বিজয়-দিবস পালনের শূণ্যস্থান এবং কিছু কথা

বিজয়-দিবস পালনের শূণ্যস্থান এবং কিছু কথা

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী  |  লেখক ও গবেষক


মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

গতকাল পালিত হলো বাংলাদেশের ৪৭তম বিজয়-দিবস। এখনকার যে প্রজন্ম হল্লা করে বিজয়-দিবস পালন করছে তারা একাত্তর দেখে নি। ইতিহাস নামে ‘হাছামিছা’ যে সঙ্কলন বাজারে বিকাচ্ছে সেটা গিলেই ওরা ধরে নিচ্ছে এটা মুক্তিযুদ্ধ, ওটা স্বাধীনতা। আমাদের স্বাধীনতা-সংগ্রামের শুরু কোত্থেকে হলো, কিভাবে হলো–সে সবের কিছুই এ প্রজন্ম জানে না। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমাদের স্বাধীনতা-সংগ্রামের প্রারম্ভিক ইতিহাস এবং পরবর্তীধারার ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ হয়েছে মূলত জাতির মাঝে ঘাপটি মেরে থাকা সেক্যুলার ও বামপন্থীমহলের হাতে। ফলে তারা নিখাদ ইতিহাস রচনার চাইতে নিজেদের আদর্শনির্ভর ও দৃষ্টিভঙ্গীনির্ভর এমন এক ইতিহাস রচনা করার চেষ্টা করেছেন বেশি যা একটি নতুন-প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করতে পারে সহজে। হতে পারে তাদের নিয়তও ছিলো এমন যেন জাতি ইতিহাসের সত্যান্বেষী না হয়ে ইতিহাসের প্রভাবাধীন হয়ে যায়। এখানে তাঁদের রাজনীতিক মানসের প্রভাব অনস্বীকার্য। ভাষা-সৈনিক অলি আহাদ, আবুল মনসুর আহমদ, কমরুদ্দীন আহমদ, বদরুদ্দীন উমর, এম, আখতার মুকুল প্রমূখেরা যেসব ঐতিহাসিক বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন সেসব নিরপেক্ষতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হতে পারে নি। হ্যা, অবশ্যই তাঁরা অনেক অজানা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন যা আমাদের পুষ্টিসমৃদ্ধ খোরাকের উসিলা হবে নিঃসন্দেহে।

ডানপন্থী বলে খ্যাত যে মহলটি সমাজে বিচরণ করে ইতিহাস রচনায় তাঁদের ভূমিকা নিতান্ত গৌণ। কিন্তু কেন তাঁদের এমন ভূমিকা তা এ মুহূর্তে আমার জানা নেই। এর একটি কারণ হতে পারে, তৎকালীন রাজনীতিক অঙ্গনে ডানপন্থীদের গৌণ ভূমিকা। আরেকটি কারণ হতে পারে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সমকালীন ইতিহাস তুলে দেবার দায় অনুভবে ব্যর্থতা। যেমন, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন তার জাতীয়তাবাদী দল গঠন করলেন দেখা গেলো সেখানে যারা যোগ দিয়ে ডানপন্থী-খাতায় নাম লেখান তারা প্রায়ই ছিলেন তৎকালীন বাম মতাদর্শী ছাত্র ইউনিয়নের প্রাক্তন নেতা-কর্মী। বিএনপি-নেতা মরহুম আনোয়ার জাহিদ, মরহুম কে এম ওবাইদ উর রহমান, বর্তমান ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ প্রমূখের নাম উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীতে জনাব মওদুদ আহমদ অবশ্য কিছু ইতিহাস রচনায় মনযোগী হয়েছিলেন যা সঠিক ইতিহাস অন্বেষণে বিশেষ ভূমিকা রাখার দাবিদার। মাজলূম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনীতিক অনুসারিদের মধ্যে যাঁরা দু-চার কলম লিখেছেন তাঁরাও ছিলেন বামপন্থী ধারা কর্তৃক প্রভাবিত যদিও সে ধরনের ভাবাদর্শ মাওলানা ভাসানীর কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারে নি। তবে ১৯৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় সরকারের সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত হয়ে ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র’ নামে যে বিশাল সঙ্কলন প্রকাশিত হয় তা ছিলো বাংলাদেশের ইতিহাস রচনা ও চর্চার জন্য এক কালজয়ী পদক্ষেপ। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সেখানে বেশ বিকৃত তথ্যের প্রবেশ ঘটিয়ে আওয়ামীকরণের চেষ্টা করা হয়।

বাকি রইলো ইমলামপন্থীদের ভূমিকা। ইতিহাস রচনায় তাঁদের ভূমিকা নেই বললেই চলে। এখানেই ঘটেছে জাতির সবচেয়ে বড়ো দুর্ঘটনা। বিভিন্ন পন্থীতে ভারাক্রান্ত যখন জাতির ইতিহাস রচনার সৌভাগ্যময় অধ্যায় তখন ইসলামপন্থী লেখক-সমাজ পুরোপুরি ব্যর্থ থেকেছেন জাতির কাছে সঠিক ইতিহাস জানানোর কর্তব্য হতে। আমার মনে হয়, যদি দেশের ইসলামপন্থী লেখক-সমাজ বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাস সঙ্কলনে আগ্রহী হতেন তবে জাতি এমন অনেক কিছুর সন্ধান পেতো যা সেক্যুলার ও বামপন্থী ঘরানার ইতিহাসে কখনো মিলবে না। নিশ্চয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস এতে অনেক সমৃদ্ধ হতো। আগামী প্রজন্মও পেতো সঠিক তথ্য-উপাত্ত।

বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতির দায়ভার সবচেয়ে বেশি সেক্যুলার আওয়ামী ঘরানার উপর। আওয়ামী আমলে যতো বেশি ইতিহাস বিকৃতির ঘটনা ঘটেছে অন্য কোন সময় তেমন ঘটে নি। চরিত্রগত দিক থেকে আওয়ামী লীগ নিখাদ একটি স্বেচ্ছাচারী ও ফ্যাসিবাদী দল। সঠিক হলেও অন্যকে প্রাধান্য দিতে হয়, অন্যের মতামতকে সম্মান জানাতে হয়, স্বীকার্য হলে মেনে নিতে হয়–এমন মানসিক উদারতা আওয়ামী লীগ কখনও অর্জন করতে পারে নি। যেমন ধরা যাক, আমাদের ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা-সংগ্রাম সবখানেই মাযলূম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী রহ.-এর নেতৃস্থানীয় ভূমিকা ইতিহাস-স্বীকৃত। আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা তিনিই যা পরে আওয়ামী লীগে পরিবর্তিত হয়। অথচ আওয়ামী লীগ আজ মাওলানা ভাসানীর নাম পর্যন্ত মুখে নিতে নারাজ। তারা চেনে কেবল শেখ মুজিবুর রহমানকে যেনো পৃথিবীর তাবৎ আন্দোলন ‘বঙ্গবন্ধু’র নেতৃত্বে হয়েছিলো। আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী ঘরানার লেখকবৃন্দ সবসময় চেয়েছে ইতিহাসকে আওয়ামীকরণ করতে। ফলে জোরদার হয় ইতিহাস বিকৃতির বিভৎস পথের। আজকে সাতচল্লিশতম বিজয়-দিবসে তিক্ত তথ্যসন্ত্রাসের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বিজয়-দিবসের এমন শূণ্যতার কথা বারবার অনুভুত হচ্ছে।

আজকাল বিজয়-দিবস পালনে বিকৃতধারা আর অবক্ষয় নযরে পড়ছে প্রকটভাবে। নতুন প্রজন্ম মনে করছে, গায়ে জাতীয় পতাকা জড়িয়ে এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়ালে, নিছক কিছু আনন্দাবেগে উচ্ছ্বাসিত হলে বুঝি বিজয়-দিবস পালিত হলো; মাথায় লাল-সবুজ বর্ণের পট্টি লাগিয়ে র্যালি করলে ১৬ই ডিসেম্বরের সার্থকতা পকেটে পুরলো। বর্তমান আওয়ামী আমলে দেখছি হিন্দি গান বাজিয়ে বিজয়-দিবস পালন করতে। মনে হয়, মহান ১৬ই ডিসেম্বরে পাকিস্তানী সেনাদের বিরুদ্ধে বাংলার সুক্তিসেনাদের বিজয়ের সাথে ১৯৭১-এ পাক-ভারতযুদ্ধের তাৎপর্য যে সমানে সমান সেটা বোঝাতে চাইছে আওয়ামী-প্রজন্ম। গত শুক্রবার( ১৫ই ডিসেম্বর) সকালে ঢাকায় যে ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটলো সেটা যে উক্ত ‘ভারত-পাকযুদ্ধে’র কুৎসিৎ পরিভাষার আড়ালে ভারতীয় আধিপত্যবাদের সুপরিকল্পিত আঘাত তা আওয়ামী শাসকমহল না বুঝলেও জাতির সচেতন প্রজন্ম ঠিকই বুঝে নিয়েছে। সেদিন জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে বিজয়-দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ও ভারতীয় দূতাবাসের যৌথ আয়োজনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাবেক ভারতীয় উইং কমান্ডার ডিজে ক্লে ভিএম ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে নিছক পাক-ভারতযুদ্ধ বলে মন্তব্য করেন যা উপস্থিত দর্শক ও শ্রোতাদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সরকারের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক। সেখানে ভারতের তৎকালীন প্রতিরক্ষা-বাহিনীর উর্দ্ধতন কর্মকর্তাবৃন্দও উপস্থিত ছিলেন। শুধু তাই নয়, অনুষ্ঠানের পরে মি. ডিজে ক্লে তার বক্তব্যকে নির্ভুল বলে দাবিও করেন এক সাংবাদিকের কাছে। ভারতীয় সাবেক উইং কমান্ডার ডিজে ক্লে’র এমন ঘৃণার্হ বক্তব্যের জবাবে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী যা বললেন তা রীতিমত দাসসুলভ বলে মনে হয়েছে। মন্ত্রী উচ্চারণ করলেন: “বিনয়ের সাথে বলতে চাই” এরপর–“আমি একটু(!) কষ্ট পেয়েছি।” বাহ, চমৎকার! ওরা আমার মায়ের কাপড় খুলে নিচ্ছে আর সন্তান হয়ে আমি বলছি “বিনয়ের সাথে” এবং “আমি একটু কষ্ট পেয়েছি।” এই কি দেশপ্রেম! এই কি মহান বিজয়-দিবসের বিজয়ের ধ্বনি? এই কি ১৬ই ডিসেম্বরের মানচিত্রের স্বাধীনতা? ওরা এখানে এসে আমাদের স্বাধীনতার
অপমান করলো, আমাদের বিজয়কে অস্বীকার করলো–কৈ মুক্তিযুদ্ধের পৈত্রিক ঠিকাদারেরা কোথায় ছিলো তখন? শেখ হাসিনার তর্জন-গর্জন বন্দী হলো কোথায়? এটা যদি আজ পাকিস্তানী দূতাবাস থেকে বলা হতো তবে দেখা যেতো আওয়ামীমহল বিদ্যুৎ বেগে পাকিস্তানের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানাতেন। শরৎচন্দ্র ঠিকই বলেছিলেন–” তুই মেরেছিস কলসির কানা তাই বলে কি প্রেম দেব না?” রতনে রতন চেনে। বুঝে নিলাম যারা নিজেরাই ইতিহাস বিকৃত করে তারা আবার তাদের প্রভুদের ইতিহাস-বিকৃতির প্রতিবাদ করবে কেমন করে? আমাদের জাতীয়তাবাদী শক্তিকেও খুঁজে পাওয়া গেলো না ভারতীয় সেনার এমন অসম্মানজনক বক্তব্যে। এভাবেই পরিকল্পিতভাবে বিকৃত করা হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস।

বলছিলাম, বিজয়-দিবস পালনে বিকৃতি আর অবক্ষয়ের কথা। আমরা আজও শিখলাম না বিজয়-দিবস পালনের মূল সার্থকতা কোথায়? ক’দিন আগে ইউটিউবের একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখছিলাম কম্পিউটারে। এর নাম War in Afganistan without end. প্রামাণ্যচিত্রটি তৈরি হয়েছে আফগানযুদ্ধের উপর। আর তৈরি করেছে বিবিসি। প্রায় এক ঘণ্টা দীর্ঘ প্রামাণ্যচিত্রের মাঝামাঝিতে ভাষ্যকার এক গুরুত্বপূর্ণ কথা বললেন। তিনি বললেন: আমি যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে যতোবারই আফগানিস্তানে এসেছি ততোবারই দেখেছি আফগানীদের অন্তরে, মানসিকতায় বিদেশী সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার প্রত্যয়ে কোন প্রকার ভাটার টান পড়ে নি। আমি দেখেছি, তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে তারা যুদ্ধে বিজয়ী জাতি। তারা বৃটিশদের বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছে, পরাশক্তি রাশিয়াকে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে আর এখন আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়ছে। তারা কোন বিদেশী প্রভাবকে আফগানিস্তানে ঢুকতে দিতে নারাজ। ভাষ্যকারের কণ্ঠে আমি যখন কথাগুলো শুনছিলাম মনে হচ্ছিলো এই মর্মকথাগুলিই আসলে আমাদের মহান বিজয়-দিবসের সার্থকতার নির্যাস।অন্যায়-আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে যদি আফগানীরা যুগযুগ ধরে মানসিক প্রশিক্ষণ নিতে পারে তবে আমরা কেন বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং সর্বোপরি একাত্তরের বিজয়কে আত্মস্থ করে মানসিক প্রস্তুতি নিতে পারবো না? আজ ভারতীয় বিজয়ের বাস্তবতাবর্জিত তথ্যসন্ত্রাসের কবল থেকে কেন উদ্ধার করতে পারবো না আমাদের ইতিহাসকে? আমরাও তো যুদ্ধের জাতি। মাথায় আর গায়ে লাল-সবুজ কাপড় প্যাঁচিয়ে বিজয় পালনের এই হীনতম রীতির দাফন হোক আমাদের অন্তর থেকে। ফ্যাশন নয়, প্রকৃত যুদ্ধে জয়ের আবেগ নিয়ে চলতে চাই আগামীর পথ। আগামী প্রজন্মের হাতে এই উপহার তুলে দিয়ে শুরু করতে চাই দেশরক্ষা আর দেশগড়ার সংগ্রাম।