বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরী বলেছেন, সাংবাদিকতা হচ্ছে সত্যের আরাধনা। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, সাংবাদিকের কাজ সত্যকে খুঁজে বের করা এবং সেই সত্যকে রক্ষা করা। সত্য না থাকলে আস্থা থাকে না, আর আস্থার অভাব হলে গণতন্ত্র থাকে না।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাতে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাব আয়োজিত জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন উপলক্ষে বাংলাদেশ থেকে আগত সাংবাদিকদের সঙ্গে নিউইয়র্কে কর্মরত সাংবাদিকদের মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, এখানে মিথ্যা কিংবা অর্ধসত্যের কোনো স্থান নেই। এ ক্ষেত্রে আপসেরও কোনো সুযোগ নেই। সংবাদপত্র দেশের জনগণ ছাড়া কারও কাছে দায়বদ্ধ নয়। কালোকে কালো আর সাদাকে সাদা বলাই সাংবাদিকতার মূলমন্ত্র।
তিনি বলেন, মনে রাখতে হবে, দাসত্বের সাংবাদিকতাকে মানুষ ঘৃণা করে। গত ১৭ বছরে আমরা অনেক সাংবাদিককে দাসত্বের সাংবাদিকতা করতে দেখেছি। এর কারণে ফ্যাসিবাদী শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। সাংবাদিকদের মর্যাদাকে তারা ম্লান করে দিয়েছে।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান এ বিষয়টি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে দলীয় ব্যানারের আড়ালে সাংবাদিকতা করেছেন, ক্ষমতার সঙ্গে আঁতাত করে জনগণের স্বার্থ বিসর্জন দিয়েছেন, তারা শেষ পর্যন্ত জনগণের রোষানল থেকে বাঁচতে পারেননি। কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, কেউবা হত্যা মামলার আসামি হয়ে কারাগারে গেছেন। অনেকে আজও পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি অমোঘ সত্য হাজির করেছে, সাংবাদিকতা কখনো দলীয় ব্যানারের ভিত্তিতে টিকে থাকতে পারে না। জনগণের আস্থা হারানো মানে সাংবাদিকতার মৃত্যু। সাংবাদিকতা কোনো মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা নয়। এটি একটি সম্মানের পেশা।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকতার পথ কখনোই সহজ বা মসৃণ ছিল না। বর্তমানে গণমাধ্যমে যে অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করছে, তা অব্যাহত থাকলে সাংবাদিকরা আরও বেশি সত্য তুলে ধরতে পারবেন। তবে যা ইচ্ছা তা লিখলেই সাংবাদিকতা হয় না। যা মুখে আসবে তা বলাই বাকস্বাধীনতা নয়। স্বাধীনতার পাশাপাশি সাংবাদিকদের দায়িত্বশীলতার কথাও মনে রাখতে হবে।
গণমাধ্যমের সংখ্যা দ্রুত বাড়ার প্রসঙ্গে বিএফইউজে মহাসচিব বলেন, অধিকাংশ মিডিয়ার প্রাতিষ্ঠানিকতা নেই। তারা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা না করে ব্যবসায়ীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে নানাভাবে হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইল করছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। মোবাইল ফোন হাতে নিয়েই অনেকে সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছেন। এর ভয়াবহতা থেকে কেউই নিরাপদ নয়। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করেও সামাজিকভাবে মানুষকে হেয়প্রতিপন্ন করা হচ্ছে।
এসব বন্ধে আইনের সঠিক প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, অপসাংবাদিকতা ও হয়রানি রোধে আইনের যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। তবে একই সঙ্গে আইন যেন অপব্যবহার না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘নো ওয়েজবোর্ড, নো মিডিয়া’ নীতিমালা কার্যকর করতে হবে। তিনি বলেন, ওয়েজবোর্ড মেনে বেতন দিতে হয় না বলেই অসংখ্য ভুঁইফোড় গণমাধ্যম গড়ে উঠছে। তার মতে, ভুঁইফোড় গণমাধ্যমগুলোর ক্ষেত্রেও ওয়েজবোর্ড বাধ্যতামূলক করা হলে অপসাংবাদিকতা অনেকাংশে কমে আসবে।
তিনি বলেন, এসব গণমাধ্যমের তথাকথিত সাংবাদিকদের একটি অংশ চাঁদাবাজি করছে এবং সাংবাদিকতার পরিচয়কে অপব্যবহার করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে সাংবাদিকতার মর্যাদা ম্লান হচ্ছে।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও চাকরির নিশ্চয়তার দাবি জানিয়ে কাদের গনি চৌধুরী বলেন, তারা সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের দাবি জানাচ্ছেন। সরকারি কর্মকর্তারা যেখানে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও ছুটি পান, সেখানে সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ ও ছুটির বিষয়টি এখনও যথাযথভাবে নিশ্চিত হয়নি।
তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময়ে সাগর-রুনিসহ অনেক সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন। কথায় কথায় সাংবাদিকদের চাকরিচ্যুত করা হয়। সাংবাদিকরা জনগণের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে কথা বললেও কর্মক্ষেত্রসহ কোথাও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। একই সঙ্গে চাকরির নিশ্চয়তাও নেই।
সাংবাদিক সমাজের বিভাজন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিএফইউজে মহাসচিব। তিনি বলেন, আজকে আমাদের মাঝে বহু বিভাজনের কারণে আমরাই দুর্বল হচ্ছি। সরকার ও মালিকরা এর সুযোগ নেন।
তিনি সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সাংবাদিক সমাজ ঐক্যবদ্ধ হলে গণমাধ্যমের অনেক সমস্যা দূর করা সম্ভব হবে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা যাবে।











