ইসলামী চিত্রকলা আর ভাস্কর্যের ধারণা

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

পিনাকী ভট্টাচার্য


সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গন থেকে দেবী থেমিসের অপসারনের দাবীর সুবাদে ইসলামী চিত্রকলা আর ভাস্কর্যের ধারণা নিয়ে আলাপ

হেফাজত সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গন থেকে গ্রীক দেবী থেমিসের মুর্তি অপসারন চেয়েছে। হেফাজত মহাসচিব খুব স্পস্টভাবে বলেছেন,  এই ভাস্কর্যের বিরোধিতা করলেও আমরা স্থাপত্যকলা ও শিল্পকলার বিরুদ্ধে নই”। খুব ইন্টারেস্টিং একটা বোঝাপড়ার মুখোমুখি হয়েছি আমরা। হেফাজত একটা বিশেষ ভাস্কর্যের অপসারন চাচ্ছে আবার সেইসঙ্গে বলছে, তাঁরা স্থাপত্যকলা ও শিল্পকলার বিরুদ্ধে নয়।

থেমিস নিয়ে হেফাজতের প্রথম আপত্তি। থেমিসকে শাড়ি পরিয়ে বঙ্গীয় করা হয়েছে। সুপ্রীম কোর্টের এই পরিবর্তিত থেমিসের ভাস্কর্য যে ভাবের উদয় ঘটায়, তা নিশ্চিতভাবেই সেই প্রিজামশন বা আগাম অনুমানের উপরে দাড়িয়ে থাকবে যে, আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিতে কোন ন্যায়, বিচার বা আইনের ধারণা কিংবা ইতিহাস নেই। আমাদের বিশ্বাস বা ঈমানের কোন মূল্য নাই; যা এই কোটি কোটি মানুষের কাছে আইন, নীতিনৈতিকতা ও সামাজিক বিধিবিধান উৎপত্তির ক্ষেত্র ও মানদন্ড হতে পারে। গ্রিক দেবিই আমাদের একমাত্র আরাধ্য। ন্যায় বা আইনের পশ্চিমা ধারণা এটাই একমাত্র সহি, আমরা সেটাকে অনুকরণ করতে পারি মাত্র। পশ্চিমা ন্যায়, আইন ও বিচারের সেই চিন্তা আর ঐতিহ্যকে কেবল আমাদের মাপে কেটেছেটে নেয়াটাই আমাদের কাজ। এই অনুমান ছাড়া এই ভাস্কর্যের আর কোন বার্তা নেই। আসলে এই ধারণা শুধু কলোনিয়াল ভাবাদর্শ বললে কম করে বলা হবে। এটা শুধু কলোনিয়াল নয়, এটা আপন ইতিহাস আর ঐতিহ্যের প্রতি চরম অপমান।

সাধারণভাবে ইসলাম বিদ্বেষীরা এমন প্রচারণা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করে যে, ইসলাম শিল্পকলার বিষয়েই খড়গহস্ত। তাই সুযোগ পেলেই ভাস্কর্য উৎখাতের কাজে নামে। যারা এই প্রপাগান্ডায় নামেন তাদের জন্য আগাম হেফাজত পরিষ্কার বক্তব্যে হুঁশিয়ারী দিয়ে রেখেছে যে তারা স্থাপত্য ও শিল্পকলার বিরোধী নন।

ইসলামের দিক থেকে মানুষ, জীবজন্তু বা যে কোন প্রাণ কোন প্রকার (ছবি, অক্ষর ইত্যাদি) চিহ্নব্যবস্থায় প্রতিফলন ঘটানো বা তাকে নিছকই মূর্তি করে তুলে সৃষ্টবস্তুর মূল সত্তাকে গৌণ করে ফেলার বিরুদ্ধে ইসলাম আপত্তি জানায় এটা সত্য। কিন্তু এই আপত্তি তো আর এমনি এমনি আসেনি, তাঁর পিছনের শক্ত দার্শনিক তর্কটা কী?

সেই জটিল ও গভীর তর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকে হচ্ছে, নিরাকার ধারণা। ইসলামে নিরাকার বা আল্লাহর নিরাকার ধারণা একটা ফান্ডামেন্টাল বিষয়। এটা একেবারেই মৌলিক ধারণা, মানুষের চিন্তা, ভাব, দর্শনের জট খুলবার জন্য খুবই মৌলিক ও সিরিয়াস বিষয় । ধর্মতত্ত্বের পরিমণ্ডলে এই তর্কটা ‘বিশ্বাস’ হিসাবে রয়েছে বলে এর তাৎপর্য নিয়ে আমরা যথেষ্ট ভাবি না। অজান্তে অজ্ঞতায় সেই গুরুত্বপুর্ণ দিক যাতে মানুষ হারিয়ে না ফেলে তা থেকে সাবধান থাকতেই ছবি তোলা বা না তোলার, আকার দেয়া না দেয়ার প্রসঙ্গটা বারবার বিধান হিসাবে আসে, সেই বিধানের পিছনের অনুমান বা চিন্তার ক্ষেত্রগুলো বিশেষ পর্যালোচনা করা হয় না।

আকার দিয়ে নিরাকারের ধারণা ধরা যায় নাঃ

আকার দিয়ে নিরাকারের ধারণা ধরতে গেলেও তা ‘অধরা’ই থেকে যাবে। কারণ তখনও আকারের নেতি বা উল্টা সত্তা হিসাবেই নিরাকারের চিন্তা করা হয়, হেগেলের ভাষায় আকার’-এর মধ্যস্থতায় নিরাকারের হাজির হওয়াতবু মানুষ আকার, আইকন, চিহ্ন করে, করে ফেলে। করতেই হয়। নইলে কোন ‘ভাব’ সে প্রকাশ করতে পারে না। ভাবের বিষয় ও তার প্রকাশের উপায়ের মধ্যে ফারাক/বিরোধ থেকেই যায়। কোন কিছু বুঝতে নেবার প্রচেষ্টার প্রথম মুহূর্ত থেকেই এই স্ববিরোধটা ঘটে। আকার/নিরাকারের তর্ক তাহলে কোন বিষয়কে আন্তরিক ভাবে উপলব্ধির তর্কের সঙ্গে জড়িত, স্রেফ প্রকাশের মামলা নয়।

হেগেলের চিন্তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে, ইসলাম দাবি করে নিরাকারকে কোন মধ্যস্থতা ছাড়া চিন্তা করবার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে ইসলাম আমরা মানি বা না মানি এই প্রস্তাবের দার্শনিক গুরুত্বকে যতো হাল্কা আমরা গণ্য করি, ব্যাপারটা মোটেই হাল্কা ব্যাপার নয়। ইউরোপ এই দার্শনিক সমস্যার সমাধান এখনো করতে পারেনি। আর ইউরোপ মধ্যস্ততা ছাড়া চিন্তা করার মুরোদ এখনো অর্জন করতে পারেনি। ‘উপলব্ধি’ স্রেফ প্রকাশের মধ্য দিয়ে ঘটে না, ইসলাম এই সংশয় ও সন্দেহ দর্শনে জারি রাখতে পেরেছে। নিরাকার উপলব্ধির বিষয়। তাকে যুক্তি, ভাষা, ছবি, চিত্রকলায় ‘প্রকাশ’ করবার বিষয় নয়।

আরেকটু খোলাসা করবার জন্য আপাতত “বিশেষ” আর “সামান্য “নিয়ে কিছু কথা বলা যাকঃ

যেমন ফুল যে একটা বিমুর্ত বা এবস্ট্র্যাক্ট ধারণা আমরা অনেকেই হয়ত খেয়াল করিনি। খেয়াল হবে – যদি কাউকে বলি, আমাকে একটা ফুল এনে দেন দেখি। নিশ্চয় সে আনবে জুই, জবা, গন্ধরাজ, দোপাটি, চাঁপা, বোগেনবোলিয়া অথবা রজনীগন্ধা বা আরও কোন দামী কিছু। আমি এক এক করে সব ফিরিয়ে দিব আর বলতে থাকব, ওটা তো জুই, ওটা তো জবা,……..ওটা তো রজনীগন্ধা। আমি শুধু ফুল চাই, কেবল ফুল – যেটা জুইও নয়, জবাও নয়,…… রজনীগন্ধাও নয় – কেবল ফুল চাই আমি।

আমি জানি কেউ আমাকে ফুল এনে দিতে পারবে না, পারে না। কারণ, বাস্তবে really ফুল বলে কিছু নাই; আছে কেবল জুই, জবা, গন্ধরাজ, দোপাটি, চাঁপা, বোগেনবোলিয়া অথবা রজনীগন্ধা বা আরও সব নাম না জানা। কিন্তু তবু ফুল আছে; আছে বিমুর্ততায়, আমাদের ভাবের মধ্যে। “ফুল’ ধরনাটাই একটা এবস্ট্র্যাকশন।

ফুল বললে আমরা আমরা বুঝতে পারি, কী নিয়ে কথা বলছে। কিন্তু “ফুল” বলে কোন বিশেষ বিষয় নাই। “ফুল বলে একটা নির্বিশেষ বা ‘সামান্য’ বা ইংরেজিতে যাকে বলে ইউনিভার্সেল ধারণা, সেটা আছে।

এখন সেই বিমুর্ত ফুলকে আবার মূর্ত করে ভাস্কর্যে এনে, মুর্ত করে প্রকাশ করে দেখাতে কাউকে যদি বলি তবে সে কী করবে? কারণ আগেই বলেছি দেখানো মানে রূপ ও আকার-সহ তাকে স-আকার বা সাকার করতে মুর্ত করতে একটা মুর্তি লাগবে; একটা বাস্তব, সত্যি (real), কিছু না হলে সে “দেখাবে” কী করে? আবার আরও কথা আছে। যে সে দেখানো হলে চলবে না; মানে তা যেন আবার দেখে জুই, জবা, গন্ধরাজ, দোপাটি, চাঁপা, বোগেনবোলিয়া অথবা রজনীগন্ধা বা আরও সব নাম না জানা কারও মত হলে হবে না – বিমুর্ত, ভাবকে ফুলকে মুর্ত প্রকাশ করে দেখাতে হবে, ভাস্কর্যে। মানুষের চোখে তা দেখে আবার যেন কোন সুনির্দিষ্ট জুই, জবা, গন্ধরাজ, দোপাটি…. ইত্যাদির ভাবনা না আসে, অবশ্যই যেন বিমুর্ত ফুল মনে হয়, মানুষের মনে ফুলের ভাব আসতে হবে। কাজটা অতি কঠিন। আর এখানেই আসে মানুষের সম্ভাবনাকে অবারিত করে দেবার পথ। তার চিন্তাকে কল্পনাকে আকাশে পাখা মেলতে দেয়ার শর্ত।

ইংল্যাণ্ডে রক্ষিত ১৩ শতকের সিরিয়ার তৈরি পানপাত্রসমস্যার এখানেই শেষ নয়; বিমুর্ত ফুল ধারণা বা ভাবকে ধরে যখনই কোন না কোন রূপ ও আকার-সহ তাকে স-আকার বা সাকারে মুর্ত ভাস্কর্যে উপস্হাপনের চেষ্টা করা হবে তখনই তা একটা – ফুলের একটাই রূপ বলে ধারণা তৈরি হবার সম্ভবনা তৈরি করবে। কিন্তু ফুল বলে তো একটা কোন কিছু নয় বরং সে তো বহু, প্লুরাল; জুই, জবা, গন্ধরাজ, দোপাটি, চাঁপা, বোগেনবোলিয়া অথবা রজনীগন্ধা বা আরও সব নাম না জানা – সকলেই সাধারণ বা বিমুর্ত নামে হলো ফুল। বিমূর্তের এই উপলব্ধিটুকু বিশেষে ঘটানো সম্ভব কিনা ইসলামের দিক থকে বিচার করলে সেটাই শিল্পকলা ও ভাস্কর্যের চ্যালেঞ্জ। ফলে ইসলাম ভাস্কর্য আর চিত্রকলার বিরোধী এটা বাজে কথা। বরং সেই চ্যালেঞ্জটাই বার বার ইসলাম স্মরণ করিয়ে দিতে চায়। যারা বিশেষকে সামান্য বলে চালায় ইসলাম তাদের বিরোধী, কারন এতে মানুষের শৈল্পিক ও নান্দনিক সম্ভাবনা খর্ব করার বিপদ তৈরি হয় এই সমস্যাটাই সবচেয়ে কঠিন ও জটিল। এককথায়, ভাস্কর যাই করুক তাঁর কাছে এর কোন আলটিমেট সমাধান নাই। তবু একটা আপাত বুদ্ধি সে করতে পারে। তাঁর বিমুর্ত ফুলের ভাস্কর্যে এমন কিছু থাকতে হবে, এমনভাবে গড়তে হবে যেন দেখে দর্শকের মনে একটা নয়, একের মধ্যে বহু, অনেক – এমন একটা ভাব আসে; অর্থাৎ একক ফুলের মুর্ত ভাস্কর্যে যেন বহু ফুলের জানা অজানা সম্ভবনার ইঙ্গিত থাকে। ইসলামী ভাস্কর্য আর চিত্রকলায় থাকে সেই অজানা নানা সম্ভাবনা। উদাহরণ হিসেবে আপনি এই শিল্পকর্মটি দেখতে পারেন, ফুল আর লতাপাতা খোচিত একটি পানীয় পাত্র। এই ফুল বা লতাপাতা আপনি বাস্তবের জগতে খুঁজে পাবেন না। এগুলো দেখলে ফুল লতাপাতা মনে হবে ঠিকই, ফুল লতাপাতার ভাব দেবে, কিন্তু বাস্তবের জগতের কিছু নয়।

ইংল্যাণ্ডে রক্ষিত ১৩ শতকের সিরিয়ার তৈরি পানপাত্র

আকার/নিরাকারের সম্পর্ক বিচার, ভাব/প্রকাশের উপায়ের দ্বন্দ্বসহ আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ তর্ক দর্শনের জগতে ইসলাম জারি রেখেছে ও রাখবে।

তাই গ্রিক দেবি থেমিসের ‘বিশেষ’ মূর্তি দিয়ে আপনি ইনসাফের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধারণার মাথায় লাথি মারবেন, যে সামান্য ধারণার উপলব্ধির ওপর বর্তমানের লড়াই ও আগামীর সম্ভাবনা নিহিত; আর আশা করবেন হেফাজত চুপ করে থাকবে, এটা আশা করা ঠিক না।

তাঁরা তাদের ঈমান আকিদার জায়গা থেকে বলুক, আমরা যেন তাদের আপত্তির মর্মটুকু বুঝি।