গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণসমাবেশ করেছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। সমাবেশ শেষে দাবির পক্ষে তিন মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেন সংগঠনটির আমীর মাওলানা মামুনুল হক।
শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের উদ্যোগে এ গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, জুলাইয়ের অঙ্গীকার ছিল, আগামীর বাংলাদেশ গড়ে উঠবে ১৯৪৭ সাল, ২০১৩ সাল এবং ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক বিজয়ের ভিত্তির ওপর।
তিনি বলেন, “যারা ইসলামকে ভালোবাসে, বাংলাদেশকে ভালোবাসে এবং বাংলাদেশের শতবর্ষের ঐতিহ্যকে ধারণ করে, তারা জুলাই বিপ্লবের বিপক্ষে থাকতে পারে না।”
বিএনপির উদ্দেশে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, “আপনারা বাংলাদেশের ৫০ বছরের রাজনীতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না। শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সাথে গাদ্দারি করে বিএনপি টিকে থাকতে পারবে না।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশে পূর্বে তিনটি গণভোট হয়েছে, কোনো গণভোটের সাথেই কেউ গাদ্দারি করেনি। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের যেখানেই গণভোট হয়েছে, কোনো গণভোটের সাথেই কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। যদি বিএনপি গণভোটের সাথে গাদ্দারি করে, তাহলে বিএনপি বিশ্বের একমাত্র গাদ্দার দল হিসেবে পরিচিত হবে।”
বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতার সমালোচনা করে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, বাংলাদেশে প্রেরিত ভারতের নতুন রাষ্ট্রদূতকে কূটনৈতিক রেওয়াজ ভঙ্গ করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একজন বিজেপি নেতাকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠানো হয়েছে, অথচ সরকার এ বিষয়ে কোনো প্রতিবাদ করেনি।
তিনি বলেন, ইরান বন্ধুত্বের দায়িত্ব পালন করে তেল দিচ্ছে, কিন্তু সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতার কারণে বারবার সেই তেলবাহী জাহাজ আটকে দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “আপনারা না পারলে আমাদেরকে দায়িত্ব দিন, আমরা দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।”
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলমান নৈরাজ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেভাবে অস্ত্রের ঝনঝনানি শুরু হয়েছে, এভাবে চলতে থাকলে এর দায় সরকারকেই বহন করতে হবে।
সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আজকে যে মঞ্চে আমরা দাঁড়িয়েছি, এই মঞ্চের সাথে দুটি জিনিস কখনো যাবে না। একটি হলো আধিপত্যবাদ এবং আরেকটি হলো ফ্যাসিবাদ। এই দুইটিকে এই মঞ্চ কখনোই গ্রহণ করবে না, বরদাশতও করবে না।”
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদীরা বিভিন্ন নেতিবাচক বয়ান তৈরি করে জাতিকে বিভক্ত করেছিল। নির্বাচনের আগে তারা সবাইকে নিয়ে দেশ চালানোর কথা বললেও এখন ভিন্ন আচরণ করছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “যুবক ও শিশুদের কথা দিচ্ছি, আমরা তোমাদের সাথে বেইমানি করবো না। তোমাদের সকল দাবি বাস্তবায়নে আমরা অবিচল থাকবো, ইনশাআল্লাহ। আমাদের বিজয় হবে জনগণের বিজয়।”
এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ঐকমত্য কমিশন থেকে সংস্কার ও জুলাই সনদের পক্ষে সবার আগে কণ্ঠস্বর হিসেবে এসেছেন আল্লামা মামুনুল হক। ষড়যন্ত্র করে তাকে সংসদে যাওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে, কিন্তু রাজপথে তাকে থামানো সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, “যদি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে সংসদ ও রাজপথ একাকার হয়ে যাবে।”
এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, সরকার যে কথা দিয়েছিল, তা মানেনি। প্রত্যেক জেলায় জেলা পরিষদে প্রশাসনিক ব্যবস্থা করে দলীয় লোকজন দিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে, যা বাকশালের নমুনা।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমাদ বলেন, সরকার দেশে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও তেলের সংকট নেই বললেও বাস্তবে পেট্রোলের জন্য শত শত গাড়ির লাইন দেখা যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ নেই বললেই চলে। সবদিকে সংকট ও অবনতি চলছে, কিন্তু সরকার এসব বিষয়ে নজর না দিয়ে নিজেদের ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে ব্যস্ত।
তিনি বলেন, গত দেড় মাসে সরকার নিজেদের পরিবারের কাজ ও কৃষক কার্ড দেওয়ার জন্য ব্যাংক থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। সরকার এভাবে চলতে থাকলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে দেশ দেউলিয়া হয়ে যাবে।
সমাবেশ শেষে মাওলানা মামুনুল হক গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে তিন মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে মে, জুন ও জুলাই মাসজুড়ে দেশের জেলায় জেলায় নাগরিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এসব সমাবেশে মাওলানা মামুনুল হকসহ কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নেবেন। আগামী ৫ আগস্ট ঢাকায় গণমিছিল অনুষ্ঠিত হবে।
সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা ইউসুফ আশরাফ, নায়েবে আমির মাওলানা রেজাউল করিম জালালী, শায়খুল হাদীস মাওলানা আলী উসমান, মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
এ ছাড়া সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, মাওলানা আব্দুল আজীজ, মুফতি শরাফত হোসাইন, মাওলানা তোফাজ্জল হোসাইন মিয়াজি, মাওলানা শরীফ সাঈদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুর রহমান হেলাল, মাওলানা ফয়সাল আহমাদ, মাওলানা এনামুল হক মুসা, মাওলানা আবুল হাসানাত জালালী, মাওলানা আবু সাইদ নোমানসহ সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা।











