দখলদার অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলকে আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে গাজ্জা ও পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান আগ্রাসনের কঠোর সমালোচনা করেছেন জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের অধিকার, ন্যায্য শান্তি এবং গাজ্জা ও পশ্চিম তীরকে ফিলিস্তিনি জনগণের অভিন্ন ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ।
বাদশাহ আবদুল্লাহ বলেন, বিশ্ব বর্তমানে ইতিহাসের একটি অনন্য মুহূর্তে রয়েছে। প্রতিদিনই নতুন সংকট, ট্র্যাজেডি ও জরুরি পরিস্থিতি দেখা দিচ্ছে। কোন সংঘাত নিয়ে বিশ্ব দীর্ঘ সময় কূটনৈতিক তৎপরতা চালাবে, কোন যুদ্ধবিরতি ক্যামেরা সরে যাওয়ার পরও টিকে থাকবে এবং মানবিক দুর্ভোগ কখন অসহনীয় থেকে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হবে, তার ওপর আন্তর্জাতিক মনোযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
লেবানন, ইয়েমেন, সুদান ও ইরানের যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো সংকট শুধু ওই অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ইরান যুদ্ধের অস্থিতিশীলতা অঞ্চলটির বাইরেও বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও মানুষের জীবনযাত্রায় দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে। মুম্বাই থেকে মাদ্রিদ, এমনকি আমেরিকার মিনেসোটা পর্যন্ত সাধারণ পরিবারের জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের ব্যয়েও এর প্রভাব দেখা যেতে পারে।
গাজ্জা প্রসঙ্গে জর্ডানের বাদশাহ বলেন, কয়েক দশক ধরে তিনি জাতিসংঘের এই মঞ্চে ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংঘাতের সমাধান না হওয়ার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে আসছেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সংঘাতের মূল কারণ সমাধানের পরিবর্তে সেটিকে শুধু পরিচালনা করার পথ বেছে নিয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিনের দখলদারত্বের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, আন্তর্জাতিক আইন যদি কয়েক দশক ধরে উপেক্ষা করা যায়, তাহলে সেই আইনের মূল্য কী? আর এর লঙ্ঘনকে স্বীকৃতি না দিলে তা কীভাবে কার্যকর করা সম্ভব?
গাজ্জা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঘোষিত যুদ্ধবিরতির প্রথম ৩০০ দিনেই অন্তত ৩০০ ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। দখলদার ইসরাইলি সরকারের বিরুদ্ধে গাজ্জায় হামলা ও বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস অব্যাহত রাখা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যকা থেকে সেনা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতির অভিযোগ করেন তিনি।
বাদশাহ আবদুল্লাহ বলেন, এসব কর্মকাণ্ডের ফলে গাজ্জার ফিলিস্তিনি জনগণ উপত্যকার মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ইসরাইলের নীতিকে আর শুধু সাময়িক সামরিক ব্যবস্থা কিংবা যুদ্ধের ফলাফল হিসেবে দেখা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এসব কর্মকাণ্ডকে ফিলিস্তিনি জীবন মুছে ফেলা এবং গাজ্জায় নতুন ভৌগোলিক বাস্তবতা তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা উচিত বলে উল্লেখ করেন তিনি।
পশ্চিম তীর নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জর্ডানের বাদশাহ। তার মতে, সেখানে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, ফিলিস্তিনিদের ভূমি ও সম্পত্তি ধ্বংস এবং তাদের বাস্তুচ্যুত করার ঘটনা বেড়েছে। ইসরাইল পশ্চিম তীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করতে এবং বসতি সম্প্রসারণের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের সেখান থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বাদশাহ আবদুল্লাহ আরও অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে ইসরাইলি সেনারা ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলার সময় দাঁড়িয়ে থাকে, হামলাকারীদের সুরক্ষা দেয় অথবা কখনো নিজেরাও সহিংসতায় অংশ নেয়। আহতদের কাছে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাতে বাধা দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগও করেন তিনি। বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে সেনারা যখন সহিংসতা প্রত্যক্ষ করে, সহায়তা করে বা তাতে অংশ নেয়, তখন বিষয়টিকে আর ‘কয়েকজন দাঙ্গাকারীর’ কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পশ্চিম তীরে ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির নীতি হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে গাজ্জা ও পশ্চিম তীরকে ফিলিস্তিনি জনগণের একটি অভিন্ন ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান। তার ভাষায়, গাজ্জা ধ্বংস হয়েছে এবং পশ্চিম তীর কার্যত সংযুক্ত করে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে কার্যকর একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে।
ইসরাইলের সঙ্গে শান্তির সুযোগ আরব বিশ্ব প্রত্যাখ্যান করেছে, এমন দাবিও প্রত্যাখ্যান করেন বাদশাহ আবদুল্লাহ। তিনি ২০০২ সালের সৌদি আরবের নেতৃত্বে প্রস্তাবিত আরব শান্তি উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ওই উদ্যোগে শান্তি ও একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিনিময়ে ৫৭টি আরব ও মুসলিম দেশের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রস্তাব ছিল।
তিনি বলেন, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ওই প্রস্তাব বহাল রয়েছে। তার মতে, শান্তির অংশীদারের অভাব নয়, বরং তা গ্রহণে ইসরাইলি সরকারের অনিচ্ছাই বড় বাধা।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হাতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিভিন্ন উপায় রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন জর্ডানের বাদশাহ। এর মধ্যে নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দ, বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার কথা বলেন তিনি। তবে ইসরাইলের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রস্তাব বাস্তবায়নের পরিবর্তে কাগজেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ইসরাইলকে ‘আঞ্চলিক হুমকি’ উল্লেখ করে বাদশাহ আবদুল্লাহ বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত ধরে না নেওয়া যে ইসরাইলের আকাঙ্ক্ষা শুধু ফিলিস্তিন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। সিরিয়ার পরিস্থিতিকে তিনি এ ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেন। তার অভিযোগ, ইসরাইল ধাপে ধাপে পরীক্ষা করছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কতদূর পর্যন্ত তাদের কর্মকাণ্ড মেনে নেবে।
জর্ডানের বাদশাহ বলেন, তার দেশ ন্যায্য শান্তির প্রতি অঙ্গীকার থেকে সরে যাবে না। ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও প্রতিরোধক্ষমতার প্রতি সমর্থন এবং জেরুজালেমের মুসলিম ও খ্রিস্টান পবিত্র স্থানগুলোর ঐতিহাসিক ও আইনগত মর্যাদা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতিও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, গাজ্জা, সুদান, ইউক্রেন কিংবা বিশ্বের যেকোনো যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও ভয়ের পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীতিগত অবস্থান বিশ্বের মনোযোগের সঙ্গে পরিবর্তিত হওয়া উচিত নয়। তার ভাষায়, ভবিষ্যৎ শুধু আমরা কী করি তার ওপর নির্ভর করে না, আমরা কোন বিষয়গুলো উপেক্ষা করতে বেছে নিই, তার ওপরও ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়।
সূত্র : জর্ডানের সরকারি সংবাদ সংস্থা পেত্রা, রয়টার্স











