spot_img
spot_img

৬ এপ্রিলের হেফাজতের ঐতিহাসিক লংমার্চ: যে জাগরণ নাড়িয়ে দিয়েছিল পুরো বাংলাদেশ

বাংলাদেশের ইসলামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাসে ৬ এপ্রিল একটি স্মরণীয়, আবেগঘন ও ঐতিহাসিক দিন। ২০১৩ সালের এই দিনে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ডাকে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আলেম-ওলামা, মাদরাসার ছাত্র ও ধর্মপ্রাণ তৌহিদী জনতা ঢাকামুখী লংমার্চে অংশ নেন। এটি কেবল একটি কর্মসূচি ছিল না; বরং ইসলাম, কুরআন-সুন্নাহ এবং মহানবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শানে কটুক্তির বিরুদ্ধে ঈমানি চেতনায় উদ্বুদ্ধ এক বিরাট গণজাগরণে রূপ নিয়েছিল।

সে সময় দেশে ইসলামবিদ্বেষী ব্লগারদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। মহান আল্লাহ, পবিত্র কুরআন ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে অবমাননাকর, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ লেখা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের নীরবতা, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা, ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়। এমন পরিস্থিতিতে ২০১০ সালে চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক, আলেম সমাজের প্রবীণ মুরব্বি আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে ধর্মীয় অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।

২০১৩ সালের শুরুতে শাহবাগকেন্দ্রিক পরিস্থিতি সেই ক্ষোভকে আরও তীব্র করে তোলে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবির আড়ালে সেখানে সক্রিয় হয়ে ওঠা একটি ইসলামবিদ্বেষী গোষ্ঠী ইসলাম, কুরআন-সুন্নাহ, ইসলামি সংস্কৃতি ও আলেমদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়াতে থাকে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটুক্তি, আলেমদের নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ এবং আকিদাবিরোধী প্রচারণা মুসলমানদের হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করে। এই পরিস্থিতির ধারাবাহিকতায় ১৭ ফেব্রুয়ারি ইসলামবিদ্বেষী ব্লগারচক্র নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সারাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি হেফাজতের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী সরকার ও জাতির উদ্দেশে খোলা চিঠি দিয়ে ১৩ দফা দাবি উত্থাপন করেন। এরপর ১১ মার্চ হাটহাজারীতে জাতীয় উলামা-মাশায়েখ সম্মেলন থেকে ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়, যার চূড়ান্ত রূপ ছিল ৬ এপ্রিলের ঢাকামুখী লংমার্চ।

৬ এপ্রিলের সেই লংমার্চ ছিল ঈমানি আবেগের এক বিস্ময়কর বিস্ফোরণ। সরকারের নানা বাধা, নজরদারি ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ঢাকার শাপলা চত্বর লক্ষ লক্ষ তৌহিদী জনতার জনসমুদ্রে পরিণত হয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মানুষ বাসে, ট্রাকে, মাইক্রোবাসে, ভ্যানে, এমনকি পায়ে হেঁটেও ঢাকার পথে রওনা হন। এতে স্পষ্ট হয়ে যায়, এটি কেবল একটি সংগঠনের কর্মসূচি ছিল না; বরং ইসলাম ও নবীপ্রেমের প্রশ্নে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল অভূতপূর্ব। সেদিনের মহাসমাবেশ থেকে হেফাজতে ইসলাম আবারও তাদের ১৩ দফা দাবি তুলে ধরে।

এই আন্দোলনের কেন্দ্রীয় প্রতীক ছিলেন শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী। তিনি প্রচলিত অর্থে রাজপথকাঁপানো রাজনৈতিক বক্তা ছিলেন না। কিন্তু আলেমসমাজে তার গ্রহণযোগ্যতা, দীনী খেদমত, ইখলাস ও আস্থার অবস্থান এতটাই গভীর ছিল যে, তার নেতৃত্বেই লাখো মানুষ হেফাজতের ডাকে সাড়া দেন। ফলে ৬ এপ্রিলের লংমার্চ শুধু একটি সমাবেশ ছিল না; এটি আল্লামা শফীর প্রতি মুসলিম জনতার গভীর আস্থা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধারও ঐতিহাসিক বহিঃপ্রকাশ হয়ে ওঠে।

৬ এপ্রিলের এই জাগরণই পরবর্তী ৫ মে’র ঢাকা অবরোধের ভিত্তি তৈরি করে। ২০১৩ সালের ৫ মে দেশজুড়ে হাজার হাজার তৌহিদী জনতা ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলে প্রশাসন রাজধানীর প্রবেশপথে বাধা দেয়, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরুদ্ধ করা হয়, বাসস্ট্যান্ড ও ট্রেন চলাচলও বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবুও বাধা পেরিয়ে, হেঁটে, রিকশায়, কাভার্ডভ্যানে কিংবা বিকল্প পথে লাখো ধর্মপ্রাণ মুসলমান ঢাকায় প্রবেশ করেন। দিনভর হামলা ও দমন-পীড়নের মধ্যেও হেফাজতের নেতাকর্মীরা মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেন।

পরে সেই অবস্থানই গভীর রাতে রক্তাক্ত পরিণতির দিকে যায়। ৫ মে রাত বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াল ও কালো অধ্যায় হয়ে আছে। পুরো এলাকার আলো নিভিয়ে দিয়ে ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র তৌহিদী জনতার ওপর গণহত্যা চালানো হয়। টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, গ্যাস গ্রেনেড, রাবার বুলেট ও গুলি ছুড়ে আলেম-ওলামা, হাফেজ, মাদরাসার ছাত্র ও সাধারণ মুসলমানদের ওপর নির্মম আক্রমণ চালানো হয়। শাপলা চত্বরে সেই গণহত্যা আজও বহু মানুষের কাছে পরিকল্পিত বর্বরতার স্মারক হয়ে আছে।

তবে ৬ এপ্রিলের লংমার্চের গুরুত্ব কেবল তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক অভিঘাতে সীমাবদ্ধ নয়। এই দিন দেখিয়ে দিয়েছিল ঈমান, কুরআন-সুন্নাহ এবং নবীপ্রেমের প্রশ্নে এ দেশের মানুষ এখনও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এক কাতারে দাঁড়াতে পারে। আলেমদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই গণজাগরণ ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়ে আজও একটি বড় স্মৃতি, একটি গৌরবময় অধ্যায় এবং একই সঙ্গে একটি রক্তাক্ত ইতিহাসের ভূমিকা হয়ে আছে।

আজ ৬ এপ্রিল ফিরে এলে নতুন করে মনে পড়ে সেই ঢাকামুখী কাফেলা, সেই জনসমুদ্র, সেই ঈমানি আবেগ, সেই আল্লামা শফীর নেতৃত্ব এবং সেই অঙ্গীকার, যা ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে এক সময় দেশজুড়ে প্রতিবাদের ভাষায় পরিণত হয়েছিল। ৬ এপ্রিলের হেফাজতের ঐতিহাসিক লংমার্চ তাই শুধু একটি তারিখ নয়; এটি মুসলমানদের আত্মমর্যাদা, ত্যাগ, প্রতিবাদ, ঐক্য এবং ঈমানি জাগরণের এক অমর স্মারক।

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ