ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিস ও সাইপ্রাসকে নিয়ে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক জোট গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীদের অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আমির বারাম।
বুধবার (২৬ আগস্ট) রাইখম্যান ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হার্জলিয়া সম্মেলনে তিনি এ কৌশলের কথা তুলে ধরেন।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সম্মেলনে আমির বারাম ‘প্রয়োজন অনুযায়ী সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, ভারত থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে গ্রিস ও সাইপ্রাস পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বৃহত্তর জোট এবং কঠোর স্বার্থ ও অভিন্ন মূল্যবোধের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের নতুন নিরাপত্তা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)’ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইসরাইলের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আওতাভুক্ত দেশগুলোর মাধ্যমে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ও ভারতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ধারণা সামনে রয়েছে। গত এক দশকে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। সামরিক মহড়া, বৈঠক ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানির মধ্য দিয়ে এ সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হয়েছে।
ইসরাইলি প্রযুক্তিতে গ্রিসের আকাশ প্রতিরক্ষা
সম্প্রতি গ্রিসের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেশটির শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে। এর নকশা অনেকাংশেই ইসরাইলের সমন্বিত ও বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আদলে তৈরি করা হচ্ছে, যা সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
গ্রিসের সংবাদমাধ্যম একাথিমেরিনি সোমবার জানিয়েছে, ইসরাইলের সঙ্গে বড় ধরনের একটি আকাশ প্রতিরক্ষা চুক্তির অনুমোদন পাওয়ার পথে এগোচ্ছে এথেন্স। সরকার পরিকল্পিত ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ প্রতিরক্ষা ছাতার আওতায় ইসরাইলি প্রযুক্তিতে তৈরি ব্যবস্থা কিনতে ৩ বিলিয়ন ইউরোর চুক্তির অনুমোদন চাইছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মসূচির আওতায় রাফায়েলের স্পাইডার অল-ইন-ওয়ান ও ডেভিডস স্লিং ব্যবস্থা এবং ইসরাইল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজের (আইএআই) তৈরি বারাক এমএক্স ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে গ্রিসের প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর আগে রোমানিয়ার কাছেও রাফায়েল তাদের স্পাইডার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিক্রি করেছে।
গ্রিস, ভারত ও সাইপ্রাসের সঙ্গে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠতার শিকড় কয়েক দশক আগের। দীর্ঘদিনের ধীরগতির এই সম্পর্ক এখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে। গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ার পাশাপাশি ইসরাইল ও ভারতের সম্পর্কও আরও দৃঢ় হচ্ছে।
তবে ইসরাইল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের সম্পর্ক কোন দিকে যাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এসব দেশ আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অংশ। কিন্তু ৭ অক্টোবরের হামলার পর শুরু হওয়া ইসরাইল-হামাস যুদ্ধ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে জটিলতা
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও উপসাগরীয় দেশগুলো কিছু বিষয়ে সাধারণত ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী। যদিও এর অর্থ এই নয় যে আমিরাত কোনো ঝুঁকি নেয় না। ইয়েমেন, লিবিয়া, সুদান, হর্ন অব আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলে দেশটি বিভিন্ন পররাষ্ট্রনীতি উদ্যোগে জড়িয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের কিছু বিষয়ে আমিরাত হতাশও হয়েছে।
আমির বারাম বলেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধ এই অঞ্চলের প্রতিটি পক্ষের কাছে ইরানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মূল্য আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। এর ফলে ভারত থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে গ্রিস ও সাইপ্রাস পর্যন্ত একটি বৃহত্তর জোট গড়ে তোলার অভিন্ন স্বার্থ তৈরি হয়েছে।
বারামের মতে, ইরান তার সামরিক সক্ষমতা আরও দ্রুত বাড়াতে পারে। তাই তিনি ইসরাইলকে ‘একটি নতুন আঞ্চলিক কাঠামোর’ মাধ্যমে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে ইসরাইলের কৌশলগত মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশ।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বহু বছর ধরেই এমন উদ্যোগের পক্ষে কথা বলে আসছেন। তিনি ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ ধারণা তুলে ধরেছেন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মাধ্যমে ইসরাইল ও ভারতকে সংযুক্ত করার একটি কাঠামোর কথাও বলেছেন।
তবে ইসরাইলের নেতৃত্বের জন্য বড় সমস্যা হলো, ৭ অক্টোবরের আগের সময়ে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই বদলে গেছে।
রিয়াদ চায়, ইসরাইল আরও মধ্যপন্থী রাজনীতি অনুসরণ করুক এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত হোক। পশ্চিম তীরে সহিংসতা, সিরিয়ায় হামলার বিষয়ে ইসরাইলি কর্মকর্তাদের হুমকি কিংবা ভবিষ্যতে মিসরের মতো ‘সুন্নি’ শক্তির সঙ্গে ইসরাইলের সংঘাতে জড়ানোর আলোচনা, কোনোটিই রিয়াদ ভালোভাবে দেখছে না। গাজায় ‘বসতি’ স্থাপনের আলোচনা নিয়েও রিয়াদ সম্ভবত বিরক্ত।
ফলে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অঞ্চল হয়ে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য করিডর গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে, যদি ইসরাইলি নেতারা বাণিজ্যের চেয়ে সংঘাতকে বেশি গুরুত্ব দেন। সেক্ষেত্রে রিয়াদ জর্ডান, সিরিয়া ও তুরস্ক হয়ে কিংবা অন্য কোনো পথে বাণিজ্য করিডর পরিচালনার পথ বেছে নিতে পারে।
আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সামরিক জোট নয়
ইসরাইলের আঞ্চলিক কৌশলের ক্ষেত্রে এটিই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের পর নেগেভ ফোরাম, আই২ইউ২ এবং এন৭ উদ্যোগের মতো আঞ্চলিক ধারণাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, এসবের ভিত্তি হলো স্থিতিশীলতা, একীভূতকরণ ও শান্তি। এগুলো কোনো সামরিক জোট নয়।
এখানেই গ্রিস-সাইপ্রাসের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক এবং উপসাগরীয় দেশ ও ভারতের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ভারত ও উপসাগরীয় দেশগুলো কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে চায় না।
অন্যদিকে তুরস্ক নিয়ে উদ্বেগ থাকায় গ্রিস ও সাইপ্রাস প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি আগ্রহী হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রেও তাদের ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতি বিবেচনায় রাখতে হবে।
আমির বারাম প্রতিটি দেশ এই সম্পর্ক থেকে কী প্রত্যাশা করে, তা গভীরভাবে বোঝার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ইসরাইলের দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান মার্কিন নীতিকে বিচার করার সামর্থ্য তাদের নেই। ইসরাইলে কেউ কেউ ওয়াশিংটনের নীতিকে দুর্বলতা বা ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলেও যুক্তরাষ্ট্রে এটিকে পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক মনোযোগের যুগে ঠান্ডা মাথায়, হিসাব করে ও বাস্তবসম্মত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, পার্থক্যটি হুমকি বোঝার ক্ষেত্রে নয়, অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে। ইসরাইলের কাছে ইরান অস্তিত্বের জন্য হুমকি। আর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এটি দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্বেগ চীন ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল।
নতুন নিরাপত্তা-অর্থনৈতিক ফ্রন্টের প্রস্তাব
বারামের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতি ইরানের হুমকি ভারত থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে গ্রিস ও সাইপ্রাস পর্যন্ত একটি বৃহত্তর জোট গঠনের অভিন্ন স্বার্থ তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, ইসরাইলের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, প্রমাণিত সামরিক অভিজ্ঞতা ও প্রতিরক্ষা খাতে উদ্ভাবনের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর আর্থিক শক্তি যুক্ত হলে নতুন একটি নিরাপত্তা-অর্থনৈতিক ফ্রন্ট তৈরি করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, কৌশলগত অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের অংশীদারিত্বের বিকল্প নয়। তবে এটি ইসরাইলকে কৌশলগতভাবে আরও স্বাধীনভাবে কাজ করার এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ দেবে। পাশাপাশি ইসরাইলের কৌশলগত ভিত্তিও বহুমুখী হবে।
বারামের এই কৌশলগত আলোচনায় বড় চিত্রের পাশাপাশি অন্যান্য দেশ কী চায় এবং তারা পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
জেরুজালেমের কিছু রাজনীতিকের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ইসরাইলকে ভবিষ্যতে একাধিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে, এমন একটি চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। ‘সুন্নি’ দেশগুলো, সিরিয়া, মিসর ও তুরস্কের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর কথাও বলা হচ্ছে। এসব বক্তব্য ইসরাইলের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূমিকার জন্য সহায়ক নয়।
বেশির ভাগ দেশই অনন্তকাল ধরে চলা যুদ্ধে জড়াতে চায় না। একইভাবে তারা ইসরাইলের ‘সুপার-স্পার্টা’র সঙ্গে অংশীদারিত্বও চায় না।
তারা হয়তো এথেন্সের মতো একটি অংশীদারকে পছন্দ করবে, তবে সেই এথেন্স, যুদ্ধের আগের এথেন্স। সেই সময়ের এথেন্স, যখন তার নেতারা দেশটিকে ধ্বংসাত্মক পেলোপনেশীয় যুদ্ধে জড়িয়ে দেননি।
যুদ্ধের আগে এথেন্সের কৌশল মোটামুটি সঠিক ছিল। যুদ্ধের পর এথেন্সের পতন ঘটে। সময়ের সঙ্গে স্পার্টাও কার্যত হারিয়ে যায়। বৃহত্তর কৌশল নিয়ে যারা চিন্তা করেন, তারা নিশ্চয়ই ইসরাইলের ভবিষ্যৎকে এমন দেখতে চাইবেন না।
ইসরাইলের জন্য বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল হলো পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত সম্পর্ক গড়ে তোলা। যুক্তরাষ্ট্রও এসব বিষয়ে কাজ করছে, লিবিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগসহ অন্যান্য বৈশ্বিক ইস্যুতেও। তাই ইসরাইলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করা লাভজনক, আঞ্চলিক সংঘাত আরও বাড়ানো নয়।











