহসিকতার স্বীকৃতি লাভ করেন। তাঁদের অন্যতম সিপাহি আবুল হাসেম। ডি কোম্পানিতে ট্যাংকবিধ্বংসী রিকয়েললেস রাইফেল পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। যুদ্ধকালীন বীরত্বের জন্য তমঘা ই জুরাত অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে লাভ করেন বীর বিক্রম খেতাব।
নায়েক তাজুল ইসলামের আত্মত্যাগও প্রথম ইস্ট বেঙ্গলের ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতীয় আক্রমণে তাঁর প্লাটুন তিন দিক থেকে ঘেরাও হয়ে পড়লে মেশিনগান দিয়ে প্রতিরোধ চালিয়ে যান তিনি। সহযোদ্ধাদের ঘেরাও অবস্থা থেকে বের হওয়ার সুযোগ করে দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারান। তাঁকে মরণোত্তর তমঘা ই জুরাত দেওয়া হয়।
প্রথম ইস্ট বেঙ্গলের বাইরে অন্যান্য ইউনিটেও বাঙালি কর্মকর্তারা যুদ্ধ করেন। ১৬ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের কোম্পানি কমান্ডার মেজর শেখ মোবারক আলী ১০ সেপ্টেম্বর ওয়াগা রণাঙ্গনে নিহত হন। লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম আই করিম খেমকরণ অঞ্চলে একটি ট্যাংক ইউনিটের নেতৃত্ব দেন।
প্রথম ইস্ট বেঙ্গলের কোয়ার্টারমাস্টার ক্যাপ্টেন সাদেকুর রহমান চৌধুরী রসদ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার জন্য তমঘা ই কায়েদে আজম সম্মাননা অর্জন করেন। সুবেদার মেজর খোরশেদ মিয়া পান তমঘা ই বাসালাত।
আকাশযুদ্ধেও বাঙালি বৈমানিকদের বীরত্ব
স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি পাকিস্তান বিমানবাহিনীর হয়ে ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নেন বাঙালি বৈমানিকেরা।
এই যুদ্ধে ১৪ জন বাঙালি যুদ্ধবিমানচালক ও ৯ জন নেভিগেটরের অংশগ্রহণের তথ্য পাওয়া যায়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাইফুল আজম, উইং কমান্ডার গোলাম মোহাম্মদ তাওয়াব, স্কোয়াড্রন লিডার আলাউদ্দিন আহমেদ এবং ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট এম শওকত উল ইসলাম।
যুদ্ধকালীন কৃতিত্বের জন্য সাইফুল আজম সিতারা ই জুরাত খেতাব অর্জন করেন। ফ্লাইং অফিসার জিয়াউদ্দিন হাসানও একই সম্মাননা লাভ করেন। অন্যদিকে বিমানযুদ্ধে প্রাণ হারান স্কোয়াড্রন লিডার আলাউদ্দিন আহমেদ।
পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর প্রধান হওয়া মমতাজ উদ্দিন আহমেদও যুদ্ধে অংশ নেন। ৬ সেপ্টেম্বর ওয়াগার কাছে ভারতীয় ট্যাংকের বিরুদ্ধে বিমান অভিযানের অভিজ্ঞতা তিনি নিজের স্মৃতিকথায় তুলে ধরেছেন।
ঢাকার তেজগাঁও ঘাঁটি থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কালাইকুন্ডা বিমানঘাঁটিতেও অভিযান পরিচালনা করে পাকিস্তান বিমানবাহিনী।
১৫টি সামরিক সম্মাননায় বাঙালিদের স্বীকৃতি
১৯৬৫ সালের যুদ্ধে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট মোট ১৫টি সামরিক পদক ও সম্মাননাপত্র অর্জন করে।
পাকিস্তানের আর্মি ইনস্টিটিউট অব মিলিটারি হিস্ট্রির তালিকায় রয়েছে তিনটি সিতারা ই জুরাত, সাতটি তমঘা ই জুরাত, একটি তমঘা ই কায়েদে আজম, একটি তমঘা ই বাসালাত এবং তিনটি ইমতিয়াজি সনদ।
তমঘা ই জুরাতপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন হাবিলদার আতাউর রহমান, হাবিলদার জহিরুল হক পাঠান, নায়েক মনিরুল হক, নায়েক তাজুল ইসলাম, সিপাহি হাশমত উল্লাহ, সিপাহি আবুল হাসেম ও সিপাহি আমিন উল্লাহ। এ ছাড়া ইমতিয়াজি সনদ পান হাবিলদার লুৎফর রহমান চৌধুরী।
যুদ্ধে প্রথম ইস্ট বেঙ্গলের ১৫ জন সদস্য নিহত হন। তাঁদের লাহোর সেনানিবাসের কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
যুদ্ধ শেষে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে প্রথম ইস্ট বেঙ্গলের সদস্যদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তাঁদের বীরত্বের প্রশংসায় কবিতা লেখেন পশ্চিম পাকিস্তানের কবি আগা শোরেশ কাশ্মিরি।
যুদ্ধবিরতি ও বাঙালির সামরিক ইতিহাস
২০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ২১১ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানায়। ভারত ২১ সেপ্টেম্বর এবং পাকিস্তান ২২ সেপ্টেম্বর প্রস্তাবটি গ্রহণ করে।
২২ সেপ্টেম্বর গ্রিনিচ মান সময় রাত ১০টায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। পাকিস্তানের স্থানীয় সময় তখন ২৩ সেপ্টেম্বর রাত তিনটা।
১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে তাসখন্দ ঘোষণার মাধ্যমে উভয় দেশ যুদ্ধের আগের অবস্থানে সেনা প্রত্যাহারে সম্মত হয়। কাশ্মীর বিরোধ অমীমাংসিত থেকে যায়।
এই যুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিরক্ষায় বাঙালি সৈনিকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শক্তি ছিল সীমিত। ফলে নিজেদের অঞ্চলের প্রতিরক্ষা এবং সশস্ত্র বাহিনীতে বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর দাবি নতুন গুরুত্ব পায়।
ছয় বছর পর ১৯৭১ সালে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টসহ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বহু বাঙালি কর্মকর্তা ও সৈনিক বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নেন।
১৯৬৫ সালের যুদ্ধে প্রথম ইস্ট বেঙ্গলের প্রতিরোধ, এ টি কে হক ও মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব, সাধারণ সৈনিকদের আত্মত্যাগ, বৈমানিকদের অভিযান এবং ১৫টি সামরিক সম্মাননা অর্জন বাঙালির সামরিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে।











