ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য স্থগিত থাকায় গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে পাকিস্তানি রপ্তানিকারকরা আর্থিক ক্ষতি, আটকে থাকা পণ্য এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিসহ নানা সমস্যার মুখে পড়েছেন।
দুই দেশের অভিন্ন সীমান্তের একটি ক্রসিংয়ে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে দেশ দুটির মধ্যে বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। সিএনএর এক প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্য স্থগিত হওয়ার পর থেকে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাকিস্তান আফগানিস্তানে অবস্থানরত সশস্ত্র ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলা চালানোর অভিযোগ করেছে। তবে ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান (আইইএ) এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
দীর্ঘস্থায়ী এই বাণিজ্যিক অচলাবস্থায় পাকিস্তানের ওষুধ প্রস্তুতকারক, কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক, পরিবহন কোম্পানি এবং মধ্য এশিয়ার বাজারে প্রবেশের জন্য আফগানিস্তানের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাকিস্তানের ওষুধ শিল্পও এই বাণিজ্য স্থগিতের কারণে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। আফগানিস্তান পাকিস্তানের ওষুধ রপ্তানির অন্যতম প্রধান গন্তব্য।
পেশোয়ারের ফেড্রো ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রধান নির্বাহী জুনায়েদ আলতাফ সিএনএকে বলেন, তার কারখানায় প্যাকেটজাত করা ওষুধের প্রায় ৭০ শতাংশই আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল।
তিনি বলেন, সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কোম্পানিটির অনেক অর্ডার আটকে গেছে। উৎপাদনের কিছু কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে। এমনকি নির্ধারিত বাজারের জন্য প্রস্তুত করা কিছু প্যাকেজিং সামগ্রীও এখন আর ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
ফারসি ও অঞ্চলভেদে ব্যবহৃত অন্যান্য ভাষায় প্রস্তুত করা প্যাকেজিং সামগ্রীও অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। এতে কোম্পানিটির আর্থিক ক্ষতি আরও বেড়েছে। রপ্তানি কমে যাওয়ার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ফেড্রো এখন দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
খাদ্য ও কৃষিপণ্য রপ্তানিকারকরাও বড় ধরনের ক্ষতির কথা জানিয়েছেন। চাল, মাংস, কমলা জাতীয় ফল ও আলু রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এমএম এলাহী ট্রেডার্সের প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা অংশীদার মনজুর এলাহী বলেন, আগে তার কোম্পানির আয়ের ৮০ শতাংশই আসত আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়া থেকে। এখন সেই হার কমে প্রায় ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
প্রধান সীমান্ত ক্রসিংগুলোর মাধ্যমে বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ায় পাকিস্তানি রপ্তানিকারকরা মধ্য এশিয়ার বাজারে পৌঁছাতে বিকল্প পথ খুঁজছেন। এর মধ্যে ইরানের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের পথও রয়েছে। তবে এসব পথে পণ্য পরিবহনে বেশি সময় লাগছে, খরচ বাড়ছে এবং অতিরিক্ত লজিস্টিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
পাকিস্তানি রপ্তানিকারক মুহাম্মদ নাঈম সিএনএকে বলেন, আগে পাকিস্তান থেকে তোরখাম সীমান্ত হয়ে উজবেকিস্তানে পণ্য পৌঁছাতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগত। এতে খরচ হতো ২ হাজার থেকে ৩ হাজার ডলার।
তিনি বলেন, এখন ইরানের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনে প্রায় ছয় সপ্তাহ সময় লাগছে এবং খরচ হচ্ছে আনুমানিক ১০ হাজার থেকে ১৩ হাজার ডলার।
দীর্ঘ এই যাত্রায় পচনশীল পণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। একইভাবে কোনো কোনো পণ্য মেয়াদ শেষ হওয়ার পর গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। এতে রপ্তানিকারকদের পুরো চালানই ফেলে দিতে হতে পারে।
এই বাণিজ্যিক অচলাবস্থা পরিবহন অবকাঠামো ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসাগুলোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পেশোয়ারের একটি ট্রাক ডিপোতে আগে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০টি ট্রাক আফগানিস্তানে পণ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হতো। এখন সেখানে কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
বাণিজ্য স্থগিতের প্রভাব শুধু রপ্তানিকারকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শ্রমিক, কাস্টমস ছাড়পত্রের সঙ্গে যুক্ত এজেন্ট, পরিবহন অপারেটর এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবসাও এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাকিস্তানি ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো ইসলামাবাদ ও কাবুলকে আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের মতপার্থক্য দূর করে বাণিজ্য পুনরায় চালু করার আহ্বান জানিয়েছে।
আফগানিস্তানের জন্য এই বাণিজ্যিক অচলাবস্থা পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে চলমান প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্য ও ট্রানজিট রুটে প্রবেশ আরও জটিল করে তুলেছে। অন্যদিকে পাকিস্তানি রপ্তানিকারকদের জন্য এর অর্থ হলো, একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী বাজারে প্রবেশাধিকার হারানোর পাশাপাশি মধ্য এশিয়ার দূরের বাজারগুলোতে পণ্য পৌঁছাতে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানালেও বাণিজ্যিক অচলাবস্থা শিগগিরই শেষ হবে, এমন স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
সূত্র : সিএনএ, আরিয়ানা নিউজ











