আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ইহুদি-খ্রিস্টীয় মূল্যবোধের প্রশংসা করে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছেন। প্রভাবশালী ইহুদি ধর্মীয় নেতা রাব্বি মেনাহেম মেন্ডেল শ্নিয়ারসনের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়।
গত সোমবার (৮ জুন) রাজধানী বুয়েনোস আইরেসের পালাসিও লিবের্তাদ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রায় এক হাজার ৮০০ ইহুদি উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন মিলেই। এ সময় বরাবরের মতো তিনি ইসরাইল ও ইহুদি জাতির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন।
বুধবার (১০ জুন) ইসরাইলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
মিলেই বলেন, ‘আমি যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি, তা গঠনে সহজ হলেও পরিণামে গভীর। যখন কেউ ইহুদি-খ্রিস্টীয় মূল্যবোধ গ্রহণ করে, তখন আধ্যাত্মিক ও পার্থিব জীবন একই সুরে সমন্বিত হয়।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাবাদ আন্দোলনের কোনো বড় অনুষ্ঠানে দায়িত্বশীল একজন অ-ইহুদি রাষ্ট্রপ্রধানের আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদনের ঘটনা এটিই প্রথম। নিজেকে ‘নৈরাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া মিলেইয়ের ইহুদি ধর্মের প্রতি প্রকাশ্য প্রশংসার দীর্ঘ তালিকায় এটি সর্বশেষ সংযোজন।
ইহুদি ধর্ম ও ইসরাইলের প্রতি মিলেইয়ের আকর্ষণ
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট দীর্ঘদিন ধরেই ইহুদি ধর্ম ও ইসরাইলের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে আসছেন। ২০২৩ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ইসরাইলপন্থি অবস্থানকে নিজের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত করেন। এই অবস্থানকে তিনি তার বিভিন্ন কর্মসূচিরও কেন্দ্রবিন্দু বানিয়েছেন।
এর আগে মিলেই নিউইয়র্কে রাব্বি শ্নিয়ারসনের সমাধি পরিদর্শন করেন। তিনি জেরুজালেমের ওয়েস্টার্ন ওয়ালেও যান।
২০২৪ সালে মায়ামির একটি চাবাদ সিনাগগে মিলেইকে সম্মানিত করা হয়। সেখানে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, তার বিশ্বাস, তার মধ্যে ইহুদি বংশধারা রয়েছে। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে ইহুদি ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করছেন। প্রেসিডেন্ট পদ থেকে অবসরের পর ইহুদি ধর্ম গ্রহণের ইচ্ছাও প্রকাশ করেন তিনি।
৪০ মিনিটের ভাষণে মিলেই মূলত ইহুদি ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দেন এবং সেগুলোকে তার অর্থনৈতিক দর্শনের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন। তার এই অবস্থানে আর্জেন্টিনায় বসবাসকারী ইহুদিরা বেশ গর্ববোধ করেন।
ইউরোপীয় ইহুদিদের গন্তব্য হিসেবে আর্জেন্টিনা
ইউরোপে ক্রমবর্ধমান ইহুদিবিদ্বেষ নিয়ে উদ্বিগ্ন ইহুদিদের মিলেইয়ের নেতৃত্বাধীন আর্জেন্টিনায় বসবাসের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাবলো কুইর্নো সম্প্রতি ব্রিটেন ও ইউরোপের অন্যান্য দেশে বসবাসকারী ইহুদিদের উদ্দেশে দেওয়া এক বার্তায় আর্জেন্টিনার আকর্ষণীয় দিকগুলো তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘এটি একটি উন্নয়নশীল দেশ, যেখানে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। দেশটি রৌদ্রোজ্জ্বল, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এবং লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম ইহুদি সম্প্রদায়ের আবাসস্থল। ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধেও এই দেশের দৃঢ় অবস্থান রয়েছে। ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় ইহুদিদের আর্জেন্টিনাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।’
ইহুদিদের প্রতি আর্জেন্টিনার এমন অবস্থান নিয়ে কথা বলেছেন দেশটিতে নিযুক্ত ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত ইয়াল সেলা।
তিনি বলেন, ‘আমি আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একমত। অবশ্যই ইহুদি জীবনযাপনের জন্য ইসরাইল সব সময়ই সেরা জায়গা। তবে ইউরোপের তুলনায় ইহুদিদের জন্য আর্জেন্টিনা অনেক ভালো একটি জায়গা।’
মিলেইয়ের ইসরাইল সফর
গত এপ্রিলে ইসরাইল সফরে গিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে একাধিক কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষর করেন মিলেই। দুই নেতা ঘোষণা দেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ তেল আবিব ও বুয়েনোস আইরেসের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল শুরু হবে।
পাশাপাশি জেরুজালেমে আর্জেন্টিনার দূতাবাস স্থানান্তরের ঘোষণা দেন মিলেই।
দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর নামকরণ করা হয় ২০২০ সালের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর অনুকরণে। কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ভিত্তি হিসেবে এই চুক্তি পরিচিত।
এ সময় নেতানিয়াহু আশা প্রকাশ করেন, আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মডেল লাতিন আমেরিকাতেও সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে মিলেই ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’কে দুই দেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেন। একই সঙ্গে আর্জেন্টিনা ও ইসরাইলের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
ইসরাইল সফরকালে পশ্চিম জেরুজালেমের ওয়েস্টার্ন ওয়ালও পরিদর্শন করেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট।
ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন হাভিয়ের মিলেই। একই সঙ্গে আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রনীতিকে আমেরিকা ও ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পুনর্গঠন করেছেন তিনি।
এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করে আর্জেন্টিনা।
দেশটির দাবি, ১৯৯২ সালে বুয়েনোস আইরেসে ইসরাইলি দূতাবাসে হামলা এবং ১৯৯৪ সালে একটি ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে বোমা হামলার পেছনে ইরানি কর্মকর্তা ও আইআরজিসির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ রয়েছে। তবে ইরান বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যা দেওয়ায় আর্জেন্টিনার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায় তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাল্টা আর্জেন্টিনাকে ‘সংঘটিত ওই অপরাধের অংশীদার এবং ইতিহাসের ভুল পক্ষে অবস্থানকারী’ হিসেবে অভিযুক্ত করে।
ইরানের এই অভিযোগের পর তেহরানের কূটনৈতিক দূতকে বহিষ্কার করে আর্জেন্টিনা।











