শুক্রবার | ৬ ফেব্রুয়ারি | ২০২৬
spot_img

মাওলানা মামুনুল হকের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা

একটি ন্যায়-ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক ইসলামি সুশাসনের নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। ছয়টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে ইশতেহারে ২২ টি প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়েছে।

শুক্রবার (৬ জানুয়ারি) বেলা ১১ টায় পুরানা পল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই ইশতেহার ঘোষণা করেন দলটির আমির মাওলানা মামুনুল হক।

ইশতেহারের ভূমিকা পাঠ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস বিশ্বাস করে-বাংলাদেশ কেবল একটি ভৌগোলিক রাষ্ট্র নয়; এটি ঈমান, সংগ্রাম ও ন্যায়বিচারের ইতিহাসে গড়ে ওঠা এক মহানজনপদ। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি-ন্যায়বিচার ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়, মানবিকতা ছাড়া শান্তিআসে না এবং দুর্নীতিবাজ ও জালিমদের আশ্রয়দাতা রাষ্ট্র কখনো জনগণের সুখ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। একটি প্রকৃত কল্যাণ-রাষ্ট্র সেইরাষ্ট্র, যেখানে আল্লাহভীতি পূর্ণ সুশাসন প্রতিষ্ঠিত, মানুষের ইজ্জত ও মর্যাদা সুরক্ষিত এবং দুর্নীতি, মাদক, চাঁদাবাজি ও সকল অনাচারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান হবে শূন্য সহনশীলতার।

তিনি আরও বলেন, আমরা রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়; বরং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির পক্ষে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদে উত্থাপিত রাষ্ট্র সংস্কারের ন্যায্য দাবিগুলোকে আমরা সমর্থন করি এবং এর বাস্তবায়নে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। পবিত্র-কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে, শহিদদের ত্যাগকে পথচিহ্ন করে এবং জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে-২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস একটি ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক ইসলামী সুশাসনের নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার পেশ করছে।

ইশতেহারের প্রথম অধ্যায়ে বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের অবস্থান স্পষ্ট-শুধু সরকার পরিবর্তন নয়; প্রয়োজন, গুম-খুন-দুর্নীতির রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান। সত্য ও ন্যায়ভিত্তিক বিচার এবং ইসলামী-নীতি ও মানবিক মূল্যবোধের আলোকে মৌলিক রাষ্ট্রীয় সংস্কার। প্রতিশোধনয়-সত্য, ইনসাফ ও জবাবদিহিতাই হবে আগামীর বাংলাদেশ।

দ্বিতীয় অধ্যায় অগ্রাধিকারমূলক ছয়টি কর্মসূচি তুলে ধরা হয়। সেগুলো হলো-

১. সুষমউন্নয়ন ও নাগরিক-জীবনের মৌলিকঅধিকার

অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও ন্যায়বিচার-এই ছয়টি মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হলে নাগরিক জীবনে প্রকৃত শান্তি আসেনা। রাষ্ট্র এসব মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের পূর্ণ দায় গ্রহণ করবে ।

বর্তমান তথা কথিত উন্নয়ন ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি একটি শুভঙ্করের ফাঁকি, কারণ- জাতীয় আয়ের বড় অংশ একটি মুষ্টিমেয় শ্রেণীর হাতে কুক্ষিগত থাকে, অথচ অধিকাংশ মানুষ ন্যূনতম জীবনমান থেকেও বঞ্চিত। কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন বা গড় আয় বাড়ালেই নাগরিক জীবনে সুখ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস-সুষম-উন্নয়ন, অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য দূরীকরণ ও ন্যায্য সম্পদ বণ্টনের সমন্বয়ে কল্যাণ-রাষ্ট্র গড়ে তুলবে-যেখানে প্রতিটি নাগরিক উন্নয়নের বাস্তব সুফল অনুভব করবে।

২. সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা

দুর্নীতির মূল কারণ কেবল নৈতিক অবক্ষয় নয়; অনিশ্চিত জীবন, নিরাপত্তাহীন ভবিষ্যৎ ও মৌলিক চাহিদার অভাবও এর বড় কারণ।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনে করে-রাষ্ট্রের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য মানসম্মত শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিত করা হলে দুর্নীতি দমন বাস্তবসম্মত হবে। জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, দলীয় প্রভাবমুক্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং ন্যায়ভিত্তিক মানবিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে- যেখানে আইন সবার জন্য সমান এবং ক্ষমতা হবে আমানত; শোষণের হাতিয়ার নয়।

৩. শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও জাতীয়-নিরাপত্তা

একটি স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তি, ঐক্য এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। প্রতিরক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রস্তুতির ঘাটতি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। তাই জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল সামরিক বিষয় নয়-এটিরাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক দায়িত্ব।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস একটি আধুনিক, দক্ষ ও পেশাদার প্রতিরক্ষাবাহিনী; দেশীয়-প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির বিকাশ এবং জাতীয় নিরাপত্তার একটি সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তৈরি করবে। আমাদের লক্ষ্য-বাংলাদেশ যেন কারো করুণা বা নির্ভরতার ওপর নয়, বরং নিজ শক্তি ও সক্ষমতার ভিত্তিতে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে।

৪. স্বাধীন, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বার্থভিত্তিকপররাষ্ট্রনীতি

দুর্বল রাষ্ট্রব্যবস্থা একটি দেশকে কূটনৈতিকভাবে নতজানু করে তোলে। সুষম উন্নয়ন, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ জাতীয় ঐক্য ছাড়া একটি স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হবে আত্মমর্যাদা, শক্তি ও জাতীয় ঐক্য।

আমরা এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করতে চাই, যেখানে জাতীয় স্বার্থ সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাবে; আধিপত্য নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান ও ন্যায়ের ভিত্তিতে মুসলিম বিশ্বসহ সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। বাংলাদেশ হবে শান্তিপ্রিয় রাষ্ট্র, কিন্তু দুর্বলনয়; স্বাধীন-রাষ্ট্র, কিন্তু বিচ্ছিন্ন নয়।

৫. সার্বজনীন, ঐক্যবদ্ধ ও নৈতিক-শিক্ষাব্যবস্থা

বর্তমান ত্রিমুখী শিক্ষাব্যবস্থা জাতিকে বিভক্ত করছে, যা জাতীয় ঐক্য ও স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর। দেশের ধর্মীয় ও আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় একটি সার্বজনীন জাতীয় শিক্ষাকারিকুলাম প্রণয়ন করা হবে। একইসঙ্গে কওমি মাদ্রাসাসহ সকল বিশেষায়িত শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নের জন্য স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষা কমিশন গঠন করা হবে। আমরা চাই-শিক্ষা হবে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি নৈতিক, দায়িত্বশীল ও দেশপ্রেমিক নাগরিক তৈরির ভিত্তি।

৬. কর্মসংস্থান ও তরুণদের জন্য আমাদের অঙ্গীকার

এই দেশ তরুণদের। আমরা চাই না আমাদের তরুণেরা বেকারত্ব, হতাশা বা অনিশ্চয়তায় দিন কাটাক। তাই তরুণদের জন্য আমরা চালু করব এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি-ধর্মী কর্মসূচি, যেখানে বছরে ন্যূনতম নির্দিষ্ট সময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা থাকবে। তরুণরা এগিয়ে এলে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে-এই দৃঢ় বিশ্বাস নিয়েই আমাদের পথচলা।

মামুনুল হক বলেন, এই ছয়টি অগ্রাধিকার-একটি অপরটির পরিপূরক। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস বিশ্বাস করে, এই সমন্বিত কর্মসূচিগুলো একটি ন্যায়ভিত্তিক, আত্মমর্যাদাশীল ও ইসলামী মূল্যবোধসম্পন্ন বাংলাদেশ গড়ার বাস্তব পথ।

ইশতেহারের তৃতীয় অধ্যায় অন্যান্য প্রতিশ্রুতি বা কর্মসূচি তলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে-ধর্মীয়পরিচয় ও রাষ্ট্রীয়-নীতি, কাদিয়ানী/আহমদিয়া সম্প্রদায় সম্পর্কিত নীতি, আজমতে সাহাবা ও আকীদাগত নীতি, অর্থনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ, কওমী শিক্ষাব্যবস্থা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, ওয়াকফ ও সামাজিক ন্যায়-বিচার, কৃষক, শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষ, নারী অধিকার ও শিশুসুরক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জলবায়ু, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহ, রেমিটেন্স ও প্রবাসী বাংলাদেশি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি, ঘুষ, দুর্নীতি ও অপচয়, পেশিশক্তি ও টেন্ডারবাজি, গুম, খুন ও অপহরণ, ধর্ষণ ও নারীনির্যাতন এবং ঋণ খেলাপি ও অর্থ পাচার বিষয়ে পরিকল্পনা।

ইশতেহারের পঞ্চম অধ্যায়ে বলা হয়েছে, আমরা শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকারভিত্তিক সমাজের পক্ষে। প্রতিটি নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও সম্মান সুরক্ষিত থাকবে এবং ধর্ম-বর্ণ-ভাষা-সমতল-পাহাড় নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার পাবে। রাজনীতিকে ব্যবসা নয়, আমানত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে। দলীয় লুটপাট ও স্বজনপ্রীতির অবসান ঘটিয়ে নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা হবে। প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। নারীর প্রতি কোনো বৈষম্য থাকবে না। শিক্ষা, ব্যবসা, চাকরি ও সামাজিক জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা হবে এবং দায়িত্ব ও মর্যাদার সুস্পষ্ট কাঠামো বজায় রাখা হবে।

মাওলানা মামুনুল হক বলেন, এই ইশতিহার আমাদের প্রতিশ্রুতি নয়-আমাদের ঈমানি দায়িত্ব। আমরা বিশ্বাস করি- যে রাষ্ট্র আল্লাহভীতি, সৎ নেতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও মানবিক সুশাসনের ওপর দাঁড়ায়- সেই রাষ্ট্রই হয় শান্তির ঠিকানা, সুখের আবাস, উন্নয়নের কেন্দ্র। এটাই আমাদের লক্ষ্য- ইসলামী সুশাসনে সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত, নিরাপদ বাংলাদেশ।এটাইআমাদের অঙ্গীকার- জনগণের সুখ-শান্তির নতুন বাংলাদেশ।

সংবাদ সম্মেলনে দলের নায়েবে আমির মাওলানা ইউসুফ আশরাফ, যুগ্ম মহাসচিব আবু সাঈদ নোমাম, এনামুল হক মুসা, কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক হাসান জুনায়েদ সহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ