spot_img
spot_img

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর: সীমান্ত, পানি ও বন্দি বিনিময় ইস্যুতে আলোচনা

পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বার্থের ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী বাংলাদেশ। এই লক্ষ্য নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান চলতি সপ্তাহে ভারত সফরে যাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে হওয়া আলোচনার প্রেক্ষাপটে এই শুভেচ্ছা সফরটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

ঢাকা এই সফরকে শুভেচ্ছা সফর হিসেবে অভিহিত করলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতি গভীরভাবে বুঝতে এবং বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে নয়াদিল্লি যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

সফরকালে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিষয়কমন্ত্রী হারদীপ সিং পুরীর সঙ্গেও ড. খলিলুর রহমানের বৈঠকের কথা রয়েছে।

প্রত্যর্পণ ও সীমান্ত ইস্যু

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করবে বাংলাদেশ। এছাড়া ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদসহ অন্যান্য আসামিদের দ্রুত ফেরত চাইবে ঢাকা। মাসুদ বর্তমানে কলকাতায় গ্রেপ্তার রয়েছেন।

এ বিষয়ে একজন ঊর্ধ্বতন বলেন, এটি সময়সাপেক্ষ হতে পারে, তবে আমরা আসামিদের যত দ্রুত সম্ভব ফেরত দেখতে চাই।

ভিসা সেবা পুরোপুরি চালুর বিষয়েও ভারতের কাছ থেকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাশা করবে ঢাকা। চিকিৎসা পর্যটন থেকে ভারত উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হতে পারে, সে বিষয়টিও সেখানে উল্লেখ করা হবে। এছাড়া সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সীমান্তে আর কোনো প্রাণহানি যেন না ঘটে, সে বিষয়ে জোর দেবে বাংলাদেশ।

উভয় পক্ষ জ্বালানি সহযোগিতা, অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন এবং বাণিজ্য বাধা সহজ করার পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে এক কর্মকর্তা বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি এবং আরও বহুবিধ সাদৃশ্যের গভীর বন্ধন রয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, যেকোনো দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয়ই আলোচনায় আসে।

সফরের সময়সূচি

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বিকেলে নয়াদিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন। সেখান থেকে তিনি মরিশাস যাবেন। নয়াদিল্লি সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির তার সঙ্গে থাকবেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এটিই হবে ভারতে প্রথম উচ্চপর্যায়ের সফর। দিল্লিতে আগামী ৮ এপ্রিল দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও আলোচনা হতে পারে।

ভারতের আমন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ সম্পর্ক

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে সুবিধাজনক সময়ে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

নবনির্বাচিত সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে ভারত সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এই আমন্ত্রণপত্রটি হস্তান্তর করেছিলেন। মোদি তার চিঠিতে দুই দেশের মধ্যে সংযোগ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং জনযোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন।

এদিকে, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা আজ সোমবার (৬ এপ্রিল) পারস্পরিক স্বার্থ ও দ্বিপাক্ষিক লাভের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক এবং দূরদর্শী পন্থায় একত্রে কাজ করার বিষয়ে ভারতের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে ভারতীয় দূত এই অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন।

বৈঠক শেষে ভারতীয় হাইকমিশন জানায়, আলোচনায় দুই দেশের জাতীয় উন্নয়নের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনকেন্দ্রিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করে দ্বিপাক্ষিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বৈঠকের আলোচনায় জনস্বাস্থ্য, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, নারীর ক্ষমতায়ন, গ্রামীণ উন্নয়ন, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, ব্যবসা সহজীকরণ, প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানিখাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো স্থান পায়।

হাইকমিশনার বলেন, অর্থনৈতিক ও সংযোগমূলক সম্পর্ক শক্তিশালী করার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিনিময় বৃদ্ধির মাধ্যমে ভারত-বাংলাদেশ সহযোগিতাকে ভৌগোলিক নৈকট্য থেকে নতুন সুযোগে রূপান্তর করা উচিত।

পানি বণ্টন

আলোচনায় তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়টি বাংলাদেশ আবারও উত্থাপন করবে। এছাড়া ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ এ বছর ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। এটি নবায়নের বিষয়টিও এবারের আলোচনায় স্থান পেতে পারে।

এর আগে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে চুক্তিটি নবায়নের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে তা আর হয়ে ওঠেনি। পশ্চিমবঙ্গ সরকারসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতও এ ক্ষেত্রে ভারত সরকার বিবেচনায় নিচ্ছে।

ভিসা ও সংযোগ

নিরাপত্তাজনিত কারণে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে স্থগিত থাকা পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলবে বাংলাদেশ। বর্তমানে ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রগুলোতে জনবল স্বল্পতা থাকায় সেবা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। এছাড়া দুই দেশের মধ্যে পরিবহন, জ্বালানি এবং ডিজিটাল সংযোগ বাড়ানোর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হবে।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশ কাজ করছে। সম্প্রতি ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ এবং ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদির মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় যৌথ প্রশিক্ষণ ও গভীর সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ঢাকা ও দিল্লি উভয় পক্ষই এখন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন করে সাজাতে কাজ করছে যা দুই দেশের জন্যই নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।

-ইউএনবি

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ