spot_img
spot_img

ট্রাম্পের চাপের কাছে বিশ্ব আর আগের মতো নত হচ্ছে না: সিএনএন’র বিশ্লেষণ

ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংকট বিশ্বের কাছে নতুন এক বাস্তবতা তুলে ধরছে। এতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ প্রয়োগভিত্তিক কৌশল ক্রমেই বৈশ্বিক প্রতিরোধের মুখে পড়ছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন’র বিশ্লেষণে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের নীতির মূল ভিত্তি-শক্তি, বলপ্রয়োগ এবং চাপ সৃষ্টি এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আগের মতো কার্যকর থাকছে না। বরং ইরান সংকট দেখাচ্ছে, প্রতিপক্ষ দেশগুলো এখন তার দাবির সামনে সহজে নতি স্বীকার করছে না।

এতে আরও বলা হয়, ট্রাম্প বরাবরই নিজের আধিপত্যে বিশ্বাসী এবং অর্থনৈতিক, ভূরাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ সাফল্যের জন্য আমেরিকার শক্তিকে নির্দ্বিধায় ব্যবহার করতে প্রস্তুত। তার নীতিগুলো সংঘাত ও উত্তেজনা বাড়ানোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতকে ট্রাম্পের কৌশলের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। পূর্ববর্তী মার্কিন প্রশাসনগুলো যেখানে সরাসরি সামরিক হামলা এড়িয়ে চলেছে, সেখানে ট্রাম্প ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতার বিরুদ্ধে আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তবে তেহরান তার দাবির কাছে নতি স্বীকার না করায় আমেরিকার ক্ষমতার সীমা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। এতে ট্রাম্পের সামনে কয়েকটি কঠিন সিদ্ধান্ত তৈরি হয়েছে। যেমন- সংঘাত আরও বাড়ালে মার্কিন ক্ষয়ক্ষতি ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়তে পারে,আবার ‘জয়’ দাবি করে সরে গেলে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও ইউরেনিয়াম মজুদ সেই দাবিকে দুর্বল করে দিতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করে ইরানের অর্থনীতিতে চাপ বাড়ানোর পথ বেছে নিয়েছেন।

মিত্রদের সমর্থন আদায়ে ব্যর্থতা

ট্রাম্প ন্যাটো মিত্রদের ইরান যুদ্ধে যুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো আগাম অবহিত না হওয়া এবং নিজেদের জাতীয় স্বার্থের কারণে এতে অংশ নিতে রাজি হয়নি। এতে আমেরিকা তার ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক সুবিধার কিছু অংশ হারিয়েছে।

চীনের পাল্টা চাপ

বাণিজ্যযুদ্ধের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান কিছু ক্ষেত্রে সফল হলেও, চীন পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ রপ্তানি বন্ধের হুমকি দেয়। এতে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকে কিছুটা পিছু হটতে হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চাপের মুখে ফেলতে চাইছে।

ইউরোপ ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ধাক্কা

ট্রাম্পের প্রভাব ইউরোপেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তার সমর্থিত হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন, যা ইউরোপে স্ট্রংম্যান রাজনীতির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এ ছাড়া আমেরিকার ভেতরেও ট্রাম্পের কিছু নীতি জনরোষের মুখে পড়েছে। মিনেসোটায় ফেডারেল এজেন্টদের হাতে দুই নাগরিক নিহত হওয়ার পর গণবিক্ষোভের মুখে তার গণনির্বাসন কর্মসূচি থেকে সরে আসতে হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রচেষ্টাও পুরোপুরি সফল হয়নি।

এমনকি নতুন পোপ, পোপ লিও চতুর্দশ-ও ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের অবস্থানের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘আমি ট্রাম্প প্রশাসনকে ভয় পাই না।’

অসীম ক্ষমতা ধারণা

ট্রাম্প প্রকাশ্যেই বলেছেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি যা চান তা করার অধিকার রাখেন। তিনি দাবি করেন, তার সিদ্ধান্তের একমাত্র সীমা তার নিজের নৈতিকতা।

হোয়াইট হাউস কর্মকর্তারাও ইরান ইস্যুতে ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রায়ই বলেন, শুধু প্রেসিডেন্টই জানেন তিনি কী করবেন, যা ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের প্রবণতাকে নির্দেশ করে।

ইরান কীভাবে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ দেখাচ্ছে যে শুধুমাত্র সামরিক শক্তি দিয়ে সবসময় স্পষ্ট বিজয় অর্জন সম্ভব নয়। হরমুজ প্রণালি অবরোধের মাধ্যমে ট্রাম্প ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে চাইছেন, তবে এর প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।

এছাড়া ইরান হয়তো মনে করছে, দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে, বিশেষ করে নির্বাচনের বছরে।

সামনে অনিশ্চয়তা

সিএনএন-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতার স্বাভাবিক ক্ষয় এবং আন্তর্জাতিক চাপ তার অবস্থানকে আরও দুর্বল করতে পারে। ইরান সংকট সেই দুর্বলতাকে আরও প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।

এখন বড় প্রশ্ন হলো, নিজের ক্ষমতা যে কমছে না, তা প্রমাণ করতে ট্রাম্প পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে কী বেছে নেবেন।

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ