ভারত বিশ্বের মধ্যে অস্থিতিশীলতা, বর্বরতা ও সহিংসতা সৃষ্টির প্রধান জন্মদাতা দেশ হতে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের সংখ্যালঘু বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক ফার্নান্দ ডি ভ্যারেন্স। এছাড়াও দেশটিতে ক্রমবর্ধমান উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
গত বুধবার (২০ সেপ্টেম্বর) ওয়াশিংটন ডিসিতে ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডমের শুনানিতে (ইউএসসিআইআরএফ) এ বিষয়ে সতর্ক বার্তা দেন তিনি।
ফার্নান্দ বলেন, “বিশ্বের মধ্যে অস্থিতিশীলতা, বর্বরতা ও সহিংসতা সৃষ্টির প্রধান জন্মদাতা দেশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে ভারত। কারণ সেখানে ধর্মীয় ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে মুসলিম, খ্রিস্টান, শিখ ও অন্যান্যদের বিরুদ্ধে গুরুতর লঙ্ঘন ও অবমাননার ঘটনা ঘটেছে।”
তিনি আরো বলেন, “এটা স্থানীয় অথবা ব্যক্তিগত নয়, বরং এটি একটি নিয়মের মধ্যে দিয়ে ঘটছে যেটি ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের প্রতিফলন।”
ভারতের উপর কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রডোর অভিযোগের পরপরই ফার্নান্দের বক্তব্যটি এসেছে। যেখানে কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশের শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জারকে হত্যার জন্য ভারত সরকারকে দায়ী করেছেন ট্রডো।
এ হত্যাকাণ্ড ঘিরে কানাডার সঙ্গে ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এছাড়াও উভয় দেশ থেকেই পাল্টাপাল্টি বহিষ্কার করা হয়েছে কূটনীতিকদের। শুধু তাই নয় উভয় দেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি করেছে অটোয়া ও নয়াদিল্লি।
ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার কর্মীরা। তাদের অভিযোগ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো ভারতের অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়কে পাশ কাটিয়ে যেতে চাচ্ছে। কারণ তারা ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে কূটনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে চায়। ফলে চাপা পড়ে যাচ্ছে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়টি।
২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়া নরেন্দ্র মোদি নিজেই একজন উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের কট্টর সমর্থক। এছাড়াও ভারতীয় মুসলিম ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতা সৃষ্টি ও সমর্থনের অভিযোগ রয়েছে তার সরকারের বিরুদ্ধে।
২০২২ সালের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিবেদনে ভারতীয় মুসলিম ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান নির্যাতনের বিষয়টি উঠে আসে। যার কঠোর নিন্দা জানায় মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এছাড়াও গত বছর, ভারতীয় মুসলিম ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ব্যাপক নৃশংসতা ও বর্বরতা বৃদ্ধির ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করে মার্কিন হলকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়াম।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ব নেতা ও নাগরিকদের বিরুদ্ধে ঘৃণা মোকাবেলায় সহায়তার পাশাপাশি গণহত্যা প্রতিরোধ, মানব মর্যাদা বৃদ্ধি ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে কাজ করে থাকে।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরে ভারতীয় শাসন যেন উদ্বেগের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কারণ ২০১৯ সালে, কাশ্মীরকে আধা স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা দেওয়া ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে মোদি সরকার।
একই বছর ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন পাস করে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। যার ফলে আবারো বিতর্কের মুখে পড়ে মোদি সরকার। ধর্মের উপর ভিত্তি করে নাগরিকত্ব দেওয়া এ আইনের সমালোচনা করেন মানবাধিকার কর্মীরা। তাদের দাবি এমন আইনের মাধ্যমে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের লংঘন করেছে সরকার।
একই সাথে ভারতীয় খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের আক্রমণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানিয়েছে ধর্মীয় অধিকার কর্মীরা।
অনুষ্ঠানে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভারতের মণিপুর রাজ্যের একটি ভিডিও উল্লেখ করেছেন ফার্নান্দ। ভিডিওটিতে দেখা যায় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের দুই নারীকে নগ্ন করে পুরো গ্রামের রাস্তায় হাঁটাতে বাধ্য করছে একদল লোক।
এ বিষয়ে ফার্নান্দ বলেন, কুকি সম্প্রদায়ের এ দুই খ্রিস্টান নারীকে উলঙ্গ করে রাস্তায় হাঁটানো, মারধর ও গণধর্ষণ করা হয়েছিল।
তিনি আরো বলেন, এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চোখে না পড়া পর্যন্ত আশ্চর্যজনকভাবে এর বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ।
জনসংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বের প্রথম দেশ ভারতে ২০২৪ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে সতর্ক করে ফার্নান্দ বলেন, নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে ভারতীয় মুসলিম ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি মানবাধিকার কর্মীদের পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে চলেছে।
তিনি বলেন, “সংখ্যালঘু নির্যাতনের সাথে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়নি ভারতীয় সরকার। এছাড়াও সমালোচনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিবর্তে অহংকার ও আইনের শাসনের সাথে গঠনমূলকভাবে জড়িত নয় দেশটির সরকার।”
তিনি আরো বলেন, “কিছু সিনিয়র নেতা চুপ থেকেছেন অথবা প্রকৃতপক্ষে অবদান রেখেছেন, তাদের নিজেদের বক্তব্যের দ্বারা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে।”
ইউএসসিআইআরএফের চেয়ারম্যান আব্রাহাম কুপার দাবি করেছেন, বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতা পালনের ক্ষেত্রে অবনতি ঘটেছে।
তিনি বলেন, “ভারতে মুসলিম, শিখ, খৃষ্টান, দলিত ও আদিবাসীদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত আক্রমণ ও ভয়-ভীতি দেখানোর মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে।”
গত মে মাসে ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতা গুরুতরভাবে লঙ্ঘন হচ্ছে বলে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে “ইউএসসিআইআরএফ”। তবে তাদের প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
উল্লেখ্য; ১৯৯৮ সালে আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা আইনের (আইআরএফএ) অধীনে গঠিত হয় “ইউএসসিআইআরএফ”। এটি একটি স্বাধীন ও দ্বিদলীয় সংস্থা যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে বিভিন্ন উপদেশ ও সুপারিশ করে থাকে। যদিও এর সুপারিশগুলো গ্রহণ করতে বাধ্য নয় মার্কিন সরকার।
সূত্র : মিডল ইস্ট আই এবং দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস











